বাংলাস্ফিয়ার: ভোটার তালিকা সংশোধনের আরও একটি প্রক্রিয়া চালানোর নির্দেশ দিয়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। এই প্রক্রিয়ার নাম বিশেষ সংক্ষিপ্ত সংশোধন বা স্পেশাল সামারি রিভিশন (এসএসআর)। রাজনৈতিক দলগুলিকে খসড়া ও চূড়ান্ত ভোটার তালিকার প্রতিলিপি দেওয়ার বিষয়ে ওই নির্দেশে কী বলা হয়েছে, সে দিকেই নজর টেনেছে কংগ্রেস।

নির্দেশে বলা হয়েছে, পঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ ও মণিপুরের মতো ভোটমুখী রাজ্য-সহ ১৭টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ভোটার তালিকা এসএসআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংশোধন করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট সময় অন্তর তালিকা হালনাগাদ করা হয়। নতুন করে ভোটদানের যোগ্য হয়ে ওঠা নাগরিকদের নাম যোগ করা হয় এবং যাঁরা মারা গিয়েছেন বা অন্যত্র চলে গিয়েছেন, তাঁদের নাম বাদ দেওয়া হয়। বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরের সঙ্গে এর পার্থক্য হল, এসএসআরে বর্তমান ভোটারদের নাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন তালিকায় স্থান পায়। তাঁদের অতিরিক্ত নথি জমা দিতে হয় না।

শুক্রবার কংগ্রেস কমিশনের নির্দেশের একটি অংশ সামনে আনে। সেখানে সমস্ত স্বীকৃত রাজনৈতিক দলকে পাঠযোগ্য পিডিএফ আকারে খসড়া ও চূড়ান্ত ভোটার তালিকার প্রতিলিপি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। দলের আনুষ্ঠানিক সমাজমাধ্যমের একটি পোস্টে বলা হয়, “ভোটার তালিকায় যে কারচুপি হচ্ছে, তা ধরার জন্য রাহুল গান্ধীজি ধারাবাহিকভাবে মেশিনে পাঠযোগ্য ডিজিটাল ভোটার তালিকা দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন।” ওই পোস্টে আরও দাবি করা হয়, নির্বাচন কমিশন এতে “একেবারেই রাজি ছিল না”, কিন্তু এখন তাকে “হার স্বীকার” করতে হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে ‘মেশিনে পাঠযোগ্য’ বলতে কী বোঝায়?

আগে লিখিত কোনও বিষয়কে ডিজিটাল রূপ দিতে হলে হাতে ধরে তথ্য কম্পিউটারে প্রবেশ করাতে হত। এই শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়ার জায়গা নেয় অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রেকগনিশন বা ওসিআর নামে একটি প্রযুক্তি। বিপুল পরিমাণ তথ্যের সাহায্যে অক্ষরের গঠন ও ধরন চিনতে শেখানোর মাধ্যমে এই প্রযুক্তি যন্ত্রকে অক্ষর শনাক্ত করতে সাহায্য করে।

ভোটার তালিকার ক্ষেত্রে, সেটিকে মেশিনে পাঠযোগ্য করে তুললে ভোটারদের নাম ও অন্যান্য তথ্য খুঁজে পাওয়া সহজ হয়।

নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে বলা হয়েছে, “খসড়া ও চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের অব্যবহিত পরে নির্বাচক নিবন্ধন আধিকারিক বা ইআরও প্রত্যেক স্বীকৃত রাজনৈতিক দলকে প্রতিটি পৃথক ভোটকেন্দ্রের ভোটার তালিকার দু’টি প্রতিলিপি বিনামূল্যে দেবেন—একটি কাগজে ছাপা প্রতিলিপি এবং অন্যটি পাঠযোগ্য পিডিএফ আকারে ডিজিটাল প্রতিলিপি।”

