ভারতের বৃহত্তম টেলিকম সংস্থা জিয়োর প্রভাব দেশের মহানগরগুলির সর্বত্র চোখে পড়ে। লাল সিগন্যালে দাঁড়িয়ে ডেলিভারি চালকেরা মোবাইলে একের পর এক ছোট ভিডিও দেখেন। দোকানের কর্মীরা কাউন্টারের নীচে ফোন রেখে সারা দিন পরিবারের সঙ্গে ভিডিও চ্যাট চালু রাখেন। নিরাপত্তারক্ষীরা দীর্ঘ, একঘেয়ে কর্মঘণ্টা কাটান মিম আদানপ্রদান করে আর বিদেশি সুন্দরীদের দিকে চোখ রেখে। জিয়োর অতি সস্তার পরিষেবা ভারতীয়দের সামনে ইন্টারনেটের অফুরন্ত সম্ভার উপভোগের দরজা খুলে দিয়েছে।

এ বার সেই ভোজের আসরে জায়গা করে নিতে পারছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও। ২৮ অক্টোবর ভারতের প্রধান দুই শেয়ারবাজারে জিয়োর শেয়ারের লেনদেন শুরু হয়েছে। এই তালিকাভুক্তিতে সংস্থার মূল্যায়ন হয়েছে ১০ লক্ষ ৩০ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ ১০ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। ভারতীয় মুদ্রার হিসাবে দেশের ইতিহাসে এটিই বৃহত্তম শেয়ারবাজারে অভিষেক; ডলারের হিসাবে দ্বিতীয় বৃহত্তম। প্রথম দিনের লেনদেন শেষে জিয়োর শেয়ারের দাম তালিকাভুক্তির দামের চেয়ে ২৭ শতাংশ বেশি ছিল।

এই অভিষেক ভারতের অন্যতম ধনী শিল্পপতি মুকেশ আম্বানির জন্য বিরাট সাফল্য। ২০১০ সালে তিনি যখন জিয়ো গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন, তখন খুব কম ভারতীয়েরই স্মার্টফোন কেনার সামর্থ্য ছিল। আম্বানির সুবিশাল শিল্পগোষ্ঠী রিলায়্যান্সের যে অল্প কয়েকটি ব্যবসা গড়ে তোলার কৃতিত্ব তাঁর বাবার বদলে তিনি নিজে দাবি করতে পারেন, জিয়ো তার অন্যতম। রিলায়্যান্সের পুরনো টেলিকম ব্যবসাটি পারিবারিক উত্তরাধিকার বণ্টনে পেয়েছিলেন তাঁর ভাই অনিল। সেটি ২০১৯ সালে দেউলিয়া হয়ে যায়।

তবে ইন্টারনেটে মজে থাকা ভারতীয়দের কাছে এই তালিকাভুক্তি ততটা সুসংবাদ না-ও হতে পারে। জিয়োর মূল্যায়ন ইঙ্গিত দিচ্ছে, পরিষেবার দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে। গত অর্থবর্ষে সংস্থার আয় বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। বৃদ্ধির এই গতি ধরে রাখতে হলে জিয়োকে হয় আরও গ্রাহক পেতে হবে, নয়তো পরিষেবার দাম বাড়াতে হবে। অথচ বাজারে সংযোগের বিস্তার ইতিমধ্যেই অনেক দূর পৌঁছে গিয়েছে। ভারতে এখন ১৩০ কোটি বেতার সংযোগ রয়েছে—প্রতি ১০০ জনে ৯২টি। শহরে এই সংখ্যা প্রতি ১০০ জনে ১৪৭টি। তা ছাড়া, আংশিক ভাবে জিয়োর সস্তা পরিষেবার ধাক্কাতেই টেলিকম শিল্পে সংস্থার সংখ্যা ২০১৬ সালের প্রায় এক ডজন থেকে কমে এখন মাত্র চারে এসে ঠেকেছে। এই চারটির মধ্যেও দু’টি টিকে আছে ক্ষীণ উপস্থিতি নিয়ে। জিয়োর হাতে রয়েছে বাজারের ৩৯ শতাংশ; প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতী এয়ারটেলের দখলে ৩৮ শতাংশ। বিপুল ঋণে জর্জরিত ভোডাফোন আইডিয়ার অংশ ১৫ শতাংশ, আর রাষ্ট্রায়ত্ত বিএসএনএলের ৭ শতাংশ।

