বাংলাস্ফিয়ার: নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে বেঙ্গালুরুতে আন্দোলনকারীদের আটক এবং সাংবাদিকদের হেনস্থার অভিযোগের মুখে জবাবদিহির আশ্বাস দিলেন কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমার। মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর তিনি জানান, পুলিশের অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ বা বাড়াবাড়ির প্রমাণ মিললে দায় নির্ধারণ করা হবে। কী পরিস্থিতিতে পুলিশ এই পদক্ষেপ করেছিল, তার বিস্তারিত রিপোর্টও চেয়েছেন তিনি। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষায় কোনও দ্বিচারিতা চলবে না বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

ঘটনার রাজনৈতিক তাৎপর্য তৈরি হয়েছে কংগ্রেসের অবস্থান ঘিরে। সোমবার ঘটনার দিনই শিবকুমার দিল্লিতে বিরোধীদের কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছিলেন, যেখানে ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হচ্ছিল। দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে পুলিশি ধরপাকড়ের তীব্র সমালোচনা করছে দলটি। অথচ কংগ্রেসশাসিত কর্নাটকেই একই বিষয় নিয়ে পথে নামা মানুষজনকে আটক করেছে পুলিশ। শিবকুমারের বক্তব্য, দিল্লিতে নিজেদের জন্য যে অধিকার দাবি করা হচ্ছে, বেঙ্গালুরুতে অন্যদের সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না। দেশের কাছে প্রত্যাশিত গণতান্ত্রিক মানদণ্ড কর্নাটককেও মেনে চলতে হবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেঙ্গালুরুতে দু’দফায় দু’শোর বেশি আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়। শনিবার প্রায় ১২৫ জন ছাত্রকর্মী আটক হন। সোমবার আটক হন আরও প্রায় ১০০ জন। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে তাঁরা নির্বাচন দফতরের দিকে এগোতে চেয়েছিলেন। মঙ্গলবারের বিবৃতিতে শিবকুমার স্পষ্ট করেন, নির্বাচন কমিশন, রাজ্য সরকার কিংবা ব্যক্তিগতভাবে তাঁর বিরোধিতা করলেও শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশের অধিকার কমে যায় না।

সোমবারের কর্মসূচিতে ছাত্র, আইনজীবী, সমাজকর্মী এবং শিক্ষাজগতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তাঁদের দাবি ছিল এসআইআর বাতিল এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। আন্দোলনকারীদের সংগঠন ‘মাই ভোট, মাই রাইট’-এর অভিযোগ, মিছিল শুরু হওয়ার আগেই পুলিশ প্ল্যাকার্ড কেড়ে নেয় এবং অংশগ্রহণকারীদের আটক করতে থাকে। বিক্ষোভকারীদের ধাক্কা দিয়ে, টেনেহিঁচড়ে বাসে তোলার অভিযোগও ওঠে। লেখক ও সমাজকর্মী আকার পটেলও আটক হয়ে পরে মুক্তি পান।

ঘটনাস্থলে সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া আলোকচিত্রী ও সাংবাদিকদের সঙ্গেও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এক আলোকচিত্রীর অভিযোগ, পুলিশি পদক্ষেপের ছবি তুলতে গেলে তাঁকে বাধা দেওয়া হয় এবং দৃশ্য মুছে ফেলতে বলা হয়। সাংবাদিকদের ধাক্কা দেওয়া, মারধর ও ভয় দেখানোর অভিযোগও সামনে এসেছে। এই অভিযোগগুলি পুলিশি আচরণের পর্যালোচনার দাবিকে আরও জোরালো করেছে।

রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিয়াঙ্ক খাড়্গেও সোমবারের বিক্ষোভ সামলানোর পদ্ধতি খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ যাতে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নাগরিকদের ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করাও প্রশাসনের দায়িত্ব। পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করতে এবং কর্মসূচির বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে জানাতে অনুরোধ করেছেন তিনি, যাতে তাঁদের নিরাপত্তা ও অন্যদের অধিকার রক্ষা করা যায়।

পুলিশ অবশ্য নিজেদের পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিয়েছে। বেঙ্গালুরুর সেন্ট্রাল ডিভিশনের ডিসিপি অক্ষয় এম হাকায় জানিয়েছেন, সোমবার কে আর সার্কেলের কাছে অনুমতি বা আগাম তথ্য ছাড়াই জমায়েত হয়েছিল। হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী নির্ধারিত প্রতিবাদস্থল ফ্রিডম পার্কে যেতে বলা হলেও বিক্ষোভকারীরা রাজি হননি বলে তাঁর দাবি। এরপর তাঁদের প্রতিরোধমূলক হেফাজতে নিয়ে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। সাংবাদিকদের সঙ্গে সংঘাতকে অনিচ্ছাকৃত বলেও দাবি করেছেন তিনি।

তবে প্রতিবাদ কোথায় করা যাবে, সেই প্রশ্নেও আপত্তি রয়েছে আন্দোলনকারীদের। সমাজকর্মী গীতা মেনন স্ক্রলকে জানিয়েছেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের জন্য শুধু ফ্রিডম পার্ককে নির্দিষ্ট করে দেওয়ার বিরোধিতা করছেন তাঁরা। ফলে বিতর্কটি কেবল আটকের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নেই; নাগরিকের প্রতিবাদের সুযোগ এবং সেই প্রতিবাদ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের আচরণও প্রশ্নের মুখে। শিবকুমার রিপোর্ট চেয়েছেন, খাড়্গে পর্যালোচনার আশ্বাস দিয়েছেন। এখন সেই পর্যালোচনায় কী উঠে আসে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটাই দেখার।