বক্সায় বাঘের স্থায়ী প্রজননক্ষম জনসংখ্যা ফিরিয়ে আনতে বিহার থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল তিন বছরের বাঘিনীটিকে। কিন্তু নতুন ঠিকানায় থিতু হওয়ার আগেই প্রায় ৩৫ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে সে পৌঁছেছে অসমে। আলিপুরদুয়ারের বক্সা ব্যাঘ্র সংরক্ষণ কেন্দ্র থেকে সঙ্কোশ নদী পেরিয়ে তার এই যাত্রায় তৎপর হয়েছে দুই রাজ্যের বন দফতর।

অসমের কোকরাঝাড় জেলার রায়মোনা জাতীয় উদ্যানের পশ্চিম রেঞ্জের রাজেন্দ্রপুর গ্রামের কাছে রবিবার রাত থেকে বাঘিনীটির আনাগোনা দেখা গিয়েছে। সেখানে একটি গৃহপালিত শূকর মেরেছে বলে খবর। উদ্বিগ্ন গ্রামবাসীরা তাকে ঘুমপাড়ানি গুলি দিয়ে ধরে বক্সায় ফেরানোর আবেদন জানিয়েছেন।

তবে পশ্চিমবঙ্গের বনমন্ত্রী মনোজ ওরাওঁ জানিয়েছেন, এখনই বাঘিনীকে ধরে ফেরানোর পরিকল্পনা নেই। তিনি জানান, একটি নির্দিষ্ট বনপথ ধরে অসমে গিয়ে বাঘিনীটি নিজের বিচরণক্ষেত্র চিহ্নিত করছে। আপাতত তাকে নতুন এলাকায় মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তার গলায় লাগানো রেডিয়ো কলার থেকে পাওয়া সংকেতের সাহায্যে গতিবিধি অনুসরণ করছেন বনকর্মীরা।

বাঘিনীটিকে ৩০ সেপ্টেম্বর বিহারের বাল্মীকি ব্যাঘ্র সংরক্ষণ কেন্দ্র থেকে আনা হয়। ঘুমপাড়ানি ওষুধ প্রয়োগ করে খাঁচাবন্দি অবস্থায় সামরিক বিমানে হাসিমারা বিমানঘাঁটিতে পৌঁছনোর পরে তাকে রাজাভাতখাওয়া এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ২ অক্টোবর বক্সায় বাঘ ফেরানোর প্রকল্পের সূচনা হয়; উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব।

বনমন্ত্রীর বক্তব্য, বক্সায় প্রথমে একটি পুরুষ বাঘ ও দু’টি বাঘিনী নিয়ে প্রজননের উপযোগী দল গড়তে চায় দফতর। তার আগে এই বাঘিনীর চলাফেরা ও আচরণ পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। গোটা প্রক্রিয়াটিকে সময়সাপেক্ষ বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ হিসেবেই দেখছে বন দফতর।

অসমের কচুগাঁও বন বিভাগের আধিকারিক মুস্তাফা আলি আহমেদ জানিয়েছেন, দুই রাজ্যের কর্মীরা যৌথভাবে নজরদারি চালাচ্ছেন। বাঘিনীটি উপযুক্ত নিজস্ব এলাকা খুঁজতে পারে বলে তাঁর ধারণা। বাঘ সংরক্ষণকর্মী দীপঙ্কর লাহকরের ব্যাখ্যা, নতুন পরিবেশ অনুসন্ধান করা বাঘের স্বাভাবিক আচরণের অংশ। খাদ্যের সহজলভ্যতা এবং বসবাসের অনুকূল পরিস্থিতি তাদের চলাচলকে প্রভাবিত করে। তাই সংরক্ষিত অরণ্যের প্রশাসনিক সীমানা ছাড়ানো মাত্রই স্থানান্তর প্রকল্প ব্যর্থ হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর ভিত্তি নেই। তাঁর কথায়, বাঘ সাধারণত রাতে বেশি সক্রিয় থাকে এবং দিনে ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত চলতে পারে। ফলে নজরদারির ক্ষেত্রে ধারাবাহিক অবস্থান-তথ্য পাওয়া বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

টি১৩৮ নামে পরিচিত এই বাঘিনীর নির্বাচনেও বিশেষ বিবেচনা ছিল। বাল্মীকিতে সে দক্ষ শিকারি হিসেবে পরিচিত; মানুষের সঙ্গে বিরূপ সংঘাতের ঘটনাও ছিল অল্প। বন্যপ্রাণ সংরক্ষণবিদ সমীরকুমার সিনহার মতে, বক্সায় দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী বাঘের উপস্থিতির সুস্পষ্ট প্রমাণ মেলেনি। বিচ্ছিন্নভাবে অন্য অরণ্য থেকে আসা বাঘের চিহ্ন পাওয়া গেলেও স্থায়ী প্রজননক্ষম গোষ্ঠী গড়ে ওঠেনি। সেই ঘাটতি মেটাতেই বাইরে থেকে বাঘ আনার উদ্যোগ।

এই স্থানান্তরের পেছনে বাল্মীকির সংরক্ষণ-সাফল্যও রয়েছে। একসময় সেখানে বাঘের অস্তিত্বের চিহ্ন পাওয়াই কঠিন ছিল। সুরক্ষা, আবাসস্থলের উন্নতি এবং শিকারপ্রাণীর সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে পরিস্থিতি বদলেছে। ২০২২ সালে সেখানে ৫৪টি বাঘ ছিল। সেই পুনরুদ্ধারের সুফল এবার অন্য অরণ্যে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

সিনহার বিশ্লেষণে, সাফল্যের শর্ত শুধু বাঘ এনে ছেড়ে দেওয়া নয়। পর্যাপ্ত শিকারপ্রাণী, সুরক্ষিত আবাসস্থল, প্রশিক্ষিত বনকর্মী এবং স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। বক্সা, রায়মোনা, মানস ও ভুটানের ফিবসুর মধ্যে বনসংযোগ অক্ষুণ্ণ রাখাও জরুরি। একই সঙ্গে বনসংলগ্ন গ্রামের জীবিকা ও নিরাপত্তার উদ্বেগকে গুরুত্ব দিতে হবে। বাঘের সংখ্যা বাড়লে মানুষের সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে; তার প্রস্তুতি আগে থেকেই প্রয়োজন।

বর্তমান ঘটনায় সেই দুই প্রয়োজনই সামনে এসেছে—বাঘিনীর স্বাভাবিক বিচরণকে সুযোগ দেওয়া এবং গ্রামের মানুষ ও গৃহপালিত পশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আপাতত নজরদারিই প্রশাসনের প্রধান ভরসা। বাঘিনী কোথায় স্থায়ীভাবে থিতু হয়, তার ভিত্তিতেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।