ফলে আয় বাড়ানোর পথ হিসেবে পরিষেবার দাম বৃদ্ধিই সামনে আসছে। বর্তমানে জিয়োর গ্রাহকপিছু মাসিক গড় আয় প্রায় ২১৪ টাকা বা ২.২৮ ডলার। এর বিনিময়ে গ্রাহকেরা গড়ে পান ৪৪ গিগাবাইট বা জিবি ডেটা। প্রতি জিবির খরচ দাঁড়ায় ৪.৯ টাকা—ভারতের টেলিকম শিল্পের গড় দরের চেয়ে এক-তৃতীয়াংশ কম। আর মার্কিন টেলিকম সংস্থাগুলি যা নেয়, তার মাত্র ২ শতাংশ। এই ব্যবধান কমিয়ে আনাই হবে দ্রুত আয় বাড়ানোর সবচেয়ে সহজ পথ। দেশীয় ব্রোকারেজ সংস্থা মতিলাল ওসওয়ালের পূর্বাভাস, ডিসেম্বরের মধ্যে জিয়োর পরিষেবার দাম ১৫ শতাংশ বাড়তে পারে। সাধারণত জিয়ো মাসুল বাড়ালে এয়ারটেলও একই পথে হাঁটে। সেই প্রত্যাশায় গত এক মাসে এয়ারটেলের শেয়ারের দাম বেড়েছে ১১ শতাংশ।

ভারতের ডেটায় আসক্ত গ্রাহকেরা কি এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবেন? শেষ পর্যন্ত জিয়োর উত্থানের ভিতই তো ছিল চমকে দেওয়ার মতো কম দাম। সংস্থাটি পরিষেবা চালু করার সময়ে প্রারম্ভিক অফারে গ্রাহকেরা বিনা মূল্যে উচ্চগতির ডেটা পেয়েছিলেন। তার জোরেই মাত্র ১৭০ দিনে জিয়োর গ্রাহকসংখ্যা ১০ কোটিতে পৌঁছয়। ভারতীয়েরা এখনও দাম নিয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দুই বড় টেলিকম সংস্থা মাসুল বাড়ানোর পরে চার মাসে জিয়ো ১ কোটি ৬০ লক্ষ গ্রাহক হারিয়েছিল। তাঁদের অনেকেই বিএসএনএলে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রবণতা স্থায়ী হয়নি। একদা একচেটিয়া আধিপত্য থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটির নেটওয়ার্কে স্ট্রিমিংয়ের ধীর গতি এবং সর্বত্র ঠিকমতো পরিষেবা না মেলার কারণে বহু গ্রাহক ফিরে আসেন।

আম্বানি জিয়োর অন্য ব্যবসাগুলিও বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে ফিক্সড-লাইন বা স্থায়ী সংযোগের পরিষেবা এবং স্ট্রিমিং ব্যবসা। সংস্থার মোট আয়ের এক-পঞ্চমাংশ আসে এই সব ব্যবসা থেকে। এক দশক আগে তিনি যেমন সস্তা ইন্টারনেট নিয়ে এসেছিলেন, সেই ধাঁচেই এ বার ভারতে ‘সাশ্রয়ী বুদ্ধিমত্তা’ পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এই শিল্পপতি। জিয়োর মাধ্যমে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নানা পরিষেবা বিক্রি করতে পারেন।

ইলন মাস্কের স্টারলিঙ্কের মতো উপগ্রহভিত্তিক ইন্টারনেট পরিষেবা চালুর পরিকল্পনাও করছেন তিনি। স্টারলিঙ্কের পরিষেবা চালু অবশ্য নিয়ন্ত্রক বাধায় আটকে রয়েছে। সম্প্রতি এই বিলম্বের জন্য ‘কয়েকজন ক্ষমতাশালী ধনকুবেরকে’ দায়ী করেছেন মাস্ক।

জিয়োর সঙ্গে উপগ্রহভিত্তিক ইন্টারনেট ব্যবসার মিল খুঁজে পাওয়া একটু কঠিন। কারণ, ভারতের বিপুল জনঘনত্বই এত দিন সংস্থাটিকে সুবিধা দিয়েছে। দেশের ঠাসাঠাসি শহরগুলিতে একটি ৫জি টাওয়ারের আওতায় কয়েক দশ হাজার মানুষ চলে আসেন। তাতে খরচ কম রাখা যায়। অন্য দিকে, উপগ্রহের মাধ্যমে ইন্টারনেট সবচেয়ে বেশি কাজে লাগে দুর্গম ও জনবিরল এলাকায়—ভারতে যে এলাকাগুলি সাধারণত দরিদ্রও। স্টারলিঙ্কের পরিষেবা বিতরণের জন্য জিয়ো ইতিমধ্যেই অংশীদারিত্বে সম্মত হয়েছিল। তা হলে নিজস্ব উপগ্রহের প্রয়োজন কেন?

কারণ, আম্বানির কাছে এক গ্রাহকের গুরুত্ব অন্য সকলের চেয়ে বেশি: এমন এক সরকার, যে ইলন মাস্কের উপর নির্ভরশীল হতে চায় না।