বাংলাস্ফিয়ারঃ কলকাতায় এক দন্তচিকিৎসককে ধর্ষণের মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগের তদন্তে উঠে এল আরও একাধিক অভিযোগের হদিস। গ্রেফতার হয়েছেন সন্তোষপুরের বাসিন্দা, ৩১ বছর বয়সি এক মডেল ও টেলিভিশন অভিনেত্রী। পুলিশের দাবি, প্রায় ১৪ জনের বিরুদ্ধে তাঁর দায়ের করা ধর্ষণ ও যৌন হেনস্থার ১১টি অভিযোগে অসংগতি মিলেছে। সেগুলিকে ‘মিথ্যা’ বলে সন্দেহ করছেন তদন্তকারীরা। তবে এই দাবি নিয়ে তদন্ত চলছে; সব অভিযোগ মিথ্যা বলে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশিত প্রতিবেদনে নেই। পুলিশ জানিয়েছে, ১১টি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটিই দায়ের করা হয়েছে চলতি বছরে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৮ সেপ্টেম্বর ওই মহিলাকে গ্রেফতার করা হয়। দন্তচিকিৎসকের আইনজীবী প্রসেনজিৎ সেন জানিয়েছেন, ৬ অক্টোবর চিকিৎসককে ঘিরে তোলাবাজির মামলায় তিনি জামিন পেয়েছেন। তবে অন্য একটি তোলাবাজির মামলায় তাঁকে ১৪ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়েছে। ফলে একটি মামলায় জামিন মিললেও তাঁর মুক্তি হয়নি।

ঘটনার সূত্রপাত ওই চিকিৎসকের সঙ্গে মহিলার পরিচয় থেকে। তিনি আগে চিকিৎসকের রোগী ছিলেন। চিকিৎসকের স্ত্রীর অভিযোগ, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে পরের বছরের জানুয়ারির মধ্যে তাঁর স্বামীকে বারবার বিরক্ত করা এবং ভয় দেখানো হয়। মহিলার দাবি না মানলে মিথ্যা অভিযোগে জড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। এই ঘটনায় ৯ এপ্রিল পঞ্চসায়র থানায় মামলা নথিভুক্ত হয়। টাকা আদায়ের জন্য ভয় দেখানো এবং হুমকির অভিযোগে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ধারায় তদন্ত শুরু করে পুলিশ। পুলিশ সূত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে সন্তোষপুরের বাড়ির কাছ থেকে মহিলাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরদিন তাঁকে আদালতে হাজির করে পুলিশ নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানায়। এর আগেই চিকিৎসকের স্ত্রীর অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়েছিল।

সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সন্তোষপুরে চিকিৎসকের চেম্বারে যাওয়ার পর থেকেই তাঁর কাছে টাকা চাওয়ার অভিযোগ ওঠে। চিকিৎসকের দাবি, পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে, তাঁকে মিথ্যা মামলায় জড়ানো হতে পারে বলে আগাম পুলিশকে জানিয়েছিলেন। তদন্তকারীদের বক্তব্য, পূর্ব যাদবপুর থানাকে বিষয়টি জানানোর তথ্যও তাঁদের নজরে এসেছে। এরপর মহিলার অভিযোগের ভিত্তিতে চিকিৎসক গ্রেফতার হন। তিনি জামিন পাওয়ার পর তাঁর স্ত্রী আলিপুর আদালতের দ্বারস্থ হয়ে অভিযোগ করেন, স্বামীকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে। আদালতের কাছে যথাযথ তদন্ত চেয়ে আবেদন জানান তিনি।

সেই আবেদনের পর পুলিশকে অভিযোগ পরীক্ষা করতে নির্দেশ দেয় আদালত। তদন্তকারীদের দাবি, চিকিৎসকের কাছ থেকে টাকা চেয়ে বারবার হুমকি দেওয়ার বিষয়টি অনুসন্ধানে উঠে আসে। একই সঙ্গে অন্য কয়েকজনের ক্ষেত্রেও অনুরূপ অভিযোগের সন্ধান মেলে। পুলিশের বক্তব্য, মহিলার দায়ের করা মামলায় অভিযুক্ত হয়েছিলেন, এমন অন্তত দু’জন পরে তাঁর বিরুদ্ধেই তোলাবাজির অভিযোগ জানিয়েছেন। ফলে একজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের অনুসন্ধান থেকে তদন্তের পরিধি আরও বাড়ে। টাকা দাবির সঙ্গে আগের মামলাগুলির কোনও যোগ ছিল কি না, সেটিও যাচাই করা হচ্ছে।

