বাংলাস্ফিয়ার: ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে স্মৃতি ইরানিকে অমেঠী অথবা রায়বরেলী থেকে প্রার্থী করতে পারে বিজেপি—এমন জল্পনার মধ্যেই অমেঠীতে সমাজবাদী পার্টির তিন বিধায়কের বিজেপিতে যোগদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করল দল। স্মৃতির পাশাপাশি সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিজেপির একাধিক শীর্ষ নেতা ও মন্ত্রী।
সাধারণত এ ধরনের যোগদান অনুষ্ঠান লখনউয়ে দলের রাজ্য দফতর অথবা দিল্লির জাতীয় সদর দফতরে আয়োজন করে বিজেপি। কিন্তু বুধবারের অনুষ্ঠানটি হয়েছিল অমেঠীর গৌরীগঞ্জে। বিজেপিতে যোগ দিতে কালপির বিধায়ক তাঁর সমর্থকদের নিয়ে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার পথ গাড়িতে পাড়ি দিয়ে সেখানে পৌঁছেছিলেন। গোসাইগঞ্জের বিধায়কও এসেছিলেন ১০০ কিলোমিটারের বেশি পথ অতিক্রম করে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি। ছিলেন উত্তরপ্রদেশ বিজেপির সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পঙ্কজ চৌধরি, রাজ্যের মন্ত্রী দীনেশ প্রতাপ সিংহ, দারা সিংহ চৌহান, দয়াশঙ্কর সিংহ, প্রতিভা শুক্লা ও কৃষ্ণা পাসোয়ান, বুলন্দশহরের সাংসদ ভোলা সিংহ এবং দলের ওবিসি মোর্চার সর্বভারতীয় সভাপতি অমর পাল মৌর্য। এমনকি প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা মুজফ্ফরনগরের সাংসদ সঞ্জীব বালিয়ানও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে অমেঠীর প্রাক্তন সাংসদ স্মৃতি নিজেই বালিয়ানের উপস্থিতির কারণ ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, “পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের সঞ্জীব বালিয়ান কেন এখানে মঞ্চে রয়েছেন, তা দেখে আপনারা নিশ্চয়ই অবাক হচ্ছেন।” এর পর তিনি জানান, বালিয়ান যখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেন, তখন তাঁর অনুরোধেই গৌরীগঞ্জে সারের জোগান নিশ্চিত করেছিলেন।
স্মৃতি আরও তুলে ধরেন যে, নরেন্দ্র মোদী সরকারের আমলেই স্বাধীনতার পরে প্রথম বার অমেঠীর ৪০টি গ্রামে বিদ্যুৎ-সংযোগ পৌঁছেছে।
২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে অমেঠীতে প্রথম বার বিজেপির প্রার্থী হয়েছিলেন স্মৃতি। সেই নির্বাচনে ১ লক্ষ ৮ হাজার ভোটে হারলেও রাহুলকে কঠিন লড়াইয়ের মুখে ফেলেছিলেন তিনি। ২০১৯ সালে প্রায় ৫৫ হাজার ভোটে রাহুলকে পরাজিত করেন স্মৃতি।
২০২৪ সালে রাহুল সরে যান পাশের রায়বরেলী কেন্দ্রে, যেখানকার সাংসদ ছিলেন সোনিয়া গান্ধী। অমেঠীতে কংগ্রেস প্রার্থী করে গান্ধী পরিবারের দীর্ঘদিনের অনুগত কিশোরীলাল শর্মাকে। স্মৃতিকে ১ লক্ষ ৬৭ হাজার ভোটে হারান শর্মা।
কিছু দিন ধরেই উত্তরপ্রদেশের রাজনৈতিক মহলে জল্পনা চলছে, ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে অমেঠী অথবা রায়বরেলী—এই দুই কেন্দ্রের কোনও একটি থেকে স্মৃতিকে প্রার্থী করতে পারে বিজেপি।
গৌরীগঞ্জের সভায় স্মৃতি বলেন, অমেঠীর ২০২৪ সালের নির্বাচনী ফল রাজনৈতিক বিতর্ক ও গবেষণার বিষয় হয়ে থাকবে। তাঁর দাবি, ২০১৯ সালে তিনি সাংসদ হওয়ার পরে অমেঠীর বহু বন্ধ কারখানা ফের চালু হয়েছে।
বক্তৃতায় মূলত গান্ধী পরিবারকেই নিশানা করেন স্মৃতি। তাঁর প্রশ্ন, কংগ্রেসের প্রথম পরিবার যদি নিজের জোরে অমেঠীতে নির্বাচনে লড়তে না পারে, তা হলে দেশকে নেতৃত্ব দেবে কী করে?
