অমিত শাহকে নিয়ে ২০১৮ সালের মন্তব্যের জেরে দায়ের হওয়া ফৌজদারি মানহানির মামলায় খালাস পেলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। সোমবার, ২৬ অক্টোবর, উত্তরপ্রদেশের সুলতানপুরের বিশেষ সাংসদ-বিধায়ক আদালত এই রায় দেয়। অতিরিক্ত মুখ্য বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট শুভম বর্মা রায় ঘোষণার সময় রাহুল আদালতে উপস্থিত ছিলেন। আদালতের সিদ্ধান্ত, সংশ্লিষ্ট মন্তব্য মানহানিকর ছিল না।
মামলার সূত্রপাত ২০১৮ সালের কর্নাটক বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারের সময়। বেঙ্গালুরুতে রাহুল তৎকালীন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহকে একটি হত্যা মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। বিজেপির সততা ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতির দাবির সঙ্গে দলের সভাপতির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রসঙ্গ মিলিয়ে তিনি রাজনৈতিক আক্রমণ করেন। ওই বক্তব্যের বিরুদ্ধেই সুলতানপুরের বিজেপি নেতা বিজয় মিশ্র মামলা দায়ের করেন।
রাহুলের মন্তব্যের পটভূমিতে ছিল সোহরাবুদ্দিন শেখের ভুয়ো সংঘর্ষে মৃত্যুর মামলা। সেই মামলায় শাহের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল। তবে ২০১৪ সালেই বিশেষ সিবিআই আদালত তাঁকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়েছিল। রাহুলের বক্তব্যের সময় শাহের সেই অব্যাহতির সিদ্ধান্ত বহাল ছিল। বর্তমান মামলায় বিচার্য ছিল, শাহের সম্পর্কে রাহুলের মন্তব্যে ফৌজদারি মানহানির অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল কি না। সুলতানপুরের আদালত সেই প্রশ্নেই কংগ্রেস নেতার পক্ষে রায় দিয়েছে।
অভিযোগকারী বিজয় মিশ্র সুলতানপুর জেলা বিজেপির প্রাক্তন সহসভাপতি। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৯ ও ৫০০ ধারায় মামলা হয়। আগে সংবাদমাধ্যমকে মিশ্র জানিয়েছিলেন, দীর্ঘদিনের বিজেপি কর্মী হিসেবে শাহের বিরুদ্ধে ওই মন্তব্য শুনে তিনি ব্যথিত হয়েছিলেন। সেই কারণেই আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতের দ্বারস্থ হন। কিন্তু তাঁর এই ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া মামলার গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট হয়নি।
অভিযোগকারীর আইনজীবী সন্তোষ পাণ্ডে জানান, আদালত মূলত তিনটি বিষয় বিবেচনা করেছে। অভিযোগকারীর জমা দেওয়া বক্তব্যের রেকর্ডিং-সংবলিত সিডি আসল কি না, অভিযোগকারী আইনগতভাবে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি কি না এবং সংশ্লিষ্ট বক্তব্য মানহানিকর কি না। পাণ্ডের বক্তব্য অনুযায়ী, আদালত সিডিটিকে আসল বলে মেনে নিয়েছে। কিন্তু বিজয় মিশ্রকে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি হিসেবে গ্রহণ করেনি এবং রাহুলের বক্তব্যকেও মানহানিকর মনে করেনি।
অর্থাৎ, বক্তব্যের রেকর্ডিংয়ের সত্যতা এবং সেই বক্তব্যের জন্য মানহানির দায় তৈরি হওয়া—এই দুটি প্রশ্নকে আদালত পৃথকভাবে বিচার করেছে বলে অভিযোগকারীর আইনজীবীর বিবরণ থেকে বোঝা যাচ্ছে। রেকর্ডিং আসল বলে গৃহীত হলেও মামলার বাকি দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে অভিযোগকারী পক্ষের যুক্তি টেকেনি। পাণ্ডে আরও জানান, অভিযোগকারীর পক্ষে তিনজন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে; বিপরীত পক্ষ থেকে কোনও সাক্ষী হাজির হননি।
কড়া নিরাপত্তার মধ্যে দলীয় কর্মী ও সমর্থকদের সঙ্গে আদালতে পৌঁছেছিলেন রাহুল। তাঁর আইনজীবী কাশীপ্রসাদ শুক্লা খালাসের খবর নিশ্চিত করেন। রায় ঘোষণার পরে আদালত ছাড়েন বিরোধী দলনেতা। রাহুলের পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী আর এস চিমা-সহ একাধিক আইনজীবী সওয়াল করেন। এর আগে রায় ঘোষণার জন্য ১৩ অক্টোবর দিন ধার্য হয়েছিল; পরে তা পিছিয়ে ২৬ অক্টোবর করা হয়।
রাহুলের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা এর আগেও জাতীয় রাজনীতিতে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ২০১৯ সালের ‘মোদি পদবি’ সংক্রান্ত মন্তব্যের পৃথক মামলায় ২০২৩ সালে গুজরাটের আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে দু’বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল। তার ফলে তাঁর সাংসদ পদ খারিজ হয়। পরে সুপ্রিম কোর্ট দোষসিদ্ধির উপর স্থগিতাদেশ দেওয়ায় তিনি সাংসদ পদ ফিরে পান। সুলতানপুরের মামলাটি অবশ্য আলাদা বক্তব্য ও আলাদা অভিযোগকারীর অভিযোগের ভিত্তিতে চলছিল।
এই রায়ের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপের সম্ভাবনাও খোলা রেখেছেন বিজয় মিশ্র। তিনি জানিয়েছেন, পূর্ণাঙ্গ রায় পড়ে আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করার পর রিভিশন আবেদন করবেন কি না, তা স্থির করবেন। আপাতত প্রায় আট বছর আগে শুরু হওয়া এই নির্দিষ্ট মানহানির মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে অভিযোগ থেকে মুক্ত হলেন রাহুল গান্ধী।