ভারতের ডিজিটাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন, ২০২৩ বা ডিপিডিপি আইনকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করেছে ২১টি সংবাদপ্রকাশনা সংস্থার একটি সংগঠন। তাদের অভিযোগ, এই আইন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে বিপর্যস্ত করবে এবং সাংবাদিকদের গোপন সূত্রের পরিচয় জানার সুযোগ করে দেবে সরকারকে। মামলার নথি থেকে এই তথ্য জানা গিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার ব্যবহারকারীদের ডিজিটাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত করতে ২০২৫ সালে আইনটি কার্যকর করার কথা ঘোষণা করে। এর ফলে মেটা ও গুগলের মতো সংস্থার ওপর আইন মেনে চলার দায়দায়িত্ব বাড়ছে। কিন্তু সংবাদমাধ্যমকে আইনের আওতা থেকে ছাড় না দেওয়ায় এটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে বলে অভিযোগ প্রকাশকদের।
আগস্টে সরকারের সঙ্গে একটি বৈঠকে সংবাদমাধ্যমের সংস্থাগুলিকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, আইনটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করবে। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সিঙ্গাপুর ও ব্রিটেনের মতো সাংবাদিকদের জন্য আইনে সুনির্দিষ্ট লিখিত ছাড় না থাকা উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছে ডিজিটাল নিউজ পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশন বা ডিএনপিএ। সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া সংগঠনের একটি গোপনীয় আবেদনপত্রে এই বক্তব্য রয়েছে। নথিটি দেখেছে রয়টার্স।
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, মামলাটির শুনানি হওয়ার কথা। সরকারের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইনের বিরুদ্ধে এটিই এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে আলোচিত ও প্রভাবশালী মহলের আইনি চ্যালেঞ্জ। এর আগে মূলত বাক্স্বাধীনতার পক্ষে আন্দোলনকারীরা এবং তুলনায় ছোট কয়েকটি সংবাদমাধ্যম আইনটিকে চ্যালেঞ্জ করেছিল।
আম্বানি ও আদানির নেতৃত্বাধীন ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলির তরফে সরকারের বিরুদ্ধে এমন চ্যালেঞ্জও বিরল। বিরোধী দলগুলি প্রায়ই অভিযোগ করে, এই দুই শিল্পপতি মোদীর ঘনিষ্ঠ এবং সরকারের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা পান। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক গোষ্ঠী এবং সরকার এই অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে।
রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে ডিএনপিএ বা সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের গোষ্ঠীগুলি সাড়া দেয়নি। তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকও কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
প্রকাশকদের দাবি, আইনের বিতর্কিত ধারাগুলির অধিকাংশই বাতিল করতে হবে। এই বিধানগুলি ২০২৭ সালের মে মাস থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। তাদের যুক্তি, আইনটি এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যেখানে কোনও ব্যক্তির বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করার আগে সাংবাদিককে সেই ব্যক্তির সম্মতি নিতে হবে। প্রকাশকদের প্রকাশিত প্রতিবেদন মুছে ফেলতেও বাধ্য করা হতে পারে। পাশাপাশি, তথ্য চেয়ে পাঠানোর যে ক্ষমতা এই আইন দিয়েছে, তার প্রয়োগে সাংবাদিকদের গোপন সূত্রের পরিচয় প্রকাশ হয়ে যেতে পারে।
৬৯৮ পাতার আবেদনপত্রে বলা হয়েছে, এই আইন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে “ঘটনার এক নিরীহ ও শক্তিহীন লিপিকারে পরিণত করবে”। বিতর্কিত বিধানগুলি “আগাম সেন্সরশিপের শামিল, যা গণতন্ত্র নামের যোগ্য যে কোনও ব্যবস্থার মৌলিক নীতির পরিপন্থী”।
