শীতের আমেজে পাহাড়ি ট্রেকে বেরিয়েছিলেন একদল স্বপ্নচারী অভিযাত্রী। উদ্দেশ্য ছিল উত্তরাখণ্ডের দুর্গম কেদারতাল জয় করা। কিন্তু আনন্দ ও রোমাঞ্চের সেই সফরই এখন এক গভীর ট্র্যাজেডিতে রূপ নিয়েছে। প্রবল তুষারপাত, ধস এবং প্রকৃতির রুদ্ররূপের জেরে কেদারতালের উচ্চ পাহাড়ি পথে আটকে পড়েছেন আটজন অভিযাত্রী। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার পাঁচজন ট্রেকারসহ মোট আটজনের কোনো খোঁজ মিলছে না। আকাশপথ ও স্থলপথে উদ্ধার অভিযান চলছে ঠিকই, কিন্তু দুর্গম ভূখণ্ড আর প্রতিকূল আবহাওয়া এক অদৃশ্য দেওয়াল হয়ে আটকে রেখেছে উদ্ধারকারীদের। কেন বারবার হিমালয়ের কোলে হারিয়ে যায় এমন বহু প্রাণ? কোথায় ঘাটতি থেকে যায় প্রস্তুতি বা ব্যবস্থাপনায়?

২৭ অক্টোবরের সেই যাত্রা

প্রশাসনিক সূত্র অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর উত্তরাখণ্ডের গঙ্গোত্রী থেকে কেদারতালের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল ১২ জনের একটি ট্রেকার দল। দলে ট্রেকারদের পাশাপাশি স্থানীয় গাইড এবং সহায়ক কর্মীরাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৯ অক্টোবর তাঁদের ফিরে আসার কথা ছিল। কিন্তু ৩০ অক্টোবর প্রশাসনের কাছে খবর পৌঁছায় যে, হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রা এবং আকস্মিক প্রবল তুষারপাতে দলের একটি অংশ আটকে পড়েছে। পরবর্তীতে তল্লাশি চালিয়ে দলের তিন পোর্টার ও এক রাঁধুনিকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও, বাকি আটজনের ভাগ্য এখনও অনিশ্চিত।

যাঁদের খোঁজ মেলেনি, সেই আট অভিযাত্রী হলেন: তাপস বাউরি (পশ্চিমবঙ্গ, বাঁকুড়া), রতন ঘোষ (পশ্চিমবঙ্গ, বাঁকুড়া), মনোজ খোভাস (পশ্চিমবঙ্গ, বাঁকুড়া), রিন্টু মণ্ডল (পশ্চিমবঙ্গ, বাঁকুড়া), উদয় ঘোষ (পশ্চিমবঙ্গ, বাঁকুড়া), বর্তিকা ভার্মা (উত্তরপ্রদেশ, লখনউ), দীপিকা ভার্মা (উত্তরপ্রদেশ, লখনউ), সিদ্ধার্থ রানা (স্থানীয় গাইড, বয়স ২৫, উত্তরকাশীর ভাটওয়াড়ি)

আকাশ থেকে মাটি—কেন থমকে আছে উদ্ধারকাজ?

কেদারতালের উচ্চ পাহাড়ি পথ (বিশেষ করে ভোজখড়কের ওপরের অংশ) অত্যন্ত চড়াই-উতরাই ও বিপজ্জনক। নিখোঁজদের সন্ধানে প্রথম দিকে হেলিকপ্টার দিয়ে আকাশপথে (Aerial Search) তল্লাশির চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু গভীর বরফ, ভূখণ্ডের আড়াল এবং দৃশ্যমানতার অভাবে নিখোঁজদের তাঁবু বা কোনো নির্দিষ্ট চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি।

পাহাড়ে মানচিত্রের দূরত্ব আর মাটিতে পৌঁছনোর দূরত্ব সম্পূর্ণ আলাদা। মাঝখানে খাড়া ঢাল, ভাঙা পথ এবং নতুন জমা বরফের পুরু স্তরের কারণে উদ্ধারকারী দলের পক্ষেও প্রতি পদক্ষেপে মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে উত্তরাখণ্ড প্রশাসন পরবর্তীতে ১০ সদস্যের একটি বিশেষ মাউন্টেন রেসকিউ টিমকে এয়ারলিফট করে সরাসরি মাটিতে নামানোর ব্যবস্থা করে। বর্তমানে এনডিআরএফ (NDRF), এসডিআরএফ (SDRF), বন বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে এই উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছে।