চিকিৎসকের আরও দাবি, নতুন রোগী জোগাড়ের কথা বলে মহিলা তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। পরে উপহার, খাবার এবং টাকা চাইতে থাকেন। ভয় পেয়ে তিনি বিভিন্ন সামগ্রী পাঠান এবং ৪০ হাজার টাকাও দেন বলে অভিযোগ করেছেন। অন্যদিকে, মেনস রাইটস ফোরামের নন্দিনী ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, অভিযোগ তোলা কয়েকজনকে তাঁদের সংগঠন আইনি সহায়তা দিচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযোগগুলির সূত্র ছড়িয়ে রয়েছে দক্ষিণ কলকাতার একাধিক থানা এলাকায়। সেই তালিকায় রয়েছে সার্ভে পার্ক, রবীন্দ্র সরোবর, কসবা, রিজেন্ট পার্ক, যাদবপুর এবং গল্ফগ্রিন। যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে চিকিৎসক ছাড়াও অটোচালক এবং জিমের মালিক রয়েছেন বলে পুলিশ সূত্রের দাবি। অর্থাৎ, তদন্তে উঠে আসা ঘটনাগুলি কোনও একটি পেশা বা একটি এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তবে কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ হয়েছিল এবং কোন অভিযোগের তদন্ত কত দূর এগিয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ পৃথক বিবরণ এখনও সামনে আসেনি।

এক জাতীয় স্তরের টেবিল টেনিস খেলোয়াড়ও টাকা ও উপহার দাবির অভিযোগ করেছেন। তাঁর দাবি, ২০১৯ সালে ফেসবুকে পরিচয় হয়েছিল। পরে দাবি না মানায় বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ তোলা হয়। একসঙ্গে থাকার দাবিও তিনি অস্বীকার করেছেন। ইউরোপে প্রতিযোগিতায় থাকার সময় পুলিশের ফোন পেয়ে তাঁকে আগাম জামিন নিতে হয় বলে জানিয়েছেন ওই খেলোয়াড়।

এদিকে গ্রেফতারের সময় দুই মহিলা কনস্টেবলকে মারধরের অভিযোগেও ওই মডেলের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা হয়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সন্তোষপুরে তাঁর বাড়ির বাইরে ঘটনাটি ঘটে। পঞ্চসায়র থানার পুলিশকে গ্রেফতারে সাহায্য করতে গিয়েছিলেন দুই মহিলা কনস্টেবল। পুলিশের অভিযোগ, গ্রেফতারের কারণ জানানোর পর অভিযুক্ত বাধা দেন এবং গালিগালাজ করেন। তাঁকে পুলিশের গাড়িতে তুলতে গেলে এক কনস্টেবলের হাত মুচড়ে দেন এবং দু’জনকে আঘাত করেন বলে অভিযোগ। দু’জনেরই বাঘাযতীন স্টেট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা হয়। সরকারি কর্মীর কাজে বাধা, আক্রমণ ও হুমকির অভিযোগে এই আলাদা তদন্ত চলছে।

তবে তোলাবাজির অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন মডেলের আইনজীবী তীর্থঙ্কর রায়। তাঁর বক্তব্য, মক্কেলের অভিযোগে চিকিৎসক গ্রেফতার হয়েছিলেন এবং পুলিশ চার্জশিটও দিয়েছে। চিকিৎসকের স্ত্রীর পাল্টা অভিযোগকে তিনি প্রতিহিংসামূলক বলে দাবি করেছেন। ফলে পুলিশের তোলা প্রশ্নের পাশাপাশি অভিযুক্তের এই বক্তব্যও মামলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এই ঘটনায় তাই দুটি বিষয়কে পৃথকভাবে দেখা প্রয়োজন: মহিলার দায়ের করা যৌন অপরাধের অভিযোগ এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা টাকা আদায়ের অভিযোগ। একটির তদন্ত অন্যটির প্রমাণের বিকল্প নয়। অভিযোগের সংখ্যা যতই হোক, প্রত্যেকটির সত্যতা নির্ধারণ করতে হবে সংশ্লিষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে। আপাতত তদন্তকারীদের দাবি, অভিযোগকারীদের বক্তব্য এবং অভিযুক্তের অস্বীকারের মধ্যেই মামলার অবস্থান স্পষ্ট হচ্ছে; অপরাধ প্রমাণের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনও বাকি।