রাহুলের নাম না করে কংগ্রেসের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আপনাদের রাজপুত্রকে সম্রাট বানাতে যত খুশি রাজনৈতিক দলকে এক জায়গায় জড়ো করতে পারেন। কিন্তু উত্তরপ্রদেশের বাস্তব হল, ১৯৮৯ সাল থেকে আপনারা বারবার বিধানসভা নির্বাচনে হেরেছেন। কেন এই পরাজয়, তা খতিয়ে দেখার বদলে কংগ্রেস এখন নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে।”
পঙ্কজ চৌধরি বলেন, অমেঠী ও রায়বরেলী কোনও পরিবারের ‘জায়গির’ বা জমিদারি নয়। স্মৃতি অমেঠীর প্রতিটি গ্রামে গিয়েছেন এবং সেখানকার মানুষের জন্য কাজ করেছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর দাবি, “স্মৃতি ইরানিজি এখানে পাঁচ বছরে যে উন্নয়ন করেছেন, কংগ্রেস ৬০ বছরেও তা করতে পারেনি।” তিনি আরও বলেন, “দলের কর্মীদের তিনি নিজের পরিবারের সদস্য বলে মনে করেন। তাঁদের কথা সব সময় ভাবেন।”
সমাজবাদী পার্টির বিধায়কদের যোগদান অনুষ্ঠান অমেঠীতে আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে উত্তরপ্রদেশ বিজেপির মুখপাত্র রাকেশ ত্রিপাঠী বলেন, “এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিজেপি বার্তা দিয়েছে, অতীতে দল কংগ্রেসের দুর্গ অমেঠী ও রায়বরেলীতে জিতেছে, ভবিষ্যতেও জিতবে। আমরা অমেঠী ছেড়ে যাইনি। এই অনুষ্ঠানের প্রভাব কাশী ও অওধ—দুই অঞ্চলের বিধানসভা আসনগুলিতেই পড়বে।”
২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে গৌরীগঞ্জ বিধানসভা এলাকায় স্মৃতির চেয়ে ২২ হাজার ৩৬৪ ভোটে এগিয়ে ছিলেন রাহুল। ২০১৯ সালে স্মৃতি যখন রাহুলকে হারান, তখন এই এলাকায় তাঁর ব্যবধান ছিল ১৯ হাজার ৯৭৩ ভোট। আবার ২০২৪ সালে গৌরীগঞ্জে স্মৃতির চেয়ে ৩৩ হাজার ৩৭৮ ভোটে এগিয়ে ছিলেন কংগ্রেসের কিশোরীলাল।
অমেঠীর এক বিজেপি নেতা বলেন, “রাকেশ প্রতাপ তো ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও বিজেপিকে সমর্থন করছিলেন। তা সত্ত্বেও গৌরীগঞ্জে কংগ্রেস বড় ব্যবধানে এগিয়ে গিয়েছিল। এই তিন বিধায়কের যোগদানে ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির কতটা লাভ হবে, তা এখনও দেখার বিষয়। বুধবারের অনুষ্ঠান থেকে বোঝা যাচ্ছে, আসন্ন নির্বাচনগুলিতে স্মৃতি ইরানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চলেছেন। এখানকার মানুষের মনে আছে, তিনি পরিকাঠামোর উন্নয়ন করেছিলেন এবং অভাবী মানুষের কাছে কল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছে দিয়েছিলেন।”
অমেঠীর আর এক বিজেপি নেতা বলেন, “সমাজবাদী পার্টির যে তিন বিদ্রোহী বিধায়ক দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন, তাঁদের যোগদানের জন্য এত বড় আয়োজন, তার সঙ্গে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের কয়েক জন-সহ শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতি—সব মিলিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছে যে, বিজেপি এখানে বড় কিছু পরিকল্পনা করছে।”
তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, গত মাসেই রায়বরেলী থেকে রাজ্যজুড়ে তাঁর ‘পিডিএ রথযাত্রা’ শুরু করেছিলেন সমাজবাদী পার্টির সভাপতি অখিলেশ যাদব। এতে জোটসঙ্গী কংগ্রেসের একাংশ অস্বস্তিতে পড়ে। ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্ধারিত বিধানসভা নির্বাচনের আগে সমাজবাদী পার্টির ‘পিডিএ’—পিছড়া বা অনগ্রসর শ্রেণি, দলিত এবং অল্পসংখ্যক বা সংখ্যালঘুদের—সামাজিক জোটকে আরও সংহত করাই অখিলেশের এই যাত্রার লক্ষ্য।