প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও শিল্পপতি গৌতম আদানিকে নিয়ে তৈরি একটি ভিডিও সমাজমাধ্যম থেকে সরানোর নির্দেশ দিল কলকাতা হাই কোর্ট। সোমবার, ২৬ অক্টোবর, বিচারপতি আর্যক দত্তের অবকাশকালীন বেঞ্চ ভিডিওটির প্রকাশ, পুনঃপ্রকাশ, আপলোড এবং শেয়ার করার উপরে অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। নির্দেশ বহাল থাকবে ৩১ জানুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত, অথবা তার আগে আদালত অন্য নির্দেশ দিলে সেই সময় পর্যন্ত।
আদানি এন্টারপ্রাইজেস লিমিটেডের মানহানির মামলায় এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা সাবির ভাটিয়া এবং অন্যদের বিরুদ্ধে সংস্থাটি ভিডিওর প্রচার বন্ধ ও ক্ষতিপূরণ চেয়েছে। আদালতের নির্দেশের আওতায় ইউটিউব, এক্স এবং ইনস্টাগ্রামও রয়েছে। সম্পূর্ণ ভিডিও ছাড়াও তার অংশ, সংক্ষিপ্ত সংস্করণ এবং কার্যত একই বিষয়বস্তুর পুনর্নির্মাণের প্রচারেও বিধিনিষেধ প্রযোজ্য।
বিতর্কিত ভিডিওটির নাম ‘হাউ মোদি অ্যান্ড আদানি স্টোল ইন্ডিয়া: দ্য ফ্রেন্ডশিপ ফাইলস’। প্রায় ৩৬ মিনিটের ভিডিওটি ৯ অক্টোবর ভাটিয়ার ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত হয়। সহযোগী ছিল ‘শ্যাডো সিটিজেনস’ নামে আরেকটি চ্যানেল। ভিডিওটি এক্সেও ছড়ায়। ওই দিনই দুই মাধ্যমে সম্মিলিত দর্শনসংখ্যা ৮০ হাজার ছাড়ায়। আদানি সংস্থার অভিযোগ, তথ্য গোপন করে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগের বয়ান তৈরি করা হয়েছে।
আদালতের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ, ভিডিওটি সাধারণ সংবাদ প্রতিবেদন নয়; নাটকীয় উপস্থাপনার মাধ্যমে তার বক্তব্য ও দৃশ্যকে তথ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। মাদক পাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা কিংবা এক কৃষকের বিরুদ্ধে পুলিশি নির্যাতন ও মিথ্যা মামলায় ভূমিকা সংক্রান্ত অভিযোগের সমর্থনে কোনও কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত আদালতের সামনে পেশ করা হয়নি। বিচারপতি এই অভিযোগগুলিকে নিছক মতামতের বদলে ঘটনা সম্পর্কে দাবি হিসেবে দেখেছেন।
মূল ভিডিওটি ভারতে দেখার সুযোগ আগেই বন্ধ হয়েছিল। তারপরেও বিভিন্ন চ্যানেল ও অ্যাকাউন্ট থেকে সেটি ছড়ানোর অভিযোগ ওঠে। আদালত মনে করেছে, পুনঃপ্রচারের ফলে সুনামের যে ক্ষতি হতে পারে, কেবল অর্থ দিয়ে তার যথেষ্ট প্রতিকার সম্ভব নয়। তবে এগুলি প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ; মানহানির মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।
নির্দেশে প্ল্যাটফর্মগুলিকে মামলার আবেদনে চিহ্নিত নির্দিষ্ট লিংক থেকে ভিডিও সরাতে অথবা দেখার সুযোগ বন্ধ করতে বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট রিপোস্ট, কোট পোস্ট ও শেয়ারের মাধ্যমেও যাতে ভিডিওটি দেখা না যায়, সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। আবেদনটির তালিকায় ইউটিউবের তিনটি, এক্সের ৩০টি এবং ইনস্টাগ্রামের ছয়টি এন্ট্রি রয়েছে। এক্সের কয়েকটি এন্ট্রি নির্দিষ্ট পোস্টের ঠিকানা নয় বলে আবেদনকারীকে সেগুলির সুনির্দিষ্ট লিংক সরবরাহ করতে বলা হয়েছে।
ভিডিও সরানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য, আপলোডের সময়কার আইপি লগ এবং অ্যাক্সেস লগ সংরক্ষণের নির্দেশ রয়েছে। যেসব অ্যাকাউন্টধারীর পরিচয় জানা নেই, তাঁদের মৌলিক তথ্য দুই সপ্তাহের মধ্যে হলফনামার সঙ্গে মুখবন্ধ খামে জমা দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট ভিডিও বা লিংকে বিজ্ঞাপন চালানো এবং রাজস্ব ভাগাভাগিও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আগের বিজ্ঞাপনী আয়ের হিসাব সংরক্ষণ করতে হবে।
এই নির্দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাও আদালত স্পষ্ট করেছে। আদানি গোষ্ঠী, আবেদনকারী সংস্থা বা কোনও সরকারি নীতির গঠনমূলক সমালোচনা এবং ন্যায্য সংবাদ পরিবেশন নিষিদ্ধ হচ্ছে না। বিচারপতি জনস্বার্থের বিষয়ে বিচার শুরুর আগে প্রকাশনায় নিষেধাজ্ঞা জারির ক্ষেত্রে সতর্কতার প্রয়োজন স্বীকার করেছেন। মানুষের জানার অধিকার এবং এমন নির্দেশে মতপ্রকাশ নিরুৎসাহিত হওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচ্য বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
বিবাদীদের চার সপ্তাহের মধ্যে বিরোধী হলফনামা দিতে হবে। তার পরের দুই সপ্তাহে আবেদনকারী জবাব দেবে। নিয়মিত বেঞ্চে জানুয়ারিতে মামলাটি শুনানির তালিকায় উঠবে। ফলে আপাতত নির্দিষ্ট ভিডিও এবং সংশ্লিষ্ট বক্তব্যের প্রচার বন্ধ থাকছে; অভিযোগের সত্যতা ও পক্ষগুলির পূর্ণাঙ্গ যুক্তি বিচার করার প্রক্রিয়া এখনও বাকি। এই পর্যায়ে অন্তর্বর্তী সুরাহা পাওয়াকে আদানি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ থেকে চূড়ান্ত অব্যাহতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আদালতের পর্যবেক্ষণ ও মামলার শেষ রায় আলাদা বিষয়—সেই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ।