বাংলাস্ফিয়ারঃ জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অংশগ্রহণ বাড়লেও সামাজিক বৈষম্য কাটেনি; যৌনকর্মীদের কাছে নিজেদের পুজো আজও নিরাপদ আশ্রয়
স্থানীয়দের একাংশের অব্যাহত বাধা ও বিরোধিতার মধ্যেই বুধবার, ১৪ অক্টোবর, কলকাতার সোনাগাছিতে উদ্বোধন হল যৌনকর্মীদের চতুর্দশ দুর্গাপুজোর। দেশের বৃহত্তম যৌনপল্লিতে এই উৎসবের আয়োজন করেছে দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি। সামাজিক কলঙ্কের বোঝা মাথায় নিয়েই নিজেদের অধিকার আদায়ের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে যৌনকর্মীদের এই সংগঠন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির সম্পাদক বিশাখা লস্কর বলেন, “মানুষ বরাবরই ভেবেছে, যৌনকর্মীরা যেন মানুষের চেয়ে নিকৃষ্ট—তাদের আবার দুর্গাপুজো করার কী দরকার? এই সামান্য জায়গাটুকু পেতেও আমাদের হাই কোর্টে যেতে হয়েছিল। কিন্তু সমস্যা এখনও মেটেনি। এখনও প্রতি বছর স্থানীয়রা আমাদের পুজো নিয়ে নতুন নতুন আপত্তি তোলেন।” তাঁর অভিযোগ, উদ্বোধনের দিনও কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা দাবি করেন, অনুমোদিত মাপের চেয়ে বড় মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। তা নিয়ে তাঁরা ধস্তাধস্তি বাধানোর চেষ্টা করেন।
বিশাখা আরও জানান, নিজেদের দুর্গাপুজোর আয়োজন করতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা কিংবা পাড়ার ক্লাব—কারও সহযোগিতা পাননি তাঁরা। অন্য পুজোয় গেলে যৌনকর্মীদের প্রায়ই হেয় চোখে দেখা হত, তাঁদের নিয়ে বিচার চলত। সেই কারণেই প্রবল বাধা সত্ত্বেও নিজেদের পুজো শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা।
অনুষ্ঠানে এক যৌনকর্মীর ছেলে ইসমাইল বলেন, “আমরা এই অনুষ্ঠানগুলির আয়োজন করি, কারণ এগুলি আমাদের নিরাপদ আশ্রয়ও। তবে আমরা আশা করি, একদিন সমাজের মূলস্রোতের অংশ হতে পারব। তখন আমাদের মতো প্রান্তিক মানুষদের জন্য আলাদা পুজোর প্রয়োজন হবে না। সমাজের অন্য সকলের মতো আমরাও প্রত্যেকটি পুজোয় অংশ নিতে চাই।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত এক অতিথি বলেন, যৌনকর্মীদের অধিকার না দিলে এবং তাঁদের সমান মর্যাদার নাগরিক হিসেবে গণ্য না করলে কোনও সমাজই এগোতে পারে না।
আয়োজকদের বক্তব্য, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে পুজোয় অংশগ্রহণকারী ও অতিথির সংখ্যা বেড়েছে। স্থানীয় বিধায়ক, মন্ত্রী, সমাজকর্মী, কলেজপড়ুয়া এবং এলাকার বাসিন্দারা এখন এই পুজোয় এসে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। তাঁদের এই উপস্থিতি বদলের হাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অথচ প্রথা অনুযায়ী, যৌনকর্মীদের আঙিনার সামান্য মাটি ছাড়া দুর্গাপ্রতিমা তৈরির কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সোনাগাছি থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বেই কলকাতার বিখ্যাত মৃৎশিল্পীদের পাড়া কুমোরটুলি। প্রতি বছর দুর্গাপ্রতিমা গড়তে শিল্পীরা যৌনকর্মীদের আঙিনা থেকে মাটি সংগ্রহ করেন। কিন্তু যাঁদের আঙিনার মাটি দিয়ে দেবীমূর্তি তৈরি হয়, সেই নারীরাই বহু সময় দেবীর পুজোয় নিজেদের অবাঞ্ছিত বলে অনুভব করেছেন। তাই তাঁরা নিজেদের পুজো শুরু করেছেন। নিজেদের জায়গা এবং নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন।
উদ্বোধনে উপস্থিত মমতা-তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক কুণাল ঘোষ বলেন, তিনি সর্বদা যৌনকর্মীদের পাশে থাকবেন এবং তাঁদের পরিস্থিতির উন্নতিতে সাধ্যমতো চেষ্টা করবেন।
কুণাল বলেন, “যে পুরুষেরা এখানে টাকা দিয়ে যৌনসেবা নিতে আসেন, কিংবা যারা মেয়েদের যৌনব্যবসায় পাচার করে, তাদের প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় না। অথচ যে নারীরা যৌনপেশায় আসেন, সমাজের বিচারের বোঝা তাঁদেরই বইতে হয়। এটা কী করে ঠিক হতে পারে? একটি সভ্য সমাজের এমনটা মেনে নেওয়া উচিত নয়।”