কলকাতা পুরসভার নির্বাচনের আগে ওয়ার্ডের সীমানা পুনর্বিন্যাস নিয়ে বিতর্ক পৌঁছল কলকাতা হাইকোর্টে। প্রস্তাবিত ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়া বাতিলের আবেদন জানিয়ে সোমবার, ২৬ অক্টোবর আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন কসবার এক বাসিন্দা। তাঁর অভিযোগ, ওয়ার্ডগুলির ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যার তারতম্য, আয়তন এবং সীমানা নির্ধারণের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। নভেম্বরের শেষে সম্ভাব্য পুরভোটের মুখে এই মামলা তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আবেদনকারীর আইনজীবী শামিম আহমেদ বিষয়টি বিচারপতি আর্যক দত্তের অবকাশকালীন বেঞ্চের নজরে আনেন। পরে মামলা দায়েরের অনুমতি মেলে। বুধবার, ২৮ অক্টোবর বিষয়টির শুনানি হতে পারে। আবেদনকারীর বক্তব্য, ওয়ার্ড বাড়ানোর প্রক্রিয়ায় যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়নি। তবে মামলা দায়েরের অনুমতিকে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস বাতিলের নির্দেশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এই পুনর্বিন্যাস নিয়ে আগেই আপত্তি তুলেছিল সিপিএম। দলের অভিযোগ, সরু রাস্তার দু’পাশের বাড়িকে আলাদা ওয়ার্ডে রেখে কিছু এলাকায় সংখ্যালঘু ভোট ভাগ করার চেষ্টা হয়েছে। কোন বুথ কোন ওয়ার্ডে যাচ্ছে, সেই তথ্য প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির সঙ্গে আলোচনার পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তারা। এগুলি বিরোধীদের অভিযোগ; আদালতের প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত নয়।
গত আগস্টে রাজ্য বিধানসভায় সংশোধনী বিল পাশ করে কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ডসংখ্যা ১৪৪ থেকে ২০৯ করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অর্থাৎ, যুক্ত হওয়ার কথা আরও ৬৫টি ওয়ার্ড। একই সঙ্গে হাওড়া পুরসভার ওয়ার্ডসংখ্যা ৫০ থেকে ৬৮ করার বিলও পাশ হয়। কলকাতার ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন শহরের নির্বাচনী মানচিত্রে বড় রদবদল আনবে। নতুন সীমানা অনুযায়ী বাসিন্দাদের একাংশকে অন্য ওয়ার্ডের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে হবে।
সরকারের যুক্তি, জনসংখ্যার বণ্টন বদলেছে, তাই নাগরিক পরিষেবা দ্রুত পৌঁছে দিতে ওয়ার্ড পুনর্গঠন প্রয়োজন। বিধানসভায় পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এই যুক্তিই তুলে ধরেছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছিলেন, খসড়া প্রকাশের আগে এবং চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে সর্বদলীয় বৈঠক হবে। ফলে ঘোষিত পরামর্শপ্রক্রিয়া এবং বাস্তবে নাগরিক ও রাজনৈতিক দলগুলির অংশগ্রহণের সুযোগ কতটা মিলেছে, সেই প্রশ্নও বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে।
প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমও বিধানসভায় বলেছিলেন, তিনি নীতিগতভাবে ওয়ার্ড পুনর্গঠনের বিরোধী নন। তবে কোন নীতি ও মাপকাঠিতে সীমানা বদলানো হচ্ছে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। পুরো প্রক্রিয়া কেবল আমলাদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়েও তিনি আপত্তি জানিয়েছিলেন। অর্থাৎ, বিতর্কটি শুধু আসনসংখ্যা বাড়ানো নিয়ে নয়; নতুন মানচিত্র তৈরির ভিত্তি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশাসনের তরফে পুনর্বিন্যাসের পক্ষে যে সমস্যাটি দেখানো হয়েছে, তা হল ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে বিপুল ভোটারবৈষম্য। জুলাইয়ে পুর প্রশাসক স্মিতা পাণ্ডে জানিয়েছিলেন, কোথাও নথিভুক্ত ভোটার প্রায় ৮৫ হাজার, আবার কোথাও মাত্র ১০ হাজার। উত্তর কলকাতার কয়েকটি এলাকায় জনসংখ্যা স্থির বা কমলেও দক্ষিণ ও পূর্ব কলকাতার বিভিন্ন অংশে বসতি বেড়েছে। এর ফলে একজন কাউন্সিলরের দায়িত্বে থাকা মানুষের সংখ্যা এবং পরিষেবার চাপের সঙ্গে অন্যজনের দায়িত্বের বড় ফারাক তৈরি হচ্ছে। সেই ব্যবধান কমানোই প্রশাসনের ঘোষিত লক্ষ্য।
তবে এই পরিসংখ্যান থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হল পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন এবং পুনর্বিন্যাসের পদ্ধতি দুটি পৃথক প্রশ্ন। জনসংখ্যার বৈষম্য কমানোর যুক্তি থাকলেও প্রতিটি নতুন সীমানার যুক্তি নাগরিকদের কাছে বোধগম্য হওয়া দরকার। পাশাপাশি থাকা পাড়া কেন ভাগ হচ্ছে, কোন তথ্যের ভিত্তিতে নতুন ওয়ার্ড তৈরি হচ্ছে এবং আপত্তি জানানোর সুযোগ কতটা কার্যকর—এসবই প্রতিনিধিত্বের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ভোটের আগে মানচিত্র বদলালে প্রার্থী ও ভোটার উভয়ের প্রস্তুতিতেও তার প্রভাব পড়ে। নাগরিকদের কাছে বিষয়টি নিছক প্রশাসনিক কাগজপত্রের পরিবর্তন নয়; এলাকার সমস্যা নিয়ে কাকে জবাবদিহির মুখে দাঁড় করাবেন, সেই প্রশ্নও এই সীমানার সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে।
এখন নজর হাইকোর্টের পরবর্তী শুনানির দিকে। আবেদনকারীর আপত্তি এবং পুনর্বিন্যাসের পদ্ধতি নিয়ে আদালত কী অবস্থান নেয়, তার ওপর মামলার পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করবে।