বাংলাস্ফিয়ার: কলকাতার ই এম বাইপাসের ধারে জলাভূমি ও নিকাশি খাল ভরাট করে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে সরেজমিনে তদন্ত করল রাজ্য সরকারের দুর্নীতি তদন্ত কমিশন। শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, কলকাতা পুলিশের উপস্থিতিতে একটি ধাবা এবং সংলগ্ন বেকারি পরিদর্শন করেন কমিশনের প্রতিনিধিরা। নির্মাণের নকশা ও জমির সীমানাও পরীক্ষা করা হয়।

তদন্তের সূত্রপাত মনোজকুমার বর্মনের অভিযোগ থেকে। গত বছরের আগস্টে তিনি অভিযোগ করেন, জলাভূমি ভরাট করে ধাবাটি তৈরি হয়েছে। ব্যবসার জায়গা বাড়াতে প্রাকৃতিক নিকাশি খালের অংশও দখল করা হয়েছে বলে অভিযোগ। প্রাথমিকভাবে প্রায় চার কাঠা জলাভূমি দখলের বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।

ধাবাটির সঙ্গে তৃণমূলের এক প্রাক্তন স্থানীয় কাউন্সিলরের যোগ রয়েছে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে ছাড়পত্রের নিয়ম এড়ানো হয়েছিল কি না, তা তদন্তের আওতায়। জলাশয়ের শ্রেণি বদলে বাণিজ্যিক জমি দেখানোর জন্য নথিতে কারচুপি হয়েছিল কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হচ্ছে।

জমির রাজস্বসংক্রান্ত কাগজপত্র, পুরসভার অনুমোদিত নকশা এবং পুরনো উপগ্রহচিত্র মিলিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। উদ্দেশ্য, জমির আগের অবস্থা ও পরবর্তী নির্মাণের সময়ক্রম নির্ধারণ করা। তবে এগুলি এখনও তদন্তাধীন অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়ম প্রমাণিত হয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত ওই প্রতিবেদন থেকে টানা যায় না।

এই তদন্তের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট কলকাতার পূর্ব প্রান্তের জলাভূমি সংরক্ষণ। পূর্ব কলকাতা জলাভূমি কর্তৃপক্ষের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে বারো হাজার হেক্টর বিস্তৃত এই অঞ্চল ২০০২ সালের আগস্টে রামসার স্বীকৃতি পায়। আন্তর্জাতিক গুরুত্বের এই জলাভূমি কলকাতার ব্যবহৃত জল প্রাকৃতিক উপায়ে পরিশোধনের কাজে লাগে। পাশাপাশি সেই জলকে কাজে লাগিয়ে মাছ চাষ ও কৃষিকাজ হয়।

সরকারি বিবরণে বলা হয়েছে, প্রায় চার হাজার হেক্টর জুড়ে থাকা মাছের ভেড়ির মধ্য দিয়ে বর্জ্যজল প্রবাহিত হয়। সূর্যালোকের সাহায্যে সেখানে বিভিন্ন জৈব ও রাসায়নিক প্রক্রিয়া চলে। স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় তৈরি এই ব্যবস্থা শহরের বর্জ্যকে উৎপাদনের সম্পদে পরিণত করেছে। ফলে জলাভূমির গুরুত্ব পরিবেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে মানুষের জীবিকা এবং শহরের অর্থনীতির সঙ্গেও যুক্ত।

এই ব্যবস্থার বিশেষত্ব হল, জল পরিশোধন এবং খাদ্য উৎপাদন একই প্রক্রিয়ার অংশ। জলাভূমি কর্তৃপক্ষের বিবরণ অনুযায়ী, স্থানীয় কৃষক ও মৎস্যজীবীদের কাজের মধ্য দিয়েই এই সম্পদ পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা টিকে রয়েছে। ভেড়ি, কৃষিজমি এবং জল বহনকারী খালের পারস্পরিক সম্পর্ক তাই সংরক্ষণের আলোচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি অংশের পরিবর্তনকে সম্পূর্ণ ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে সমস্যার পূর্ণ চেহারা বোঝা কঠিন।

রামসার কনভেনশনের জলাভূমি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত একটি বিবরণেও কলকাতার সম্প্রসারণের সঙ্গে জলাভূমিতে দখলের চাপ বাড়ার কথা বলা হয়েছে। সেখানে মাছ চাষের উপযোগী বর্জ্যজলের পরিমাণ ও মান নিয়েও উদ্বেগের উল্লেখ রয়েছে।

জলাভূমি ভরাটের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে নাজিরাবাদের দুটি গুদামে আগুন লাগার পরে সেগুলির জমি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আট বিঘার ওই জমিতে আগে মাছের ভেড়ি ছিল। পূর্ব কলকাতা জলাভূমি কর্তৃপক্ষের এক আধিকারিকও গুদাম দুটি সংরক্ষিত জলাভূমি অঞ্চলে থাকার কথা স্বীকার করেছিলেন। ওই প্রতিবেদনে ভেড়ি ভরাটের বিরুদ্ধে পাঁচশোর বেশি এফআইআর করার কথাও জানিয়েছিল কর্তৃপক্ষ।

এই পটভূমিতে বাইপাসের তদন্তের তাৎপর্য হল, জমির বাস্তব অবস্থার সঙ্গে সরকারি নথির মিল পরীক্ষা করা। অভিযোগের নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট জমির নির্ভরযোগ্য তথ্য, অনুমোদনের ইতিহাস এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য। বৃহত্তর জলাভূমি অঞ্চলে অন্যত্র অনিয়মের নজির থাকলেই এই দুটি প্রতিষ্ঠানের দায় প্রতিষ্ঠিত হয় না। আবার তদন্ত শুরু হওয়াকেই সমস্যার সমাধান বলা যায় না। চূড়ান্ত অনুসন্ধানে কী পাওয়া যায় এবং তার ভিত্তিতে কী ব্যবস্থা হয়, সেটিই হবে এই ঘটনার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।