বাংলাস্ফিয়ার: ইন্টারনেটে প্রবেশ ও তা ব্যবহারের অধিকার প্রত্যেক মানুষের মৌলিক অধিকার। শিশুদের ক্ষেত্রেও সেই অধিকার সমানভাবে প্রযোজ্য। অনলাইনে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে ইন্টারনেট ব্যবহারে ঢালাও নিষেধাজ্ঞা চাপানো কোনও সমাধান নয় বলে জানাল সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা ও বিচারপতি কে বিনোদ চন্দ্রনের বেঞ্চের বক্তব্য, সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ এবং ১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদ একসঙ্গে পড়লে এই অধিকারের সাংবিধানিক ভিত্তি স্পষ্ট হয়।

শিশুদের যৌন শোষণ ও নির্যাতনের উপাদান অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া রুখতে ‘জাস্ট রাইটস ফর চিলড্রেন অ্যালায়েন্স’-এর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এই অবস্থান জানিয়েছে। ১৫ অক্টোবরের আদেশটি শনিবার প্রকাশ্যে আসে। আদালতের মতে, শিশুদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা পরস্পরের বিরোধী নয়; দুটিই তাদের প্রাপ্য।

এই প্রসঙ্গে আগের দুটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ের উল্লেখ করেছে বেঞ্চ। ২০২০ সালের অনুরাধা ভাসিন মামলায় ইন্টারনেটের মাধ্যমে মতপ্রকাশ ও ব্যবসা করার স্বাধীনতার সাংবিধানিক সুরক্ষা স্বীকৃত হয়েছিল। তবে ইন্টারনেটে প্রবেশের অধিকার নিজেই মৌলিক অধিকার কি না, সেই প্রশ্ন তখন খোলা ছিল। পরে ২০২৫ সালের প্রজ্ঞা প্রসূন মামলায় ডিজিটাল পরিষেবায় প্রবেশাধিকারকে জীবনের অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

বেঞ্চ মনে করিয়েছে, ইন্টারনেট জ্ঞান, তথ্য ও সৃজনশীল প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। প্রত্যন্ত অঞ্চলের বহু শিশুর কাছে এটি শিক্ষার অপরিহার্য মাধ্যম। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের কাছেও এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। শিশুনির্যাতনের উপাদান তৈরি, বিক্রি বা ছড়ানোর দায় অপরাধীদের; সেগুলি শনাক্ত ও সরাতে ব্যর্থ হলে দায় সংশ্লিষ্ট অনলাইন সংস্থারও। সেই ব্যর্থতার জন্য শিশুকেই ইন্টারনেট থেকে সরিয়ে দেওয়া হলে নির্যাতিতকেই সমস্যার উৎস বলে ধরে নেওয়া হয়।

ঢালাও নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আদালত। বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ, আইন করে নিষিদ্ধ করলেই শিশুরা ইন্টারনেট ব্যবহার বন্ধ করে না। বরং অভিভাবকদের অজান্তে কম নিয়ন্ত্রিত এবং আরও অনিরাপদ মাধ্যমে চলে যেতে পারে। নিষেধ অমান্য করার জন্য বকুনি বা শাস্তির আশঙ্কায় তারা অনলাইনে প্রলোভন, ভয় দেখানো কিংবা নির্যাতনের ঘটনা জানাতেও সংকোচ করতে পারে। এতে সুরক্ষা বাড়ার বদলে বিপদ আরও বাড়ে।

বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থার সঙ্গেও গোপনীয়তার প্রশ্ন জড়িত। প্রত্যেক ব্যবহারকারীর পরিচয় ও বয়স নিশ্চিত করতে নিয়মিত সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ এবং নজরদারির প্রয়োজন হতে পারে। সেই তথ্যের অপব্যবহারের ঝুঁকিও রয়েছে। তবে আদালত স্পষ্ট করেছে, ঢালাও নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতার অর্থ বয়স অনুযায়ী সমস্ত সুরক্ষাব্যবস্থা বাতিল করা নয়। শিশুদের জন্য উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই প্রয়োজন।

বিকল্প হিসেবে সামাজিক মাধ্যমে শিশুদের অ্যাকাউন্টে বিশেষ ‘চাইল্ড মোড’ চালুর পরামর্শ দিয়েছে বেঞ্চ। অভিভাবকের সম্মতি, পথনির্দেশ ও তদারকিতে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অ্যাকাউন্ট শুরু থেকেই ব্যক্তিগত রাখা, অপরিচিত প্রাপ্তবয়স্কদের যোগাযোগ ও বার্তা পাঠানো সীমিত করা এবং শিশুদের সামনে আসা বিজ্ঞাপন ও বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণের মতো ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। সুরক্ষার উদ্দেশ্যের সঙ্গে এসব পদক্ষেপের সামঞ্জস্য থাকতে হবে।

একই সঙ্গে শিশুদের বিপদ চিনতে শেখানো, ব্যক্তিগত তথ্য রক্ষার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং নির্ভয়ে সাহায্য চাওয়ার আত্মবিশ্বাস তৈরির ওপর জোর দিয়েছে আদালত। যৌন শোষণমূলক উপাদান শনাক্ত ও সরানোর জন্য জাতীয় তথ্যভান্ডার তৈরির নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। অনলাইন সংস্থাগুলি সেই তথ্যভান্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে নিষিদ্ধ উপাদান দ্রুত চিহ্নিত করতে পারবে। যাচাইয়ের ব্যবস্থাও থাকতে হবে, যাতে শনাক্তকরণ নির্ভরযোগ্য হয়।

আদালত জানিয়েছে, শিশুদের পক্ষে স্বভাবতই ক্ষতিকর নির্দিষ্ট পরিষেবা বা প্রাপ্তবয়স্কদের বিষয়বস্তুর ওয়েবসাইটে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সরকার। পাশাপাশি শিশুনির্যাতনের উপাদান শনাক্ত ও অপসারণে সংস্থাগুলি কী প্রযুক্তি ব্যবহার করছে এবং তা সর্বত্র প্রয়োগ করা সম্ভব কি না, কেন্দ্রকে জানাতে বলা হয়েছে। আদালতের বক্তব্যে তাই গুরুত্ব পেয়েছে শিশুর অধিকার অক্ষুণ্ণ রেখে অনলাইন পরিবেশকে নিরাপদ করার দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে সরকার, পরিবার এবং প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকে একযোগে এগোতে হবে।