ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর আইনসম্মত, তার প্রক্রিয়াও যুক্তিসংগত—সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া হলফনামায় এই অবস্থান জানাল নির্বাচন কমিশন। একই সঙ্গে কমিশনের অভ্যন্তরীণ আপত্তির ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে, কোনও কমিশনারের প্রশ্ন, পর্যবেক্ষণ কিংবা প্রস্তাবকে কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা চলে না। সোমবার, ২৬ অক্টোবর দাখিল করা এই হলফনামার মাধ্যমে তিন সদস্যের কমিশন আদালতে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান তুলে ধরেছে।

বিতর্কের সূত্রপাত ২৩ সেপ্টেম্বরের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। সেখানে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশীর নথিভুক্ত আপত্তির কথা প্রকাশিত হয়। ভোটার তালিকা পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের ক্ষমতা সংকুচিত হওয়া এবং নতুন ভোটারদের আবেদনের ফর্ম ৬-এ অনুমোদনহীন পরিবর্তনের অভিযোগ সামনে আসে। সেই পটভূমিতে সমাজকর্মী রাকেশ কুমার সিং আদালতের দ্বারস্থ হন।

কমিশনের বক্তব্য, ২০২৫ সালের ২৪ জুন ও ২৭ অক্টোবর এবং ২০২৬ সালের ১৪ মে জারি করা তিনটি এসআইআর নির্দেশই সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছিল। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—এই অভিযোগ তারা অস্বীকার করেছে। উপনির্বাচন কমিশনার ভানু প্রকাশ ইয়েতুরুর দাখিল করা জবাবটিও তিন সদস্যের সর্বসম্মত অনুমোদন পেয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

আবেদনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে কমিশন। তাদের যুক্তি, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য নিজে থেকেই আদালতে প্রমাণ হয়ে যায় না। আবেদনকারী সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে তথ্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করেননি। কমিশন কোনও অভ্যন্তরীণ নথি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করেনি বা প্রকাশের অনুমতিও দেয়নি। এই যুক্তিতে সংবাদপ্রতিবেদনের ভিত্তিতে ওঠা অভিযোগের আইনি ভিত্তি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে তারা।

অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি ব্যাখ্যা করে কমিশন জানিয়েছে, সাধারণত একটি ফাইল প্রথমে একজন নির্বাচন কমিশনার, পরে অন্যজন এবং শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে যায়। সেই পর্যায়ে নানা মতামত, প্রশ্ন বা পরামর্শ নথিভুক্ত হতে পারে। কিন্তু সেগুলির প্রত্যেকটি স্বতন্ত্রভাবে কমিশনের সিদ্ধান্ত নয়। জরুরি প্রয়োজনে বৈদ্যুতিন মাধ্যমে সম্মতি নিয়ে পরে তা ফাইলে নথিভুক্ত করার ব্যবস্থাও রয়েছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ২০২৩ সালের আইনের ১৮ ধারার কথাও জানিয়েছে কমিশন। তাদের ব্যাখ্যা, যত দূর সম্ভব সর্বসম্মতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু সর্বসম্মতি না হলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতেও সিদ্ধান্ত হতে পারে। তাই আলোচনার পর্যায়ের মতভেদ এবং আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের মধ্যে পার্থক্য করতে বলেছে কমিশন।

তবে কাজ বণ্টনের একটি নির্দেশ ঘিরে দুই কমিশনারের আপত্তির ঘটনা হলফনামায় স্বীকার করা হয়েছে। ২৮ জুলাইয়ের ওই নির্দেশ এবং সংশ্লিষ্ট আধিকারিকের আচরণ নিয়ে সান্ধু ও জোশী ক্যাবিনেট সচিবকে পৃথক চিঠি দিয়েছিলেন। কমিশনের ব্যাখ্যা, দুই কমিশনারের ৩০ জুলাইয়ের যৌথ নির্দেশের কারণে আগের নির্দেশটি কার্যকরই হয়নি। ফলে আপত্তির অস্তিত্ব স্বীকার করেও তার প্রশাসনিক পরিণতি নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

