বাংলাস্ফিয়ার: মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ ঘিরে শুক্রবার ফের উত্তপ্ত হল রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র। কনট প্লেস এবং সংলগ্ন এলাকায় শতাধিক বিক্ষোভকারীকে আটক করে দিল্লি পুলিশ। আটক হন ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে এবং অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বা আইসা-র সভাপতি নেহা বোরা। তাঁদের মুক্তির দাবিতে সরব হয় একাধিক বিরোধী দল। আটক ব্যক্তিদের সংখ্যা প্রায় দেড়শো। প্রশাসনের বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতেই এই ব্যবস্থা।
শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কে ‘লহরা দো তিরঙ্গা’ কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল সিজেপি। জাতীয় পতাকা হাতে সমবেত হয়ে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর পরিকল্পনা ছিল। পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতি সত্ত্বেও আশপাশে বিক্ষোভকারীরা পৌঁছতে থাকেন। সিজেপি সমর্থকদের পাশাপাশি বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের সদস্যেরাও যোগ দেন। পিটিআইয়ের বিবরণ অনুযায়ী, কনট প্লেস ও মান্ডি হাউসে ছোট ছোট জমায়েত থেকে বিক্ষোভ শুরু হয়। জাতীয় পতাকা নাড়িয়ে প্রতিবাদ জানান অংশগ্রহণকারীরা। পুলিশ তাঁদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে কয়েকটি জায়গায় ঠেলাঠেলির পরিস্থিতি তৈরি হয়।
মিছিলের আগেই দিপকেকে আটকানোর প্রস্তুতি নেয় পুলিশ। তিনি যে বাড়িতে ছিলেন, সেখানে গিয়ে নোটিস দেওয়া হয়। পুলিশের বক্তব্য ছিল, অনুমতি ছাড়া প্রস্তাবিত কর্মসূচি করা যাবে না। ব্যবসায়ী, পথচারী এবং সাধারণ মানুষের চলাচলের বিষয়টিও সামনে আনা হয়। পরে বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় দিপকেকে আটক করা হয়। ঘটনাস্থলের কথোপকথনে তাঁকে পুলিশের কাছে জানতে চাইতে শোনা যায়, একা বেরোলে কেন তাঁকে বাধা দেওয়া হচ্ছে। জাতীয় পতাকা হাতে তাঁর বেরোনো এবং পুলিশের গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ে।
পুলিশ অবশ্য জাতীয় পতাকা বহন এবং অনুমতিহীন জমায়েতের মধ্যে পার্থক্য টেনেছে। এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিপকেকে জানানো হয়েছিল, তেরঙ্গা ওড়ানো অপরাধ নয়; কিন্তু নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকা এলাকায় অনুমতি ছাড়া মিছিল করা বা ভিড় জড়ো করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাল্টা দিপকে জানতে চান, তিনি কোন আইন ভেঙেছেন। এই কথোপকথনেই দিনের বিরোধের মূল বিষয়টি স্পষ্ট হয়: আন্দোলনকারীরা পতাকা হাতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার দাবি করছিলেন, আর পুলিশ কর্মসূচির অনুমতি ও জমায়েতের বিধিনিষেধের প্রশ্ন তুলছিল।
সেন্ট্রাল পার্ক ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল কঠোর। পার্কের লোহার রেলিং বরাবর মানবশৃঙ্খল তৈরি করে দাঁড়ান নিরাপত্তাকর্মীরা। বাইরে রাখা হয় কাঁদানে গ্যাসের গাড়ি এবং বজ্রযান। ভিতরে মোতায়েন করা হয় র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স। কনট প্লেসের ভিতরের ও বাইরের বৃত্তাকার রাস্তায় যান নিয়ন্ত্রণের জন্যও পুলিশ ছিল। নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করেন দিল্লির পুলিশ কমিশনার। পুলিশের এক পদস্থ আধিকারিক জানান, পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে এবং জমায়েত সরিয়ে দেওয়াই তাঁদের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য।
নেহা বোরাকে মান্ডি হাউস থেকে আটক করা হয়। অন্যদিকে, সন্ধ্যা ছ’টা নাগাদ ফিরোজ শাহ রোডে এসএফআই ও অন্য বাম ছাত্রসংগঠনগুলি বিক্ষোভ শুরু করে। সেখানে যোগ দেন সিপিএমের রাজ্যসভার সাংসদ জন ব্রিটাস। ওই জমায়েত থেকেও বিক্ষোভকারীরা কনট প্লেসের দিকে এগোন। সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে কেন্দ্রীয় দিল্লিতে মোতায়েন পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। দিপকে ও বোরার মুক্তির দাবি জানায় কংগ্রেস, ডিএমকে, সমাজবাদী পার্টি এবং তৃণমূল কংগ্রেস।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিতর্কের কেন্দ্রে আসে আটক দুই নেতার অবস্থান। সিজেপি অভিযোগ করে, দিপকেকে কোথায় রাখা হয়েছে, তা তাদের জানানো হচ্ছে না এবং তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলে সংগঠনটি। মন্দির মার্গ থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিককে চিঠি দিয়ে দিপকের অবস্থান জানতে চাওয়া হয়। সিজেপির বক্তব্য, জাতীয় পতাকা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোনো একজন নাগরিকের ক্ষেত্রে এমন আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। এগুলি সংগঠনের অভিযোগ; পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁর আটককে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
আইসা-ও প্রথমে নেহার অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ জানায়। পরে সংগঠনটি বলে, প্রায় মধ্যরাতে আর কে পুরম থানায় আইনজীবীরা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পেরেছেন। তাদের অভিযোগ, তার আগে কয়েক ঘণ্টা তাঁকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। নেহা অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও ওষুধ পাওয়া নিয়ে সমস্যা হচ্ছিল বলেও অভিযোগ ওঠে। ফলে মিছিল আটকানোর প্রশ্নের পাশাপাশি পুলিশি হেফাজতে যোগাযোগ, চিকিৎসা এবং আইনজীবীর সহায়তা পাওয়ার বিষয়গুলিও সামনে আসে।
এই কর্মসূচির তাৎক্ষণিক পটভূমিতে ছিল সিজেপির দুই নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কার গ্রেফতার। যন্তর মন্তরে প্রবেশের ঘটনার পরে তাঁদের পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়েছিল। তাঁদের সমর্থনেও শুক্রবারের কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়। বৃহত্তর আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি। এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বার দিপকে আটক হওয়ায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে প্রশাসনের সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে।
তবে শনিবার সকালে পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের কথা জানায় পুলিশ। নেহা বোরাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। দিপকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ধারায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং তাঁকে বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করানো হবে বলে পুলিশ জানায়। ফলে শুক্রবার রাতে দু’জনের মুক্তির দাবিতে যে প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল, শনিবার সকালে তার কেন্দ্রে রয়ে যায় দিপকের হেফাজত এবং তাঁকে আটকে রাখার কারণ। বিরোধীদের প্রশ্ন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের ডাকের মোকাবিলায় এমন ব্যাপক ধরপাকড় কেন প্রয়োজন হল।