বাংলাস্ফিয়ার: রাজ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও আইন-শৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে ফের এক চাঞ্চল্যকর এবং মর্মান্তিক অভিযোগ সামনে এল। বান্ধবীর সঙ্গে দেখা করতে বেরিয়ে বাগুইআটির এক স্কুলছাত্রী অপহরণের শিকার হন এবং তাঁকে ব্যান্ডেলের একটি হোটেলে নিয়ে গিয়ে একাধিক ব্যক্তি মিলে গণধর্ষণ করে বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, সেই নিগ্রহের দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করে তা নাবালিকার মায়ের মোবাইলে পাঠিয়ে লাগাতার ব্ল্যাকমেল ও আর্থিক extortion (টাকা আদায়)-এর চেষ্টা চালাচ্ছে অভিযুক্তরা। এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই বাগুইআটি থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে নির্যাতিতার পরিবার। পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার বা আটক করা সম্ভব হয়নি।
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে: বান্ধবীর সঙ্গে দেখা ও নিখোঁজ রহস্য
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ অক্টোবর, শনিবার দুপুরে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল ওই নাবালিকা স্কুলছাত্রী। প্রথমে জানানো হয়েছিল, বিরাটিতে এক বান্ধবীর সঙ্গে দেখা করতেই সে যাচ্ছে এবং সন্ধ্যার মধ্যে ফিরে আসবে। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে রাত সাড়ে আটটা বেজে যাওয়ার পরেও বাড়ি না ফেরায় দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মা মেয়েকে ফোন করেন। সেই সময় ফোনে মেয়েটি জানায় যে সে বান্ধবীর সঙ্গে ব্যারাকপুরে রয়েছে এবং ফিরতে রাত দশটা-এগারোটা বাজবে।
কিন্তু রাত এগারোটার পরেও মেয়ের খোঁজ না মেলায় মা যখন পুনরায় যোগাযোগের চেষ্টা করেন, তখন ফোন বেজে গেলেও কেউ ধরেনি। এরপরই একটি অজানা নম্বর থেকে মায়ের ফোনে একটি অচেনা পুরুষের কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। ওই ব্যক্তি দাবি করেন যে, রাস্তায় নাবালিকাকে কাঁদতে দেখে তিনি তাকে নিজের কাছে আশ্রয় দিয়েছেন এবং নিজের ফোনটি ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছেন। সংক্ষিপ্ত এই কথোপকথনের পরই ফোন কেটে যায়।
মধ্যরাতের মেসেজ ও বিভ্রান্তিকর ফোন কল
পরিবারের উদ্বেগ যখন চরমে, ঠিক তখনই রাত ১২টা বেজে ৬ মিনিটে মায়ের ফোনে একটি টেক্সট মেসেজ আসে। সেই মেসেজে ভয়ের সুরে মেয়েটি লেখে যে সে চরম বিপদের মধ্যে রয়েছে এবং তার বান্ধবী তাকে ‘ঋক’ নামের এক ব্যক্তির বাড়িতে নিয়ে গেছে।
এই মেসেজের কিছু সময় পর দেবজিৎ সরকার নামে এক ব্যক্তি নির্যাতিতার পরিবারকে ফোন করে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। পরিবারকে জানানো হয়, নাবালিকা সম্পূর্ণ নিরাপদে রয়েছে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হবে। কিন্তু সেই আশ্বাসের পরেও রাতে আর বাড়ি ফেরেনি মেয়েটি।
বাড়ি ফিরে কান্নার রোল ও বীভৎস নির্যাতনের বিবরণ
অবশেষে পরের দিন অর্থাৎ রবিবার সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ বাড়ি ফিরে আসে ওই স্কুলছাত্রী। ঘরে ঢুকেই সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। মেয়েকে অত্যন্ত আতঙ্কিত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় দেখে মা তার কাছে ঘটনার বিস্তারিত জানতে চান।
মায়ের কাছে তখন একের পর এক ভয়াবহ তথ্য প্রকাশ করে ওই নাবালিকা। সে জানায়, বান্ধবীর এক পরিচিতের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর তাকে ঠান্ডা পানীয়ের সঙ্গে কোনো শক্তিশালী মাদকজাতীয় পদার্থ মিশিয়ে খেতে বাধ্য করা হয়। সেই পানীয় পানের পরই সে ঝিমিয়ে পড়ে এবং আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। সেই সুযোগেই একাধিক ব্যক্তি তার ওপর শারীরিক নির্যাতন ও যৌন হেনস্থা চালায়। শুধু তাই নয়, জ্ঞান ফেরার পর তাকে জোর করে গর্ভনিরোধক বড়িও খাওয়ানো হয় বলে অভিযোগ।
ভিডিয়ো দেখিয়ে ব্ল্যাকমেল ও পুলিশের ভূমিকা
নির্যাতিতার পরিবারের আরও অভিযোগ, ওই অমানবিক ও পৈশাচিক ঘটনার সময়কার একটি ভিডিও রেকর্ড করে রেখেছিল অভিযুক্তরা। পরবর্তীতে সেই আপত্তিকর ভিডিও নাবালিকার মায়ের ফোনে পাঠিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয় এবং মুখ বন্ধ রাখার জন্য হুমকি দেওয়া হয়। প্রথমে চরম সামাজিক ভয় ও আতঙ্কের কারণে পরিবারটি পুলিশের কাছে যেতে সাহস পায়নি। তবে পরবর্তীতে সমস্ত পরিস্থিতির কথা জানিয়ে বাগুইআটি থানায় একটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করা হয়।
অভিযোগের ভিত্তিতে বাগুইআটি থানার পুলিশ পকসো (POCSO) আইন এবং ভারতীয় ন্যায় সংহিতার সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে। তবে এই ঘটনার কয়েক দিন কেটে গেলেও এখনও পর্যন্ত মূল অভিযুক্ত বা নির্যাতিতার বান্ধবী— কাউকেই আটক বা গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। দিনের পর দিন স্কুলছাত্রীদের নিরাপত্তা যে কতটা বিপন্ন, এই ঘটনায় তা নিয়ে সমাজের বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। পুলিশ প্রশাসন যত দ্রুত সম্ভব অভিযুক্তদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনবে কি না, এখন সেটাই দেখার।