ফর্ম ৬ নিয়ে কমিশনের মূল বক্তব্য, আইননির্ধারিত ফর্মটি সংশোধন করা হয়নি; সেটি বদলানোর ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের। এসআইআরের জন্য প্রয়োজনীয় ঘোষণাপত্র একটি পৃথক নথি। আবেদনকারীকে আগের নিবিড় সংশোধনের ভোটার তালিকার সঙ্গে নিজের অথবা বাবা-মা কিংবা দাদু-দিদিমার তথ্য মিলিয়ে দেখানোর যে ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা ওই ঘোষণাপত্রের অংশ। কমিশনের দাবি, এই তথ্যসংযোগের উদ্দেশ্য ভোটার নিবন্ধনের কাজে সহায়তা করা।

একই সঙ্গে কমিশন মেনেছে, অনলাইন ব্যবস্থায় ঘোষণাপত্রটি যেভাবে দেখানো হচ্ছিল, তাতে ফর্ম ৬-ই সংশোধন করা হয়েছে বলে মনে হতে পারত। সেই কারণে ২১ অক্টোবর থেকে অনলাইনে ফর্ম ৬ ও এসআইআরের ঘোষণাপত্র আলাদা করে উপস্থাপনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, ফর্ম সংশোধনের অভিযোগ অস্বীকার করলেও ডিজিটাল আবেদনপদ্ধতিতে পরিবর্তনের প্রয়োজন কমিশন নিজেই স্বীকার করেছে।

কমিশনের প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা ইসিআইনেট নিয়েও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। তাদের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার বা ইআরওর নির্দেশ ছাড়া কোনও নাম যোগ, বাদ কিংবা সংশোধন করা যায় না। ভোটার তালিকা নিয়ে সিদ্ধান্তের দায়িত্ব ওই আধিকারিকেরই। প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে সেই দায়িত্ব ও ক্ষমতার প্রয়োগ ব্যাহত হচ্ছে কি না, বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা সেটিই। কমিশন জানিয়েছে, ইআরওরা যাতে আইন অনুযায়ী নিজেদের সমস্ত দায়িত্ব এবং বিবেচনাধিকার বাধাহীনভাবে প্রয়োগ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ইসিআইনেট দলের। পোর্টালের কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

পুরনো তালিকার সঙ্গে তথ্য মেলানো যায়নি, এমন ভোটারদের সুবিধার্থেও ব্যবস্থার কথা জানিয়েছে কমিশন। বুথস্তরের আধিকারিকেরা বাড়ি থেকে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করে ইসিআইনেটে জমা দেবেন। সাধারণভাবে সংশ্লিষ্ট ভোটারকে সশরীরে শুনানিতে হাজির হতে হবে না। ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে শুনানি প্রয়োজন হলেও সম্ভব হলে তা অনলাইনে করার কথা বলা হয়েছে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখার দাবিও কমিশন প্রত্যাখ্যান করেছে। সংবিধানের ৩২৪(৫) অনুচ্ছেদের সুরক্ষার উল্লেখ করে তাদের বক্তব্য, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে অপসারণের জন্য নির্ধারিত পদ্ধতি ও কারণ ছাড়া প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণ করা যায় না। কমিশন জানিয়েছে, এটি প্রাথমিক জবাব; পরে বিস্তারিত অনুচ্ছেদভিত্তিক উত্তর দেওয়ার অধিকার তারা বজায় রাখছে।

এই হলফনামার তাৎপর্য বিচার করতে দুটি বিষয় আলাদা রাখা জরুরি। এসআইআর চালু করার মূল নির্দেশে সর্বসম্মতি ছিল কি না, সেটি একটি প্রশ্ন। বাস্তবে ফর্ম, সফটওয়্যার এবং আধিকারিকদের ক্ষমতা সংক্রান্ত প্রতিটি পদক্ষেপ যথাযথ অনুমোদনে হয়েছে কি না, সেটি আরেকটি। প্রথমটির পক্ষে ঐক্যের দাবি দ্বিতীয়টির সমস্ত অভিযোগের স্বয়ংক্রিয় উত্তর নয়।

একইভাবে, কোনও নথিতে আপত্তি থাকলেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বেআইনি প্রমাণিত হয় না; আবার আপত্তিকে আলোচনার অংশ বললেই তার বিষয়বস্তু গুরুত্ব হারায় না। কী আপত্তি উঠেছিল, কীভাবে তার নিষ্পত্তি হয়েছিল এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের নথি কী বলছে—জবাবদিহির কেন্দ্রে রয়েছে এই প্রশ্নগুলি। আদালতের সামনে কমিশনের দাবি এখন সেই নথিগত পরীক্ষার মুখোমুখি।