খুনের মামলায় পুলিশের গাফিলতিপূর্ণ তদন্তের জেরে বিচারাধীন বন্দি হিসেবে ছয় বছর কারাগারে কাটাতে হয়েছে এক ব্যক্তিকে। এই ঘটনায় উত্তরপ্রদেশ পুলিশকে তীব্র ভর্ৎসনা করে সোমবার (২৬ অক্টোবর, ২০২৬) রাজ্য সরকারকে তাঁকে ছয় লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট।
শীর্ষ আদালত বলেছে, তদন্ত কীভাবে করতে হয়, সে বিষয়ে নিজেদের আধিকারিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়াই উত্তরপ্রদেশ পুলিশের পক্ষে সমীচীন হবে। রায়ের প্রতিলিপি রাজ্যের পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল এবং স্বরাষ্ট্রসচিবের কাছে পাঠানোরও নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে বিনোদ চন্দ্রনের বেঞ্চ বলেছে, “দুর্ভাগ্যজনক যে, আবেদনকারীর বিরুদ্ধে কোনও প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও তাঁকে বিচারাধীন বন্দি হিসেবে ছয় বছর কারাগারে থাকতে হয়েছে। গাফিলতিপূর্ণ তদন্তের ভিত্তিতে এলোমেলোভাবে মামলা চালানো হয়েছে। সৌভাগ্যক্রমে তার পরিণতিতে অভিযুক্ত খালাস পেয়েছেন। যেভাবে তদন্ত করা হয়েছে এবং মামলা পরিচালিত হয়েছে, তার নিন্দা না করে আমরা পারি না।”
২০১৯ সালে আগ্রায় দায়ের হওয়া একটি অপহরণ ও খুনের মামলায় ওই ব্যক্তির জামিনের আবেদন খারিজ করেছিল এলাহাবাদ হাই কোর্ট। সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে তিনি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। ২০১৯ সালের ১৪ নভেম্বর থেকে তিনি হেফাজতে ছিলেন।
গত ২৩ মার্চ তাঁর দীর্ঘ কারাবাস এবং অভিযোগপক্ষের মামলা সম্পূর্ণভাবে পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে সুপ্রিম কোর্ট বিচারিক আদালতকে তিন মাসের মধ্যে বিচার শেষ করার নির্দেশ দেয়। পরে বিচার সম্পন্ন হয় এবং ওই ব্যক্তি খালাস পান।
এরপর শীর্ষ আদালত নিজেই বিচারিক আদালতের রায় খতিয়ে দেখে। বেঞ্চ জানায়, তদন্তের ধরন দেখে তারা “স্তম্ভিত”। আদালতের ভাষায়, তদন্ত কীভাবে করা উচিত নয়, এই মামলা তারই এক “ধ্রুপদি দৃষ্টান্ত”। এর ফলে অভিযোগপক্ষ একজন মানুষের জীবন ও স্বাধীনতাকে বিপন্ন করেছে।
বেঞ্চ বলেছে, “বিচারের নামে এমন প্রহসন বহু মামলাতেই আমাদের চোখে পড়ে। কিন্তু কোনও কোনও ঘটনায় তা এতটাই নির্লজ্জ ও মর্মান্তিক হয়ে ওঠে—যেমন এই মামলায় হয়েছে—যে অভিযুক্তকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া প্রয়োজন। কারণ, তিনি নিজেই ব্যবস্থার শিকার। তাই আমরা রাজ্যকে নির্দেশ দিচ্ছি, এক মাসের মধ্যে আবেদনকারীকে ৬ লক্ষ টাকা দিতে হবে। যদিও কারাগারে কাটানো বছরগুলির তুলনায় এই অর্থ নিতান্তই সামান্য।”
আদালত আরও জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে বিলম্বের জন্য বার্ষিক ১৮ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে।
মামলার নথি পরীক্ষা করে বেঞ্চ বলেছে, এমনকি ন্যূনতম প্রাথমিক তদন্তটুকুও করা হয়নি। অভিযোগপক্ষ মাত্র ছয়জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করেছিল। নির্ভর করেছিল অভিযুক্তের স্বীকারোক্তির ওপর। অথচ সেই স্বীকারোক্তি দেওয়া হয়েছিল পুলিশের কাছে, ফলে তা আদালতে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য ছিল না।
তদন্তের আরও কয়েকটি গুরুতর ফাঁক তুলে ধরেছে আদালত। যে জায়গা থেকে কথিত খুনের শিকারের অগ্নিদগ্ধ হাড় উদ্ধার হয়েছিল, সেখান থেকে পাওয়া মোটরসাইকেলটি কখনও বিচারিক আদালতে পেশ করা হয়নি। মোটরসাইকেলের মালিক কে, তা-ও প্রতিষ্ঠা করা হয়নি।
উদ্ধার হওয়া হাড়ের ফরেনসিক পরীক্ষার ফলও প্রকাশ করা হয়নি। দেহাবশেষ সত্যিই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কি না, তা নির্ধারণের জন্য তাঁর বাবার ডিএনএ নমুনাও সংগ্রহ করা হয়নি। অভিযোগপক্ষ যে সিসিটিভি ফুটেজের ওপর নির্ভর করেছিল, তার সঙ্গেও সাক্ষ্য আইনের ৬৫বি ধারায় আবশ্যক শংসাপত্র ছিল না।
এই গাফিলতিগুলির কঠোর সমালোচনা করে বেঞ্চ বলেছে, নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব থেকে রাজ্য “গা বাঁচাতে পারে না”। বিশেষত, কোনও অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ বলে গণ্য করাই যখন নীতি।
বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, “নিছক অনুমান ও আন্দাজের ওপর দাঁড় করানো একটি মনগড়া কাহিনির জোরে একজন মানুষের জীবন থেকে ছয়টি বছর মুছে দেওয়া হয়েছে।”
আদালত আরও বলেছে, “তদন্তকারী সংস্থা এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনাকারী সংস্থাগুলির অস্তিত্বের উদ্দেশ্য কেবল যে কোনও উপায়ে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করানো নয়। তাদের বুঝতে হবে, বিচারপ্রদান ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ তারা। শুধু অপরাধের শিকার ব্যক্তি, প্রকৃত অভিযোগকারী ও আহতের জন্যই নয়, অভিযুক্তের জন্যও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা তাদের দায়িত্ব।”