বাংলাস্ফিয়ারঃ ক্যামাক স্ট্রিটে দলীয় দফতরের বিলবোর্ড সরানোকে কেন্দ্র করে অশান্তির মামলায় বুধবার, ১৪ অক্টোবর, তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রায় ছ’ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করল কলকাতা পুলিশ। শেক্সপিয়র সরণি থানায় জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তিনি জানান, তদন্তকারীদের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। প্রয়োজন হলে এই ঘটনায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত আইনি লড়াই চালাবেন। তাঁর অভিযোগ, বিরোধীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে ব্যবহার করছে বিজেপি; তৃণমূলকে ভয় পাচ্ছে বলেই প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ করা হচ্ছে।
এই মামলায় দ্বিতীয়বার পুলিশের সামনে হাজির হলেন অভিষেক। রবিবার তাঁর কালীঘাটের বাড়িতে নোটিস দিয়ে সোমবার হাজিরা দিতে বলা হয়েছিল। তিনি ৪৮ ঘণ্টা সময় চান। পরে বুধবার সকাল দশটায় হাজিরার জন্য নতুন নোটিস দেওয়া হয়। পুলিশের সূত্র উদ্ধৃত করে সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে, তিনি বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ থানায় পৌঁছন।
মামলার সূত্রপাত ২৭ আগস্ট। সেদিন ক্যামাক স্ট্রিটে অভিষেকের দফতরের ছাদে লাগানো তৃণমূলের একটি বড় বিলবোর্ড খুলতে যান কলকাতা পুরসভার কর্মীরা। তাঁদের সঙ্গে পুলিশও ছিল। প্রশাসনের অভিযোগ, অনুমোদনহীন ওই বিলবোর্ড সরানোর সময় বাধা দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলে দলীয় কর্মীদের সঙ্গে পুলিশ ও পুরকর্মীদের ধস্তাধস্তি হয়। লোহার কাঠামোর উপর টিনের পাত দিয়ে তৈরি বিলবোর্ডটি খুলতে হাতুড়ি ও গ্যাস কাটার ব্যবহার করেন পুরকর্মীরা।
ওই ঘটনায় তিনটি এফআইআর দায়ের হয়। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, দু’টিতে অভিষেকের নাম রয়েছে। ডেরেক ও’ব্রায়েন, বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় এবং প্রাক্তন বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের নামও মামলায় উঠে আসে। অভিযোগগুলির মধ্যে রয়েছে পুলিশের কাজে বাধা, হেনস্থা এবং মহিলা পুলিশকর্মীদের শ্লীলতাহানি। অভিষেক আগেই শ্লীলতাহানির অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। সেপ্টেম্বরে ডেরেককেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পুলিশ তখন জানিয়েছিল, অভিযুক্তদের বক্তব্য নথিবদ্ধ করার পাশাপাশি পাওয়া প্রমাণ পরীক্ষা করা হচ্ছে। প্রথম দফায় ১ সেপ্টেম্বর অভিষেককে ছ’ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। সেদিন থানার বাইরে তাঁর সমর্থকেরা বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, ডায়মন্ড হারবারের সাংসদকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হেনস্থা করা হচ্ছে। তদন্তের গোড়া থেকেই এই অভিযোগ তুলে আসছে তাঁর দল।
বুধবার অভিষেকের বক্তব্য, ২৭ আগস্টের ঘটনাটি ফেসবুকে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছিল। ফলে সেদিন কী ঘটেছিল, তার দৃশ্যমান নথি রয়েছে। কেবল অভিযোগ তোলাই যথেষ্ট নয়; তদন্তে তার সত্যতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে বলে তিনি দাবি করেন। নিজের তরফেও অভিযোগ দায়ের করার কথা জানান। তাঁর বক্তব্য, পুলিশ ডেকেছিল বলেই তিনি এসেছেন এবং প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। তবে তদন্তে সহযোগিতার পাশাপাশি আদালতে নিজের অবস্থান তুলে ধরবেন।
বিলবোর্ড অপসারণের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সাংসদ। তাঁর দাবি, পুরসভা তাঁকে আগাম যথাযথ নোটিস দেয়নি। নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কেন দলীয় দফতরের বিলবোর্ড খোলা হল, তার ব্যাখ্যা চান তিনি। একই সঙ্গে তাঁর প্রশ্ন, অন্য রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেও কি একই নিয়ম প্রয়োগ হচ্ছে, নাকি শুধু তৃণমূলকেই বেছে নেওয়া হচ্ছে?
অভিষেকের অভিযোগ, দলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, নাম, প্রতীক ও দফতরকে ঘিরে ধারাবাহিকভাবে চাপ তৈরি করা হচ্ছে। তৃণমূলের রাজনৈতিক শক্তি না থাকলে শাসকদলের এত ভয় কেন, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। দলীয় কর্মীদের ভয় দেখানোর অভিযোগ এনে জানান, রাজনৈতিক, গণতান্ত্রিক ও আইনি পথে লড়াই চলবে।
আলাদা প্রসঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ জানান অভিষেক। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে ছুরি নিয়ে আক্রমণের চেষ্টার যে অভিযোগ উঠেছে, তার নিন্দা করেন তিনি। অভিষেক জানান, ঘটনার সময় তিনি কালীঘাটের দফতরে ছিলেন এবং পরে বিষয়টি জানতে পারেন। তাঁর বক্তব্য, জেড প্লাস নিরাপত্তাপ্রাপ্ত একজন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে ঘিরেই এমন অভিযোগ উঠলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
বিলবোর্ড মামলায় তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ হবে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া। কলকাতা হাই কোর্টের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার কথা স্পষ্ট করেছেন অভিষেক।