বাংলাস্ফিয়ার: দিল্লিতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরের ফলে যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের নাম ফের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ফর্ম ৬ পূরণ করতে বাধ্য করার পদ্ধতিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করা হয়েছে। ভারতের নির্বাচন কমিশনের এই পদ্ধতির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আবেদনকারীরা।
স্বচ্ছতা আন্দোলনের কর্মী অঞ্জলি ভরদ্বাজ ও অমৃতা জোহরি তাঁদের বিচারাধীন মামলায় একটি অন্তর্বর্তী আবেদন দাখিল করেছেন। মূল মামলাটিতে দিল্লির এসআইআরে ‘যুক্তিগত অসংগতি’ সংক্রান্ত পদ্ধতিকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে। আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ ও নেহা রাঠির মাধ্যমে আবেদনটি দাখিল করা হয়েছে।
আবেদনকারীরা উল্লেখ করেছেন, ফর্ম ৬-এ প্রত্যেক আবেদনকারীকে ঘোষণা করতে হয় যে, তিনি ‘প্রথমবার ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আবেদন করছেন’।
আবেদনে বলা হয়েছে, দিল্লিতে এসআইআরের গণনাপর্বে ৪৭,৫৬,৭২২ জন ভোটারকে খসড়া ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এসআইআর শুরুর আগে তালিকায় থাকা মোট ভোটারের ৩২.৭৮ শতাংশ এটি। তাঁদের ‘এএসডিডি’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে—অর্থাৎ অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত, মৃত অথবা একাধিকবার নথিভুক্ত। এই তালিকায় থাকা কোনও ব্যক্তি নিজের নাম ভোটার তালিকায় ফেরানোর দাবি জানাতে চাইলে তাঁর সামনে একমাত্র পথ ফর্ম ৬ জমা দেওয়া।
আবেদনকারীদের বক্তব্য, এর ফলে একটি মৌলিক অসংগতি তৈরি হচ্ছে। এই ব্যক্তিদের প্রত্যেকের নাম আগেই ভোটার তালিকায় নথিভুক্ত ছিল। অথচ এখন তাঁদের ফর্ম ৬ জমা দিয়ে ঘোষণা করতে হচ্ছে যে, তাঁরা প্রথমবার ভোটার তালিকায় নাম তোলার আবেদন করছেন। এই ঘোষণা তথ্যগতভাবে ভুল এবং তাঁদের পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ অপ্রযোজ্য।
আবেদনের ভাষায়, ‘ফর্ম ৬ জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আগে থেকেই নথিভুক্ত ভোটারদের উপর “প্রথমবার” নাম নথিভুক্ত করার এমন একটি ঘোষণা চাপিয়ে দিচ্ছে, যা অসংগত এবং আইনগতভাবে তাঁদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।’
আবেদনকারীরা আরও বলেছেন, এমন ঘোষণা দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৩১ ধারায় শাস্তির মুখেও পড়তে পারেন। এই ধারায় সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড, অথবা জরিমানা, অথবা উভয় শাস্তির বিধান রয়েছে।
আবেদনে বলা হয়েছে, ‘জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৩১ ধারার পরিপ্রেক্ষিতে উল্লিখিত অসংগতি বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। ভোটার তালিকা প্রস্তুত, সংশোধন বা ত্রুটি দূর করা, কিংবা তালিকায় কোনও নাম অন্তর্ভুক্ত করা বা বাদ দেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনও লিখিত বিবৃতি বা ঘোষণা মিথ্যা জেনেও দেওয়া বা প্রকাশ করা, অথবা তা সত্য বলে বিশ্বাস না করেও দেওয়া বা প্রকাশ করা এই ধারায় অপরাধ। অতএব, যে ভোটারের নাম আগে ভোটার তালিকায় ছিল, তাঁর নাম ফেরানোর পূর্বশর্ত হিসেবে তাঁকে প্রথমবার নাম নথিভুক্ত করার আবেদন করছেন বলে ঘোষণা দিতে বলা যুক্তিসংগত হতে পারে না।’
আবেদনে আরও বলা হয়েছে, এসআইআরের নির্দেশিকা অনুযায়ী ফর্ম ৬ ও ফর্ম ৮-এর সঙ্গে যে অতিরিক্ত ঘোষণাপত্র জমা দিতে হয়, তার কোনও আইনি বল নেই। সেটিও বাতিল করা উচিত।
জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০-এর ২৮ ধারার অধীনে প্রণীত নির্বাচক নিবন্ধন বিধি, ১৯৬০-এ ফর্ম ৬ নির্ধারিত রয়েছে। আইনের ২৮(১) ধারা অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে পরামর্শ করে কেন্দ্রীয় সরকার সরকারি গেজেটে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে আইনটির উদ্দেশ্য কার্যকর করার জন্য বিধি প্রণয়ন করতে পারে। অন্যদিকে, ২৮(৩) ধারায় ওই বিধিগুলি সংসদের উভয় কক্ষে পেশ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সংসদ চাইলে সেগুলি সংশোধন বা বাতিল করতে পারে। কিন্তু অতিরিক্ত ঘোষণাপত্রটির ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলে আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।
অতিরিক্ত ঘোষণাপত্রটি ২০২৬ সালের জুনে জারি করা এসআইআর নির্দেশিকায় প্রকাশিত হয়। পরে ২০২৫ সালের অক্টোবরে এবং ২০২৬ সালের মে মাসে জারি করা নির্দেশিকায় সেটি সংশোধন করা হয়। মে মাসের নির্দেশিকাটি দিল্লির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
আবেদনকারীরা আরও উল্লেখ করেছেন, নির্বাচন কমিশন পরবর্তী একটি ব্যাখ্যায় জানিয়েছে, এসআইআর চলছে না এমন সময়ে অতিরিক্ত ঘোষণাপত্রটি জমা দিতে হবে না। তাঁদের বক্তব্য, এর ফলে একই উদ্দেশ্যে আলাদা আলাদা পদ্ধতি চালু থাকছে, যা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
আবেদনে বলা হয়েছে, ‘ফলে আগে থেকে নথিভুক্ত কোনও ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ যাওয়ার পর তিনি তা ফেরাতে চাইলে তাঁকে এমন কিছু শর্তের অধীন করা হচ্ছে, যা ভোটার হিসেবে তাঁর প্রকৃত অবস্থার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। আবার ফর্মে উল্লিখিত সেই শর্তগুলি মেনে ঘোষণা দিলে শাস্তিমূলক পরিণতির মুখে পড়তে হয়।’
আবেদনকারীরা সুপ্রিম কোর্টের কাছে পাঁচটি নির্দেশ ও প্রতিকার চেয়েছেন।
প্রথমত, এসআইআরের ফলে আগে থেকে নথিভুক্ত যেসব ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাঁদের নাম ফেরানো ও অন্তর্ভুক্তির উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে বিবাদীপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হোক। সেই ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রথমবার নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন করছেন বলে ঘোষণা দিতে বাধ্য করা যাবে না।
দ্বিতীয়ত, আগে নথিভুক্ত কোনও ভোটারকে ফর্ম ৬-এর এমন কোনও ঘোষণা জমা দিতে বাধ্য করা যাবে না, যা তাঁর ক্ষেত্রে তথ্যগতভাবে প্রযোজ্য নয়। আগে নথিভুক্ত ভোটারদের নাম ফেরানো বা পুনরায় অন্তর্ভুক্তির জন্য উপযুক্ত ফর্ম বা ঘোষণাপত্র নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হোক।
তৃতীয়ত, দিল্লির জাতীয় রাজধানী অঞ্চলে প্রযোজ্য এসআইআর নির্দেশ অনুযায়ী ফর্ম ৬-এর সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে জমা দেওয়ার জন্য নির্ধারিত অতিরিক্ত ঘোষণাপত্রটি যতখানি আইননির্ধারিত ফর্ম ৬-এর বাইরে অতিরিক্ত মৌলিক শর্ত আরোপ করছে, ততখানি বিধিবদ্ধ কর্তৃত্বহীন ও বলবৎ করার অযোগ্য বলে ঘোষণা করা হোক। কারণ, জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০-এর ২৮ ধারা অনুসরণ করে নির্বাচক নিবন্ধন বিধি, ১৯৬০ সংশোধন না করেই এই শর্তগুলি আরোপ করা হয়েছে।
চতুর্থত, অন্য সব দিক থেকে গ্রহণযোগ্য কোনও নাম অন্তর্ভুক্তি বা পুনর্বহালের দাবি কেবল অতিরিক্ত এসআইআর ঘোষণাপত্র জমা না দেওয়ার কারণে বাতিল করা যাবে না—বিবাদীপক্ষকে এই নির্দেশ দেওয়া হোক।
পঞ্চমত, যোগ্য ভোটারের নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদনপদ্ধতিতে এসআইআর চলাকালীন এবং এসআইআর-বহির্ভূত সময়ে ঘোষণার মৌলিক শর্তে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রাখা যাবে না, যদি না আইন স্পষ্টভাবে সেই পার্থক্যের অনুমোদন দেয়।