প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাজকর্মে বাধা দেওয়ার যে কোনও চেষ্টা আইনবিরুদ্ধ হবে। সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা একটি যৌথ হলফনামায় এই বক্তব্য জানিয়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার।
সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ গভীর রাতে শীর্ষ আদালতে জমা দেওয়া প্রায় ২৫০ পাতার ওই হলফনামায় বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতিকে যে পদ্ধতিতে এবং যে সব কারণে অপসারণ করা যায়, কেবল সেই একই পদ্ধতি ও কারণেই প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে পদ থেকে সরানো সম্ভব।
কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে একতরফা বা স্বৈরাচারী পদ্ধতিতে কাজ করার অভিযোগ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনকে আদালতে প্রমাণ হিসেবে প্রায় কোনও গুরুত্বই দেওয়া যায় না বলে দাবি করা হয়েছে হলফনামায়। কমিশনের বক্তব্য, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দায়ের করা আবেদন আদালতে গ্রহণযোগ্যই হওয়া উচিত নয়।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাজকর্মকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে যাঁরা আবেদন করেছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের অন্য নেতারা। আবেদনকারীদের মধ্যে রাকেশ কুমার সিং এবং আইনজীবী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠীও রয়েছেন।
যৌথ হলফনামায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশীর অভিন্ন অবস্থান উঠে এসেছে। তাঁরা জানিয়েছেন, কমিশন “কোনও সংবাদ সংস্থার কাছে কোনও অভ্যন্তরীণ নোট বা নথি প্রকাশ করেনি, কিংবা তা প্রকাশের অনুমতিও দেয়নি”।
হলফনামায় বলা হয়েছে, বহু সদস্যবিশিষ্ট কমিশনের মধ্যে কোনও “মতপার্থক্য” হলে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার (নিয়োগ, চাকরির শর্তাবলি ও কার্যকালের মেয়াদ) আইন, ২০২৩-এর ১৮ নম্বর ধারা অনুসারেই এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
হলফনামায় বোঝানো হয়েছে, নির্বাচন কমিশনে একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোনও অবকাশ নেই। সিদ্ধান্তগুলি বিভিন্ন স্তরে যাচাই করা হয়।
হলফনামার ভাষায়, “সিদ্ধান্তগুলি প্রথমে একজন নির্বাচন কমিশনারের কাছে পাঠানো হয়, তারপর অন্য নির্বাচন কমিশনারের কাছে এবং সব শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে পাঠানো হয়। নির্বাচন কমিশনের এ ভাবে অনুমোদিত সিদ্ধান্তগুলি সংশ্লিষ্ট নথিতে যথাযথ ভাবে লিপিবদ্ধ থাকে এবং তাতে নির্বাচন কমিশনারদের ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের স্বাক্ষর থাকে। এর পরে নির্বাচন কমিশনের সচিবালয় সেই সিদ্ধান্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানায় এবং কার্যকর করে।”
“গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলি” সরাসরি “সমগ্র কমিশনের অধীনে” রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। হলফনামায় বলা হয়েছে, “কমিশনের বৈঠকে গৃহীত অথবা নথিতে লিপিবদ্ধ সিদ্ধান্তগুলিতে নির্বাচন কমিশনারদের এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের স্বাক্ষর থাকে।”
কমিশনের অভ্যন্তরীণ কাজ বণ্টন সংক্রান্ত একটি দফতরি নির্দেশ জারি করা হয়েছিল ২০২৬ সালের ২৮ জুলাই। নির্বাচন কমিশনে ডেপুটেশনে নিযুক্ত অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার এক আইএএস আধিকারিক ওই নির্দেশ জারি করেছিলেন।
তবে হলফনামায় পরোক্ষে স্বীকার করা হয়েছে যে, সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার মণীশ গর্গের আচরণ নিয়ে ক্যাবিনেট সচিবকে চিঠি দিয়েছিলেন সান্ধু ও জোশী। ভোটার তালিকার উপর তথ্যপ্রযুক্তিগত নজরদারির স্তর সংক্রান্ত বিতর্কিত ২৮ জুলাইয়ের নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে ওই চিঠি দেওয়া হয়। দুই নির্বাচন কমিশনারের অজ্ঞাতে এবং তাঁদের সম্মতি ছাড়াই নির্দেশটি জারি করা হয়েছিল।
হলফনামায় বলা হয়েছে, “২৯ জুলাই দুই নির্বাচন কমিশনার এই নির্দেশ এবং সংশ্লিষ্ট আধিকারিকের আচরণ নিয়ে ক্যাবিনেট সচিবকে পৃথক চিঠি লিখেছিলেন।” একই সঙ্গে দাবি করা হয়েছে, ২৮ জুলাইয়ের নির্দেশ “কখনও কার্যকর করা হয়নি”।
২০২৫ সালের ২৪ জুন ও ২৭ অক্টোবর এবং ২০২৬ সালের ১৪ মে জারি করা পরপর বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-সংক্রান্ত নির্দেশে ফর্ম ৬ বদলে দেওয়া হয়েছে—এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে নির্বাচন কমিশন।
কমিশনের যুক্তি, ভোটারদের ‘ম্যাপিং’-সংক্রান্ত তথ্য দিতে যে অতিরিক্ত ঘোষণাপত্র চাওয়া হচ্ছে, সেটি “ফর্ম ৬-এর অংশ নয়”। ফর্ম ৬ হল ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আইননির্ধারিত আবেদনপত্র।
হলফনামায় বলা হয়েছে, “এসআইআর চলাকালীন ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রত্যেক আবেদনকারীকে ফর্ম ৬-এর সঙ্গে যে সব নথি জমা দিতে হয়, এই ঘোষণাপত্র তারই একটি।”
অতিরিক্ত ঘোষণাপত্রে ‘ম্যাপিং’-এর ব্যবস্থা রাখায় যাচাইয়ের জন্য আরও নথি জমা দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না বলে দাবি করেছে কমিশন। তাদের বক্তব্য, এটি কেবল “ভোটারদের সহায়তার জন্য নেওয়া একটি ব্যবস্থা”।
হলফনামায় বলা হয়েছে, “ফর্ম ৬-এ কোনও পরিবর্তন করা হয়নি।”
পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা আপিলগুলি সম্পর্কে কমিশন জানিয়েছে, সেগুলি সত্যিই রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতরের আধিকারিকেরা দায়ের করেছিলেন। তাঁরা “লোকপ্রতিনিধিত্ব আইনের অধীনে কর্তৃপক্ষ হিসেবে” ওই আপিল করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের কাছ থেকে ২২ অক্টোবর পাওয়া একটি বার্তার ভিত্তিতে এই বক্তব্য জানানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে কমিশন।
হলফনামায় বলা হয়েছে, “সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী ওই আধিকারিকদের আপিল দায়ের করার ক্ষমতা ছিল। এই বিষয়গুলি কমিশনের কাছে আনা হয়নি।”
গোয়ায় এসআইআর চলাকালীন প্রাথমিক ভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ৯৭ জন ভোটার সম্পর্কে ওঠা অভিযোগের জবাবে কমিশন জানিয়েছে, তাঁদের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। ওই ৯৭ জনের মধ্যে ৮৮ জন ইতিমধ্যেই ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য ফর্ম ৬ পূরণ করেছেন।
কমিশন জানিয়েছে, “তাঁদের আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে। ছ’জন দেশের বাইরে ছিলেন এবং তিনজন ছিলেন পর্তুগিজ পাসপোর্টধারী।”