নির্দেশে আরও বলা হয়েছে, ১৯৬০ সালের নির্বাচক নিবন্ধন বিধির ১১(সি) এবং ২২(সি) বিধি অনুযায়ী এই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রথম বিধিটিতে বলা হয়েছে, খসড়া তালিকা তৈরি হওয়ার পরে ইআরও “নির্বাচন কমিশন যে সমস্ত রাজনৈতিক দলের জন্য সংশ্লিষ্ট রাজ্যে একান্তভাবে প্রতীক সংরক্ষিত রেখেছে, সেই প্রত্যেক দলকে তালিকার প্রতিটি পৃথক অংশের দু’টি প্রতিলিপি বিনামূল্যে দেবেন।” চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরেও একই কাজ করার নির্দেশ রয়েছে ২২(সি) বিধিতে।

বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কেন?

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে কংগ্রেস বারবার ভোটার তালিকা মেশিনে পাঠযোগ্য করার দাবি জানিয়েছে।

বর্তমানে ভোটার তালিকা ‘ইমেজ পিডিএফ’ হিসেবে পাওয়া যায়। অর্থাৎ তালিকার পাতাগুলির ছবি স্ক্যান করে আপলোড করা হয়। কমিশনের নতুন নির্দেশে ‘পাঠযোগ্য পিডিএফ’-এর উল্লেখ আদৌ এই ব্যবস্থায় কোনও পরিবর্তন আনছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

গত অগস্টে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী একটি সাংবাদিক বৈঠকে অভিযোগ করেছিলেন, বেঙ্গালুরু সেন্ট্রাল লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত মহাদেবপুরা বিধানসভা এলাকার ভোটার তালিকায় ভুয়ো ভোটারের নাম যোগ করা হয়েছে।

কংগ্রেস মুখপাত্র পবন খেরা লিখেছিলেন, “সারা দেশের ভোটার তালিকা যাচাই করার একমাত্র উপায় হল প্রক্রিয়াটিকে স্বয়ংক্রিয় করা… আমাদের সব নির্বাচনী কেন্দ্রের ডিজিটাল বা মেশিনে পাঠযোগ্য ভোটার তালিকা প্রয়োজন। তা হলে একটি নিরপেক্ষ, অরাজনৈতিক কম্পিউটার প্রোগ্রাম একের পর এক কেন্দ্রের ভোটার তালিকা বিশ্লেষণ করে সেগুলির নির্ভুলতা সম্পর্কে একটি তর্কাতীত মূল্যায়ন তুলে ধরতে পারবে।”

তিনি আরও লিখেছিলেন, “এর ফলে আমাদের দল, যারা প্রথমে একাধিক নির্বাচনী কেন্দ্রের ভোটার তালিকা বিশ্লেষণ করতে বদ্ধপরিকর ছিল, শেষ পর্যন্ত একটি লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত মাত্র একটি বিধানসভা এলাকার তালিকা খুঁটিয়ে দেখতে বাধ্য হয়। কারণ, কাজটি হাতে ধরে করতে হয়েছিল। এই প্রক্রিয়ায় ছ’মাস এবং হাজার হাজার শ্রমঘণ্টা লেগেছিল।”

২০১৮ সালেও কংগ্রেস নেতা তথা মধ্যপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কমল নাথ এবং কংগ্রেস নেতা সচিন পাইলট এই বিষয়টি-সহ নির্বাচন পরিচালনার আরও কয়েকটি প্রক্রিয়াগত প্রশ্ন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন।

বিচারপতি এ কে সিক্রি এবং বিচারপতি অশোক ভূষণ আবেদনগুলি খারিজ করেন। বেঞ্চ জানায়, তাদের “মতে, আবেদনকারীকে যে বিন্যাসে খসড়া ভোটার তালিকা দেওয়া হয়েছে, তা নির্বাচন নির্দেশিকায় উল্লিখিত শর্ত পূরণ করে।” খসড়া ভোটার তালিকার টেক্সট সংস্করণ দেওয়ার দাবির সমর্থনে কমল নাথ ২০১৬ সালের নির্বাচন নির্দেশিকার একাদশ অধ্যায়ের ১১.২.২.২ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করেছিলেন।

