বাংলাস্ফিয়ার: নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা উপনির্বাচনে বিজেপির বিপুল জয়ের পর নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে সরব হল সিপিএম ও কংগ্রেস। শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ফল ঘোষণার পরে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম এই জয়কে ‘ভোট লুটের প্লাটিনাম মডেল’ বলে আক্রমণ করেন। কংগ্রেসও ভোটপ্রক্রিয়াকে প্রহসন আখ্যা দিয়ে অনিয়ম, প্রশাসনের অপব্যবহার এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

সেলিমের অভিযোগ, ভোটের আগেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জয়ের ব্যবধান ঘোষণা করেছিলেন। তাঁর দাবি, ভোটে অনিয়ম ঘটিয়েই সেই ফল নিশ্চিত করা হয়েছে। ‘প্লাটিনাম মডেল’ কথাটির মাধ্যমে তিনি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডায়মন্ড হারবারকে ঘিরে প্রচলিত ‘ডায়মন্ড মডেল’কে কটাক্ষ করেন। তৃণমূল আমলে যে নির্বাচনী আধিপত্য নিয়ে বিরোধীরা অভিযোগ তুলতেন, বিজেপির শাসনে তা আরও তীব্র হয়েছে বলেই বোঝাতে চেয়েছেন সেলিম।

নির্বাচন কমিশনকেও সরাসরি নিশানা করেছেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক। তাঁর অভিযোগ, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে আইন ও সংবিধানসম্মত নির্বাচনী ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়েছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরের মাধ্যমে মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করার পরিবর্তে কমিশন শাসকদলের সুবিধা করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ তুলে ফের জ্ঞানেশের পদত্যাগ দাবি করেন সেলিম।

কংগ্রেসের অভিযোগ, দুই কেন্দ্রেই বুথস্তরে অনিয়ম এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার ঘটেছে। গণনা চলাকালীনই দলের নেতারা ভোটপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আপত্তি জানান এবং নির্বাচন বাতিল করে নতুন করে ভোট নেওয়ার দাবি তোলেন। নন্দীগ্রামে তাদের প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থন করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু সেই সমর্থন সত্ত্বেও বিজেপির সঙ্গে ব্যবধান কমাতে পারেনি কংগ্রেস। বিজেপি অবশ্য বিরোধীদের অনিয়মের অভিযোগ খারিজ করেছে।

পুনর্নির্বাচনের দাবি ফল ঘোষণার পরে প্রথম ওঠেনি। ৬ অক্টোবর ভোটের দিনই প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার প্রতিনিধিদলসহ মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তরে যান। তাঁর অভিযোগ ছিল, নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের ঘটনাবলি দেখাচ্ছে কীভাবে ভোট চুরি হচ্ছে। ভোট বাতিল করে আবার নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানান তিনি। ভোটারদের বাধা দেওয়া এবং বিরোধী এজেন্টদের বুথে থাকতে না দেওয়ার অভিযোগও সামনে আসে।

নন্দীগ্রামের এক বুথে কয়েকজন মহিলা অভিযোগ করেন, তাঁদের ভোটের স্লিপ কেড়ে নেওয়ায় তাঁরা ভোট দিতে পারেননি। রেজিনগরে মমতা শিবিরের তৃণমূল প্রার্থীর দাবি, ৩১৫টি বুথে এজেন্ট দেওয়া হলেও মাত্র ২৫ থেকে ৩০টি বুথে তাঁরা থাকতে পেরেছিলেন। ভোটার ও এজেন্টদের অধিকার কতটা সুরক্ষিত ছিল, প্রশ্ন বিরোধীদের।

দুই আসনে উপনির্বাচনের কারণও আলাদা। বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুরে জেতার পরে শুভেন্দু ভবানীপুর রাখায় নন্দীগ্রাম খালি হয়। রেজিনগর ও নওদায় জেতার পরে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির নেতা হুমায়ুন কবীর নওদা রেখে দেন। বিজেপি রাজ্যে সরকার গঠনের পর এই দুই কেন্দ্রের ভোট তাই শাসকদল এবং বিরোধীদের কাছে রাজনৈতিক শক্তি যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠেছিল।

ঘোষিত ফল অনুযায়ী, নন্দীগ্রামে বিজেপির জয়ের ব্যবধান ১ লক্ষ ২২ হাজার ৭৫৩ ভোট। রেজিনগরে ব্যবধান ৭৫ হাজার ৮১৬। নন্দীগ্রামে বাম প্রার্থী তৃতীয় এবং রেজিনগরে পঞ্চম স্থানে শেষ করেছেন। ফলে দুই কেন্দ্রেই বিরোধী শিবিরের সাংগঠনিক শক্তি ও ভোট ধরে রাখার ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে সিপিএম ও কংগ্রেসের বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে ভোটদানের স্বাধীনতা এবং কমিশনের নিরপেক্ষতা।

অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই ফলকে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সমর্থনের প্রতিফলন বলে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর দাবি, হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ভোটারই বিজেপিকে সমর্থন করেছেন এবং সংখ্যালঘুদের একটি বড় অংশ শাসকদলের পাশে এসেছে। বিশেষত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রেজিনগরে জয়কে বিজেপি রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। ফলে একই ফলকে ঘিরে সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে এসেছে: বিজেপির কাছে এটি জনসমর্থনের প্রমাণ, বিরোধীদের কাছে নির্বাচনী অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ। ফলাফল নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর অব্যাহত।