সারা দেশে ভোট হওয়া বিধান পরিষদের ২৮টি আসনের মধ্যে বুধবার, ২৮ অক্টোবর, কংগ্রেস মাত্র একটিতে জয়ী হওয়ায় দলটিকে কটাক্ষ করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাঁর কটাক্ষের কারণ, বিধান পরিষদের সদস্য বা এমএলসি নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন—ইভিএম—ব্যবহার করা হয় না; ভোট হয় ব্যালট পেপারে। অথচ অতীতে নির্বাচনী পরাজয়ের জন্য ইভিএমকে দায়ী করেছে কংগ্রেস।

ভারতের যে কয়েকটি রাজ্যে আইনসভার দ্বিতীয় কক্ষ রয়েছে, সেখানেই বিধান পরিষদের সদস্যদের নির্বাচন হয়।

প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যে ইভিএম বনাম ব্যালট পেপারের বিতর্ক আবার সামনে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে দেখে নেওয়া যাক, ভারতে কোন কোন নির্বাচনে এখনও ব্যালট পেপার ব্যবহার করা হয়।

কোন কোন নির্বাচনে ব্যালট পেপার ব্যবহার করা হয়?

গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি এবং জেলা পরিষদের অধিকাংশ নির্বাচনেই ব্যালট পেপারে ভোট হয়। পঞ্চায়েতিরাজ মন্ত্রকের পৃষ্ঠপোষকতায় ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা আইআইপিএ-র করা ২০২৩ সালের একটি সমীক্ষায় বলা হয়, “৫৩ শতাংশ রাজ্যে গ্রাম পঞ্চায়েত নির্বাচনে ভোটদানের মাধ্যম হিসেবে ব্যালট পেপার ব্যবহার করা হয়।”

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, “মাত্র তিনটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে—কেরল, সিকিম এবং দাদরা ও নগর হাভেলি ও দমন ও দিউ—গ্রাম পঞ্চায়েতের সমস্ত নির্বাচনী ক্ষেত্রে ইভিএমে ভোট হয়। অন্য রাজ্যগুলি অবশ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২২ শতাংশ রাজ্যে কিছু নির্বাচনী ক্ষেত্রে ইভিএম চালু হয়েছে, বাকি নির্বাচনী ক্ষেত্রগুলিতে এখনও ব্যালট পেপার ব্যবহার করা হচ্ছে।”

“তবে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার উঁচু স্তরে, অর্থাৎ মধ্যবর্তী স্তরের পঞ্চায়েত এবং জেলা পঞ্চায়েতের নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারকারী রাজ্যের অনুপাত বাড়ে। যেমন, জেলা পঞ্চায়েত বা জেলা পরিষদের নির্বাচনে ১৭ শতাংশ রাজ্য সমস্ত নির্বাচনী ক্ষেত্রেই ইভিএম ব্যবহার করে।”

ওই প্রতিবেদনে ব্যালট ব্যবহার চালু থাকার কারণও আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, “যে রাজ্যগুলি ব্যালট পেপার ব্যবহার করছে, তারা জানিয়েছে, অর্থের অভাব এবং ইভিএম ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি পঞ্চায়েত নির্বাচনে এই যন্ত্র চালুর অন্যতম বড় বাধা। কিন্তু এই একই ভোটার বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনে ইভিএমেই ভোট দেন। ফলে ভোটারদের সচেতনতার অভাবের যুক্তিটি একপেশে।”

প্রতিবেদনটির বক্তব্য, ব্যালট পেপার গণনা একটি শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়া, যার জন্য বিপুল সংখ্যক কর্মী প্রয়োজন। তা পরিবেশবান্ধবও নয়।