‘ওয়েবসাইটে খসড়া তালিকা প্রকাশ’ সংক্রান্ত ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “পাশাপাশি, একই দিনে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের ওয়েবসাইটে পিডিএফ আকারে খসড়া তালিকা জনসাধারণের জন্য প্রকাশ করতে হবে। খসড়া তালিকাটি ওয়েবসাইটে টেক্সট মোডে রাখতে হবে এবং ভোটারের বিবরণের পাশে কোনও ছবি থাকবে না। পরিবর্তে, ভোটারের ছবির জন্য নির্ধারিত ঘরে জানাতে হবে, তাঁর ছবি উপলব্ধ আছে কি না।”

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছিল, তারা ওয়েবসাইটে ভোটার তালিকা টেক্সট মোডেই প্রকাশ করেছে এবং ওয়েবসাইটে থাকা ছবিগুলিও টেক্সট মোডে রয়েছে। কমিশন আরও জানিয়েছিল, “ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে রাজনৈতিক দলগুলিকে স্ক্যানযোগ্য টেক্সট মোডে এই ভোটার তালিকার প্রতিলিপি না দেওয়ার সচেতন সিদ্ধান্ত” নেওয়া হয়েছে।

বিধিগুলি খতিয়ে দেখে আদালত জানায়, “ওই অনুচ্ছেদের কোথাও বলা নেই যে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের ওয়েবসাইটে খসড়া ভোটার তালিকা ‘সার্চযোগ্য পিডিএফ’ হিসেবে প্রকাশ করতে হবে। ফলে আবেদনকারী অধিকার হিসেবে দাবি করতে পারেন না যে ওয়েবসাইটে খসড়া ভোটার তালিকা ‘সার্চযোগ্য মোডে’ রাখতে হবে। সেটি শুধু ‘টেক্সট মোডে’ থাকতে হবে এবং সে ভাবেই দেওয়া হয়েছে।”

আদালত আরও বলে, আবেদনকারী চাইলে “সেটিকে সার্চযোগ্য মোডে রূপান্তর করতেই পারেন। অবশ্য তার জন্য তাঁকে নিজের উদ্যোগ ও শ্রম দিতে হবে।”

২০২৫ সালে বিষয়টি ফের সুপ্রিম কোর্টের বিবেচনায় আসে। তখন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এডিআর-সহ একাধিক আবেদনকারী চলমান এসআইআর প্রক্রিয়ার বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। আবেদনকারীরা অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন ২০০৩ সালের ভোটার তালিকা মেশিনে পাঠযোগ্য আকারে দিতে অস্বীকার করছে। উল্লেখযোগ্য হল, তার আগের এসআইআর প্রক্রিয়া হয়েছিল ২০০২ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে।

এ বারও আদালত বিপুল পরিমাণ তথ্য থেকে বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য ও সম্পর্ক খুঁজে বার করা, অর্থাৎ ‘ডেটা মাইনিং’, এবং ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, “তথ্য অবাধে পাওয়া গেলে যে-কোনও ব্যক্তি বা সংস্থা তা থেকে ডেটা মাইনিং করতে পারে। এর মধ্যেই ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।” তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এর সঙ্গে “ব্যক্তির গোপনীয়তা এবং ভারতীয় নাগরিকদের তথ্যের সামগ্রিক সুরক্ষার প্রশ্ন” জড়িয়ে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, “এটি নিছক দুই পক্ষের বিরোধ নয়। এর প্রভাব বহু ক্ষেত্রে, বহু পক্ষের উপর পড়ে।”

২০২৬ সালের মে মাসে দেওয়া রায়ে সুপ্রিম কোর্ট এসআইআর প্রক্রিয়া বহাল রাখে।