বাংলাস্ফিয়ার: বাংলাদেশের মতো পরিস্থিতি তৈরি করে ভারতে ক্ষমতার পালাবদল ঘটাতে চাইছে কংগ্রেস ও তার সহযোগী দলগুলি—শুক্রবার এই অভিযোগ করলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে দিল্লিতে চলা আন্দোলনকে নিশানা করে তাঁর দাবি, নির্বাচনী সংস্কারের আড়ালে দেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। পাল্টা কংগ্রেস জানিয়েছে, নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার বদল চাওয়াই বিরোধীদের গণতান্ত্রিক দায়িত্ব।
লখনউয়ে বিজেপির সদর দফতরে সাংবাদিক বৈঠকে রাজনাথ বলেন, তরুণদের শক্তিকে গঠনমূলক কাজ ও দেশ গড়ার কাজে ব্যবহার করার পরিবর্তে রাজনৈতিক সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, কংগ্রেস এবং তার শরিকেরা সরাসরি কিংবা সমর্থক সংগঠনগুলির মাধ্যমে এই কাজ করছে। যুবসমাজকে অরাজকতার রাজনীতির ঘুঁটি বানানো হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাহুল গান্ধীকে আক্রমণ করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্রের অর্থ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করা কিংবা দেশের উন্নয়নে বাধা দেওয়ার ছাড়পত্র নয়। তাঁর কটাক্ষ, লোকসভার বিরোধী দলনেতা পকেটে সংবিধান রাখলেও রাজনৈতিক আচরণে অস্থিরতা বাড়াচ্ছেন। গণতন্ত্র রক্ষার নামে ধ্বংসাত্মক রাজনীতি না করে জনাদেশকে সম্মান জানানো এবং নিজের ভূমিকা নিয়ে আত্মসমীক্ষার পরামর্শ দেন রাজনাথ।
মহাত্মা গান্ধীর প্রসঙ্গ টেনেও কংগ্রেসকে বিঁধেছেন তিনি। রাজনাথের বক্তব্য, চৌরিচৌরার হিংসার পরে গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করেছিলেন। অথচ নিজেদের গান্ধীর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী বলে দাবি করা দলটি নির্বাচনী পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে হিংসা ও অরাজকতার পথ ধরতে চাইছে। এই কারণে কংগ্রেস গান্ধীর নাম ব্যবহারের নৈতিক অধিকার হারিয়েছে বলে অভিযোগ করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী।
ভোট চুরির অভিযোগ নিয়েও রাহুলকে প্রশ্ন করেন রাজনাথ। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিনের নির্বাচনী ব্যর্থতার কারণ নিজেদের কাজকর্মে না খুঁজে কংগ্রেস নির্বাচন ব্যবস্থাকে দায়ী করছে। ভোটার তালিকার বিরুদ্ধে দলটি একটিও আনুষ্ঠানিক আবেদন করেনি বলেও দাবি করেন তিনি। রাহুলের বহুল আলোচিত ‘হাইড্রোজেন বোমা’ মন্তব্যকে কটাক্ষ করে অভিযোগগুলির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন রাজনাথ।
এই রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর। বিরোধী দল ও নাগরিক সংগঠনগুলির অভিযোগ, প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে এবং যোগ্য ভোটারদের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতেও আন্দোলন চলছে। রাজনাথের যুক্তি, সরকার বদলের প্রকাশ্য ডাকই বুঝিয়ে দিচ্ছে, আন্দোলনের লক্ষ্য ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রশ্ন ছাড়িয়ে গিয়েছে।
বিতর্কের পটভূমিতে রয়েছে আইনজীবী ও সমাজকর্মী প্রশান্ত ভূষণের বক্তব্য। তিনি প্রকাশ্যেই সরকার বদল চাওয়ার কথা বলেছেন এবং তাতে আপত্তির কারণ জানতে চেয়েছেন। অন্যদিকে ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা বাংলাদেশের তরুণদের আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার কথা জানান। এই ধরনের বক্তব্যকেই বিরোধীদের বিরুদ্ধে আক্রমণের ভিত্তি করেছেন বিজেপি নেতৃত্ব।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পীযূষ গোয়েলও বিরোধীদের বিরুদ্ধে রাস্তার বিশৃঙ্খলাকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন দেখার অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, ভোটে বারবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরেই বিরোধীরা গোটা ব্যবস্থাকে দুর্বল করতে চাইছে। মন্ত্রী মনোহরলালও জানান, সরকার বদলের নামে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা তাঁরা কোনওভাবেই মেনে নেবেন না।
কংগ্রেস অবশ্য অস্থিরতা তৈরির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। দলের মুখপাত্র পবন খেরার বক্তব্য, সরকারের নীতির বিরোধিতা করা এবং নির্বাচনে তাকে পরাজিত করার চেষ্টা বিরোধী দলের স্বাভাবিক কাজ। সরকারকে আরও দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় রাখার দাবিতে কোনও বিরোধী আন্দোলন হয় না। কংগ্রেস সরকার পরিবর্তন চায়, তবে তা নির্বাচনের মাধ্যমেই—দলের অবস্থান স্পষ্ট করে জানিয়েছেন তিনি।
কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশও প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য স্মরণ করিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে জবাব দেন। তাঁর কথায়, গণতন্ত্রে বিরোধীদের দায়িত্ব হল সরকারের বিরোধিতা করা, তার ব্যর্থতা প্রকাশ্যে আনা এবং তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা। ফলে সরকার বদলের দাবি তোলাকেই অগণতান্ত্রিক বলে চিহ্নিত করার যুক্তি মানতে নারাজ কংগ্রেস। দলের বক্তব্য, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও নির্বাচনী পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থারই অংশ।