মহারাষ্ট্রের চন্দ্রপুরের প্রাক্তন নির্বাচিত সরপঞ্চ কল্যাণ কুমার জানান, গ্রামীণ স্থানীয় সংস্থার নির্বাচনের কয়েক দিন আগে তহশিলদারেরা প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ করেন। তাঁর কথায়, “তাঁরা তিনটি পছন্দ জানাতে বলেন এবং তার মধ্যে একটি প্রতীক দেন। এগুলি আমাদের পরিচিত রাজনৈতিক দলের প্রতীক নয়।”

কল্যাণ কুমারের মতে, এই ধরনের নির্বাচনে মতাদর্শের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল, কোনও প্রার্থী ভোটারদের সঙ্গে কতটা যোগাযোগ রাখেন এবং তাঁদের দৈনন্দিন কাজকর্মে কতটা সাহায্য করেন। ফলে এই নির্বাচনে সাফল্য মূলত ভোটারদের সঙ্গে প্রার্থীর সম্পর্কের গভীরতাই তুলে ধরে।

গ্রামীণ স্থানীয় সংস্থাগুলির নির্বাচনী প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিহারের এক আধিকারিক বলেন, গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি-সহ একাধিক স্তরের নির্বাচন প্রায় একই সময়ে হয়। এই পরিস্থিতিতে ব্যালট পেপার ব্যবহার করা সুবিধাজনক, কারণ এতগুলি নির্বাচনের জন্য বিপুল সংখ্যক যন্ত্র ব্যবহার করা কঠিন। তবে তিনি স্বীকার করেন, যেখানে ব্যালট পেপার ব্যবহার করা হয়, সেখানে গণনা শ্রমসাধ্য হয়ে ওঠে।

প্রচলিত দলীয় প্রতীক ব্যবহার না হলে কিছু রাজ্য কী ভাবে ইভিএমে পঞ্চায়েত নির্বাচন করে—এই প্রশ্নে প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা জানান, ‘সিম্বল লোডিং’ নামে একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রতীক ইভিএমে যুক্ত করা হয়।

পুরসভা ও ছাত্র সংসদের নির্বাচন

পুরনিগমের নির্বাচন প্রসঙ্গে লাভাসা বলেন, এই নির্বাচনগুলি সংশ্লিষ্ট রাজ্য নির্বাচন কমিশনের এক্তিয়ারভুক্ত। কমিশনই ঠিক করতে পারে, ভোট ইভিএমে হবে, না ব্যালট পেপারে।

যেমন, দিল্লি পুরনিগমের নির্বাচন ইভিএমে হয়। অন্য দিকে, পাঞ্জাব ২০২৬ সালে ব্যালট পেপারে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাই কোর্ট জানায়, পাঞ্জাবের ১৯৯৪ সালের পুর নির্বাচনী বিধিতে ব্যালট পেপার এবং ইভিএম—দুই ব্যবস্থারই অনুমতি রয়েছে। ফলে রাজ্য নির্বাচন কমিশন আইনত যে কোনও একটি বেছে নিতে পারে।

ছাত্র সংসদের নির্বাচনেও কোথাও ইভিএম, কোথাও ব্যালট পেপার ব্যবহার করা হয়। যেমন, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়।

অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের জাতীয় সংবাদমাধ্যম আহ্বায়ক হর্ষ আত্রি বলেন, “ইভিএমে প্রার্থীদের নাম বর্ণানুক্রমে থাকে। এখানে প্রার্থীর নাম এবং তাঁর ব্যালট নম্বর গুরুত্বপূর্ণ।”

অন্য দিকে, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ব্যালট পেপারে ভোট হয়।

একক হস্তান্তরযোগ্য ভোট কী?

