বাংলাস্ফিয়ার: দীপাবলির আগেই রাজ্যের নতুন শিল্পনীতি ঘোষণা করা হবে। বুধবার, ১৪ অক্টোবর হলদিয়ায় দেশের বৃহত্তম সমন্বিত ফেনল ও অ্যাসিটোন কারখানার উদ্বোধন করে জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্য, শিল্পনীতির খসড়া জমা পড়েছে। শিল্পের জন্য জমি এবং বিনিয়োগে উৎসাহভাতা নিয়ে কাজ চলছে। আগামী এক বছরের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গকে বিনিয়োগকারীদের পছন্দের গন্তব্য করে তোলার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, মন্ত্রিগোষ্ঠীর তৈরি খসড়ায় শিল্পে উৎসাহভাতা, জমি বরাদ্দ এবং বিদ্যুতের মাশুলের মতো বিষয় রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের বাংলায় আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য শিল্পের বিকাশের সঙ্গে সাধারণ মানুষের স্বার্থকে যুক্ত করা। স্থানীয় তরুণদের কাজের সুযোগ বাড়াতে দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি কর্মী নিয়োগের উপরও জোর দেন তিনি।
হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের অধীন সংস্থা অ্যাডপার্মা প্রাইভেট লিমিটেডের এই প্রকল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা। বছরে ৩ লক্ষ ৪৫ হাজার টন ফেনল এবং ২ লক্ষ ১৫ হাজার টন অ্যাসিটোন উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে কারখানাটির। অর্থাৎ, দুই রাসায়নিক মিলিয়ে বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ৫ লক্ষ ৬০ হাজার টন। এটি দেশের বৃহত্তম সমন্বিত ফেনল–অ্যাসিটোন উৎপাদনকেন্দ্র এবং পূর্ব উপকূলের প্রথম ফেনল কারখানা। একই প্রকল্পে দুই রাসায়নিকের উৎপাদনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।
শুভেন্দুর বক্তব্য, আগে বিদেশ থেকে আনতে হতো এমন রাসায়নিক দেশে উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করবে এই কারখানা। প্রকল্পটিকে কেন্দ্রের আত্মনির্ভর ভারত উদ্যোগের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। আরও দশ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান। শিল্পপতি পূর্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের সম্প্রসারণের পরিকল্পনা এবং রেল যোগাযোগের উন্নয়নে সরকার সহযোগিতা করবে বলে আশ্বাস দেন মুখ্যমন্ত্রী।
শিল্পায়ন প্রসঙ্গে পূর্ববর্তী দুই সরকারকেই আক্রমণ করেন শুভেন্দু। তাঁর অভিযোগ, বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনে অতিরিক্ত ট্রেড ইউনিয়ন তৎপরতায় পঞ্চাশ হাজারের বেশি শিল্প বাংলা ছেড়েছে। আবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের পনেরো বছরে ত্রুটিপূর্ণ জমিনীতি, উৎসাহভাতা প্রত্যাহার এবং সিন্ডিকেটের দাপট বিনিয়োগে বাধা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। নিজের সরকারকে জনস্বার্থ ও শিল্পবান্ধব হিসেবে তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী।
উৎসাহভাতার প্রসঙ্গটির নির্দিষ্ট পটভূমিও রয়েছে। আগের সরকার ২০২৫ সালে আইন করে ১৯৯৩ থেকে ২০২১ সালের বিভিন্ন শিল্প উৎসাহ প্রকল্প ও আর্থিক সুবিধা পূর্ববর্তী সময় থেকে প্রত্যাহার করেছিল। সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে একাধিক শিল্পগোষ্ঠী কলকাতা হাই কোর্টে যায়। নতুন নীতিতে উৎসাহভাতার ব্যবস্থা কী হবে, সেই প্রশ্ন তাই প্রাসঙ্গিক।
হলদিয়ার শিল্পাঞ্চলে জরুরি চিকিৎসা পরিকাঠামোর কথাও বলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর ঘোষণা, ২০২৭ সালের জুনে বার্ন ইউনিট-সহ পঞ্চাশ শয্যার ট্রমা সেন্টার চালু করার লক্ষ্য রয়েছে। এই উদ্যোগে হলদিয়া উন্নয়ন পর্ষদের আঠারো কোটি টাকা, ইন্ডিয়ান অয়েলের পাঁচ কোটি টাকা এবং জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের আরও পাঁচ কোটি টাকার সংস্থানের কথা জানান তিনি। শিল্পশ্রমিকদের দুর্ঘটনায় দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজনের কথাও তোলেন।
পূর্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়কে রাজ্যে তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করার অনুরোধও করেন শুভেন্দু। পাশাপাশি হলদিয়ায় প্রস্তাবিত পেপসিকো প্রকল্প ও চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরির কারখানার উল্লেখ করেন। আরামবাগে রিলায়্যান্সের ক্যাম্পা কোলা প্রকল্পের ভূমিপুজোয় যোগ দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর পূর্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর দুবার দেখা হয়েছে। সেই বৈঠকগুলিতে রাজ্যে শিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। শিল্পপতিদের প্রস্তাব ও পরামর্শ গ্রহণে সরকার প্রস্তুত বলে বার্তা দেন তিনি।
এখন নজর থাকবে ঘোষিত শিল্পনীতির চূড়ান্ত রূপের দিকে। জমি পাওয়ার পদ্ধতি, বিনিয়োগের সুবিধা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্পর্কে স্পষ্ট নিয়ম সামনে এলেই সরকারের প্রতিশ্রুতি মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে। হলদিয়ার উদ্বোধন সেই বৃহত্তর শিল্পায়নের পরিকল্পনা তুলে ধরার মঞ্চ হয়ে উঠল। বিশেষ করে ঘোষিত বিনিয়োগ বাস্তবে কতটা উৎপাদন ও স্থায়ী চাকরিতে রূপান্তরিত হচ্ছে, তা দিয়েই আগামী দিনে এই উদ্যোগের সাফল্য বিচার হবে।