বাংলাস্ফিয়ারঃ কলকাতার লোকভবনের ফটক থেকে অন্দরমহল, একাধিক স্থানের নাম বদলে যুক্ত করা হল বাংলার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের স্মৃতি। সাহিত্য, সমাজসংস্কার, স্বাধীনতা আন্দোলন এবং আদিবাসী প্রতিরোধের ইতিহাসকে সামনে রেখে এই উদ্যোগ নিয়েছেন রাজ্যপাল আর এন রবি। গত ৭ অক্টোবরের বিজ্ঞপ্তিতে নতুন নামগুলি জানানো হয়েছে। বদলের তালিকায় রয়েছে ছ’টি ফটক, বিভিন্ন কক্ষ, হলঘর ও প্রাঙ্গণ।

দক্ষিণ ফটকটির নাম হয়েছে ‘ঋষি বঙ্কিম দ্বার’। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও রাজ্যপাল এই পথ ব্যবহার করেন। সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রবেশের উত্তর ফটক এখন ‘কবিগুরু দ্বার’। দক্ষিণ-পশ্চিমে ‘ডঃ বিধানচন্দ্র রায় দ্বার’, দক্ষিণ-পূর্বে ‘সিধো-কানহো দ্বার’, উত্তর-পশ্চিমে ‘ক্ষুদিরাম বসু দ্বার’ এবং উত্তর-পূর্বে ‘রাজা রামমোহন রায় দ্বার’ নাম রাখা হয়েছে। প্রতিটি নামের সঙ্গে খোদাই করা হয়েছে অশোকের প্রতীক। দক্ষিণ ফটক থেকে ভবনের ভিতরের প্রবেশপথ পর্যন্ত রাস্তার নাম ‘কর্তব্য পথ’; উত্তরের গাড়ি চলাচলের পথ ‘শক্তি পথ’।

অন্দরেও এসেছে পরিবর্তন। রাজ্যপালের দফতর পরিচিত হবে ‘ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী কক্ষ’ নামে; তাঁর বাসস্থান ‘শান্তিনিকেতন’। শপথগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত ঐতিহাসিক থ্রোন রুমের নতুন পরিচয় ‘বন্দে মাতরম সভাঘর’। প্রিন্স অফ ওয়েল্স স্যুটের নাম ‘গুরুদেব কক্ষ’। উত্তর পোর্টিকোর বড় সিঁড়ির কাছের চত্বর হয়েছে ‘নেতাজি সুভাষ প্রাঙ্গণ’। ব্যারাকপুরের ফ্ল্যাগস্টাফ হাউসের নতুন নাম ‘লোকবিহার’।

উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণের মার্বেল হলের নাম যথাক্রমে ‘পরমহংস কক্ষ’, ‘বিবেকানন্দ কক্ষ’ এবং ‘মা সারদা কক্ষ’। ব্লু ড্রয়িং রুম হয়েছে ‘মহানন্দা কক্ষ’, ব্রাউন ডাইনিং হল ‘গঙ্গা সভাঘর’। গ্রন্থাগারের সঙ্গে জুড়েছে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নাম—‘বিদ্যাসাগর গ্রন্থাগার’।

এই নামবদলের পটভূমিতে রয়েছে ভবনটির দীর্ঘ ঔপনিবেশিক ইতিহাস। লোকভবনের সরকারি বিবরণ অনুযায়ী, ১৭৯৯ সালে নির্মাণ শুরু হয়ে ১৮০৩ সালে কাজ শেষ হয়। তখন গভর্নর জেনারেল ছিলেন লর্ড ওয়েলেসলি। ইংল্যান্ডের ডার্বিশায়ারের কেডলস্টন হলের আদলে তৈরি হয়েছিল এই প্রাসাদোপম স্থাপত্য। সেটি ছিল কার্জন পরিবারের পূর্বপুরুষদের বাড়ি। পরবর্তী সময়ে লর্ড কার্জন নিজেও ভারতের ভাইসরয় হিসেবে কলকাতার এই ভবনে থেকেছেন।

সরকারি বিবরণে আরও বলা হয়েছে, রাজধানী দিল্লিতে স্থানান্তরিত হওয়ার আগে মোট ২৩ জন গভর্নর জেনারেল ও ভাইসরয় এখানে বসবাস করেছিলেন। প্রায় ২৭ একর জমির উপর এই চত্বর; ভবনের মেঝের মোট আয়তন প্রায় ৮৪ হাজার বর্গফুট। কেন্দ্রীয় হলঘর, চারদিকে বাঁকানো করিডর এবং পৃথক ডানার বিন্যাসে তৈরি তিনতলা বাড়িটি ছিল ব্রিটিশ শাসনক্ষমতার অন্যতম প্রতীক। স্বাধীনতার পরে এখানেই দায়িত্ব নেন প্রথম ভারতীয় রাজ্যপাল চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী। ফলে ভবনটির ইতিহাসে ঔপনিবেশিক প্রশাসন এবং স্বাধীন ভারতের সাংবিধানিক ব্যবস্থার দুই পর্বই জড়িয়ে রয়েছে।

ভবনের নিচতলার কেন্দ্রীয় অংশেই মার্বেল হল। প্রথম তলার মধ্যভাগে থ্রোন রুম, ব্যাঙ্কোয়েট হল এবং অতিথি আপ্যায়নের ঘরগুলি অবস্থিত। উত্তর-পূর্ব কোণের কাউন্সিল চেম্বারে ব্রিটিশ আমলে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হত। দ্বিতীয় তলায় রয়েছে রাজ্যপালের আবাসিক অংশ। এই বিন্যাস মনে রাখলে বোঝা যায়, নতুন নামগুলি ভবনের আনুষ্ঠানিক ও দৈনন্দিন ব্যবহারের বিভিন্ন পরিসরকে ছুঁয়েছে। এই ঐতিহাসিক ভবনে অতিথি অভ্যর্থনা, প্রশাসনিক কাজ, পাঠাগার কিংবা শপথগ্রহণ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই এখন পরিচিত স্থানগুলিকে নতুন নামে চিহ্নিত করতে হবে।

নামবদলের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটও রয়েছে। রাজ্যের বিজেপি সরকার গঠিত দশ সদস্যের কমিটি বিভিন্ন রাস্তা, সেতু ও সর্বজনীন স্থানের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব পরীক্ষা করছে। তার মধ্যেই লোকভবনের এই সিদ্ধান্ত। এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে, সি ভি আনন্দ বোসের রাজ্যপাল থাকাকালীন, রাজভবনের নাম হয়েছিল লোকভবন।

নতুন তালিকাটি দেখলে স্পষ্ট, ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি বাংলার নদী এবং সাংস্কৃতিক স্মৃতিও নামকরণের জায়গা পেয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে রয়েছেন সিধো-কানহো, ক্ষুদিরাম, রামমোহন এবং বিধানচন্দ্র। আবার গঙ্গা ও মহানন্দাও এসেছে ভবনের অন্দরে। তাই পরিবর্তনটি কেবল ব্রিটিশ আমলের কয়েকটি নাম সরানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; দিকনির্দেশক ও ঘরের ব্যবহারভিত্তিক পুরনো পরিচয়ের জায়গাতেও বসানো হচ্ছে স্মারক নাম।