যোগাযোগের ফাঁকফোকর ও আবহাওয়ার মারপ্যাচ

গঙ্গোত্রী জাতীয় উদ্যানের আধিকারিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দলটি রওনা হওয়ার পরে ২৯ অক্টোবরের খারাপ আবহাওয়া নিয়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। কিন্তু ততক্ষণে পাহাড়ের গভীরে থাকা ট্রেকারদের সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় সেই বার্তা তাঁদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠে আসে—প্রশাসন বা আয়োজকদের সতর্কতা বার্তা যদি পাহাড়ের পথে থাকা দলের কাছে না পৌঁছায়, তবে সেই সতর্কতার কার্যকারিতা কোথায়? পাহাড়ি উপত্যকায় কেবল মোবাইল ফোন বা স্যাটেলাইট যোগাযোগের ওপর নির্ভর করলেই নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত হয় না। স্থানীয় নেটওয়ার্ক, গাইডদের হাতে বিকল্প যোগাযোগের ব্যবস্থা এবং প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের জায়গাতে এক বিশাল ফাঁক থেকে যায়। আবহাওয়ার মতিগতি কখন বদলে যাবে, তা সব সময় আগে থেকে আন্দাজ করা সম্ভব হয় না, আর সেই বদলের খবর সঠিক সময়ে দলের কাছে না পৌঁছানোই দুর্ঘটনার মূল অনুঘটক হয়ে দাঁড়ায়।

উদ্ধারকারীদের ঝুঁকি ও সময়ের টিকটক

পরিবারগুলোর কাছে প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে চরম উৎকণ্ঠায়। অন্যদিকে, উদ্ধারকারীদের কাছে সময় এবং নিরাপত্তার হিসাব সমানভাবে জরুরি। তুষারধসের পর হুট করে অভিযান চালানো যায় না; নতুন করে ধস নামার আশঙ্কা বা উদ্ধারকারীরা নিজেরাও বিপদে পড়তে পারেন কি না, তা খতিয়ে দেখতে হয়।

হেলিকপ্টার পাঠালেই নিমেষে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে—শহুরে মনস্তত্ত্বে এমন ধারণা থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। হেলিকপ্টার কোথায় অবতরণ করতে পারবে, কতজনকে একসাথে এয়ারলিফট করা সম্ভব এবং মাটিতে নেমে উদ্ধারকারীদের কাছে দড়ি, চিকিৎসা সরঞ্জাম বা উষ্ণ পোশাক পৌঁছানো যাচ্ছে কি না—প্রতিটি ধাপে রয়েছে শত বাধার পাহাড়।

বাংলার পাহাড়প্রেমীদের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা

কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে যাঁরা শীতের শুরুতে হিমালয়ের বিভিন্ন ট্রেকিং রুটে পা বাড়ান, তাঁদের কাছে পাহাড় মানেই অদম্য আকর্ষণ। কিন্তু কেদারতালের এই ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, শুধুমাত্র রোমাঞ্চ বা ভ্রমণের আনন্দ উপভোগ করলেই হয় না, এর পেছনের প্রস্তুতি কতখানি নিখুঁত হওয়া জরুরি।

বুকিং করার সময় কেবল দিন সংখ্যা ও খরচের হিসাব দেখলে পাহাড়ের আসল বিপদগুলো আড়ালে থেকে যায়। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় সফর কীভাবে বাতিল বা পরিবর্তন করতে হবে, কার সাথে যোগাযোগ করতে হবে এবং দলের দায়িত্ব কার কাঁধে থাকবে—এই বিষয়গুলো আগে থেকেই নির্ধারিত থাকা উচিত।

শেষ আশার আলো

এই মুহূর্তে দেশের বা রাজ্যের পাহাড়প্রেমীদের একটাই প্রার্থনা—নিখোঁজ আটজন মানুষ যেন সুস্থভাবে ফিরে আসেন। যতদিন পর্যন্ত তাঁদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান চিহ্নিত করে নিরাপদে উদ্ধারের কোনো নিশ্চিত সরকারি খবর না আসছে, ততদিন এই উদ্ধার অভিযান এবং উৎকণ্ঠাই সকলের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকবে। প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার কাছে হার না মেনে কেদারতালের বরফঘেরা উপত্যকা থেকে সুসংবাদ আসার অপেক্ষায় আজ গোটা বাংলা।