২০১৪ সালে মোদী ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কমছে—এই অভিযোগের মধ্যেই মামলাটি হয়েছে। সমালোচকদের বক্তব্য, বহু মূলধারার সংবাদমাধ্যম মোদী সরকারের কাজকর্ম যথেষ্ট কঠোরভাবে খতিয়ে দেখেনি।
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে চলতি বছর ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ১৫৭তম। ২০১৪ সালে ভারত ছিল ১৪০তম স্থানে। তবে সরকার এই সূচক প্রত্যাখ্যান করে।
মোদী সরকারের বক্তব্য, তারা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সম্মান করে। শত শত সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেল নিয়ে ভারতের “প্রাণবন্ত সংবাদমাধ্যম পরিসর” রয়েছে এবং বিদেশি কোনও প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতির প্রয়োজন ভারতের নেই বলেও সরকারের দাবি।
ডিএনপিএ-র সদস্যদের মধ্যে রয়েছে আম্বানির নেটওয়ার্ক১৮, যার সাতটি ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম রয়েছে; আদানির এনডিটিভি; এবং ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও টাইমস ইন্টারনেটের মতো বড় সংবাদমাধ্যমের সংস্থা। টাইমস ইন্টারনেট টাইমস অব ইন্ডিয়া গোষ্ঠীর অংশ। এই গোষ্ঠীই ভারতের সর্বাধিক বিক্রীত ইংরেজি দৈনিকের প্রকাশক।
সংগঠনের আবেদন অনুযায়ী, আইনের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের জায়গা হল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা।
কোনও সমাজমাধ্যম বা অনলাইন বিপণন সংস্থা ব্যবহারকারীকে পরিষেবায় যুক্ত করার সময় তাঁর সম্মতি চাইতে পারে। কিন্তু ডিএনপিএ-র যুক্তি, একজন সাংবাদিককে যদি যাঁর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে তাঁকে আগাম জানাতে এবং তাঁর সম্মতি চাইতে হয়, তা হলে “সেই ব্যক্তি প্রমাণ নষ্ট করার এবং সাক্ষীদের ভয় দেখানোর সুযোগ পাবেন”।
আইন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যে কোনও সময় তাঁর সম্মতি প্রত্যাহার করে নিজের তথ্য মুছে দেওয়ার দাবিও জানাতে পারেন। ডিএনপিএ-র অভিযোগ, এর ক্ষেত্রে জনস্বার্থ রক্ষার কোনও বিধান নেই। ফলে তাদের সদস্য সংস্থাগুলি একটি তথ্যনিষ্ঠ সংবাদপ্রতিবেদন সরিয়ে নিতে অথবা তার বড় অংশ বাদ দিতে বাধ্য হতে পারে।
প্রকাশকদের আরও উদ্বেগ, এই আইনে গঠিত একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ বিধি না মানার জন্য জরিমানা করতে পারবে। পাশাপাশি, “সাধারণ মানুষের স্বার্থে” যে কোনও তথ্যে প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারকে। ডিএনপিএ-র বক্তব্য, এর ফলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব হবে।
মামলার সঙ্গে যুক্ত, আগস্টে সরকারকে লেখা একটি চিঠিতে সংগঠনটি বলেছে, ভারত “রাষ্ট্রকে ব্যাপক ছাড় দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে, অথচ সংবাদমাধ্যমকে অনুরূপ কোনও সুরক্ষা দেয়নি”। ওই চিঠির কোনও জবাবের উল্লেখ নথিতে নেই।
আবেদনপত্রে আরও বলা হয়েছে, আগামী বছর থেকে এই আইন ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে কাজ করে এমন যে কোনও সংস্থাকে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশমতো “যে তথ্য চাওয়া হবে, তা সরবরাহ করতে” বাধ্য করার ক্ষমতা দেবে। এর ফলে সংবাদকক্ষগুলিকে তাদের গোপন সূত্রের পরিচয় প্রকাশ করতে বাধ্য করা হতে পারে।
ডিএনপিএ-র যুক্তি, এই আশঙ্কা দুর্নীতি, কর্পোরেট অনিয়ম বা নির্বাচনী কারচুপির তথ্য সাংবাদিকদের কাছে পৌঁছে দিতে অনিয়ম ফাঁসকারীদেরও নিরুৎসাহিত করবে।
কোনও সুস্পষ্ট সীমা বা নির্দেশনাহীন এই বিধান বাতিল করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের বক্তব্য, এই ক্ষমতার আওতায় “সাংবাদিক বা তথ্যদাতার কাছে থাকা আইনগতভাবে গোপনীয়তার সুরক্ষাপ্রাপ্ত যোগাযোগও” চলে আসতে পারে।