তবে একক হস্তান্তরযোগ্য ভোটপদ্ধতিতে যে নির্বাচনগুলি হয়, সেখানে ব্যালট পেপার ব্যবহার করতে হয়। ভারতীয় সংবিধানের ১৭১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিধান পরিষদের নির্বাচন এই পদ্ধতিতে হয়।

এই ব্যবস্থায় ভোটারকে ব্যালট পেপারে প্রথম পছন্দ, দ্বিতীয় পছন্দ এবং পরবর্তী পছন্দগুলি চিহ্নিত করতে হয়। সেই পছন্দক্রম অনুযায়ী ভোট অন্য প্রার্থীর কাছে হস্তান্তর করা যায়। এই কাজটি ইভিএমের পরিবর্তে ব্যালট পেপারেই করা হয়।

রাজ্যসভার নির্বাচনও একক হস্তান্তরযোগ্য ভোটপদ্ধতিতে হয়। সেখানেও ভোটদাতা ব্যালট পেপারে নিজের পছন্দক্রম চিহ্নিত করেন।

কোনও প্রার্থীকে জিততে কত ভোট পেতে হবে, অর্থাৎ জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ‘কোটা’ কত হবে, তা নির্ধারণ করতে একটি সূত্র ব্যবহার করা হয়। সংশ্লিষ্ট রাজ্যে ভোটদানকারী বিধায়কদের মোট সংখ্যাকে ভাগ করা হয় নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত আসনসংখ্যার সঙ্গে এক যোগ করে পাওয়া সংখ্যা দিয়ে। তার পরে ভাগফলের সঙ্গে এক যোগ করে কোটা নির্ধারণ করা হয়।

একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যাক।

ধরা যাক, একটি রাজ্যে মোট ২০০ জন বিধায়ক ভোট দিচ্ছেন এবং চারটি আসনে নির্বাচন হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে ২০০-কে ভাগ করতে হবে ৪+১, অর্থাৎ ৫ দিয়ে। ভাগফল হবে ৪০। এর সঙ্গে এক যোগ করলে জয়ের কোটা হবে ৪১। অর্থাৎ, কোনও প্রার্থী ৪১ ভোট পেলেই নির্বাচিত বলে ঘোষিত হবেন।

তবে এখানে অনুসৃত ব্যবস্থাটি একক হস্তান্তরযোগ্য ভোটের। ফলে বিধায়কেরা প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং পরবর্তী পছন্দগুলি চিহ্নিত করতে পারেন। রাজ্যসভার নির্বাচনে ভোট হয় ‘ওপেন ব্যালট’ পদ্ধতিতে।

উপরের উদাহরণে যে প্রার্থী প্রথম পছন্দের ৪১টি ভোট পাবেন, তিনিই নির্বাচিত হবেন। কিন্তু এ ভাবে যদি সব আসন পূরণ না হয়, তা হলে ইতিমধ্যে নির্বাচিত প্রার্থীদের উদ্বৃত্ত ভোট হস্তান্তর করা হবে। সংশ্লিষ্ট বিধায়কদের ব্যালটে যাঁরা দ্বিতীয় পছন্দের প্রার্থী, তাঁদের কাছে যাবে সেই ভোট।

আবার আগের উদাহরণে ফিরে যাওয়া যাক। জয়ের কোটা যেখানে ৪১, সেখানে কোনও জয়ী প্রার্থী যদি ৪৫ ভোট পান, তা হলে তাঁর উদ্বৃত্ত ভোটের সংখ্যা হবে চার। এই চারটি উদ্বৃত্ত ভোট দ্বিতীয় পছন্দের প্রার্থীদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

একাধিক জয়ী প্রার্থীর উদ্বৃত্ত ভোট থাকলে, যাঁর উদ্বৃত্ত সবচেয়ে বেশি, তাঁর ভোট আগে হস্তান্তর করা হবে। এর পরেও যদি সব আসন পূরণ না হয়, তা হলে প্রথম পছন্দের সবচেয়ে কম ভোট পাওয়া প্রার্থীকে বাদ দেওয়া হবে। তাঁকে ভোট দেওয়া বিধায়কদের ব্যালটে দ্বিতীয় পছন্দ হিসেবে যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁদের কাছে ভোট হস্তান্তর করা হবে।

সমস্ত আসন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চলতে থাকবে।