বাংলাস্ফিয়ার: ২০২৭ সালের জনগণনায় মিজোরামে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের আলাদা করে গণনা করা হবে। মায়ানমার ও বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষের পাশাপাশি মণিপুরের সংঘর্ষে ঘরছাড়া হয়ে এই রাজ্যে থাকা মানুষদেরও গণনার আওতায় আনা হচ্ছে। সরকারি হিসাবে তাঁদের মোট সংখ্যা ৩৮ হাজার ২১৩। তবে স্থানীয় সংগঠনগুলির দাবি, প্রকৃত সংখ্যা ৬০ হাজারেরও বেশি। এই ব্যবধানের মধ্যে আসন্ন জনগণনা রাজ্যের বাস্তব জনবিন্যাস সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে পারে।
শনিবার, ১০ অক্টোবর, আইজলে জনগণনার প্রস্তুতি নিয়ে রাজ্যস্তরের এক বৈঠকে আশ্রিত মানুষদের গণনায় অন্তর্ভুক্ত করার কথা জানানো হয়। মুখ্যসচিব খিল্লি রাম মীনার সভাপতিত্বে বৈঠকে দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রস্তুতি, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়। এই পর্যায়ে রাজ্যে বসবাসকারী মানুষের ব্যক্তিগত ও জনসংখ্যাগত তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন, জনগণনায় নাম নথিভুক্ত হলেই বিদেশ থেকে আসা কোনও ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন না। আবার ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরের সময় কারও নাম বাদ পড়লেও তাঁকে জনগণনার বাইরে রাখা হবে না। কেউ আধার নম্বর জানাতে না চাইলে তাঁকে তা প্রকাশ করতে বাধ্য করা যাবে না বলেও বৈঠকে জানানো হয়েছে।
এখানে মণিপুর থেকে আসা মানুষদের পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। তাঁরা আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে আসেননি; ভারতের একটি রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছেন। তাই তাঁদের দেশের অভ্যন্তরে বাস্তুচ্যুত মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। মায়ানমার ও বাংলাদেশ থেকে আসা শরণার্থীদের সঙ্গে তাঁদের একসঙ্গে উল্লেখ করা হলেও এই দুই ধরনের বাস্তুচ্যুতি এক নয়।
মিজোরামের আশ্রিত জনগোষ্ঠীর বড় অংশ এসেছে মায়ানমার থেকে। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সে দেশে সামরিক অভ্যুত্থানের পরে সংঘর্ষ ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে বহু মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় নেন। তাঁদের অনেকেই চিন জনগোষ্ঠীর। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে আসা মানুষদের মধ্যে রয়েছেন বম জনগোষ্ঠীর সদস্যরা। ২০২২ সালে সেখানে একটি জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের পরে তাঁদের মিজোরামে আসা শুরু হয়।
মায়ানমারের চিন এবং বাংলাদেশের বম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিজোদের ঘনিষ্ঠ জাতিগত সম্পর্ক রয়েছে। সেই সামাজিক সম্পর্ক এই অঞ্চলের আশ্রয় পরিস্থিতির একটি উল্লেখযোগ্য পটভূমি। সংঘর্ষের কারণে বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হওয়া মানুষদের উপস্থিতি বুঝতে তাই কেবল সীমান্তের হিসাব যথেষ্ট নয়; তাঁদের আগমনের কারণ ও সামাজিক যোগাযোগও প্রাসঙ্গিক।
রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কে সাপডাঙ্গার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে আসা বমদের বায়োমেট্রিক নথিভুক্তিকরণ সম্পূর্ণ হয়েছে। মায়ানমার থেকে আসা চিনদের ক্ষেত্রে কাজ শেষ হয়েছে ৯৮.৯ শতাংশ। অগস্টে বিধানসভায় দেওয়া তথ্যে তিনি জানিয়েছিলেন, ২০ অগস্ট পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র দপ্তরের হিসাবে রাজ্যে মায়ানমারের ২৯ হাজার ৫৭৫ জন আশ্রিত ছিলেন। তবে বায়োমেট্রিক নথিভুক্তিকরণ ও জনগণনা পৃথক প্রক্রিয়া; একটির অগ্রগতিকে অন্যটির চূড়ান্ত ফল বলে ধরা যায় না। তথ্য সংগ্রহে কাউকে বাদ না দেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
জনগণনার দ্বিতীয় পর্যায়ের জন্য কেন্দ্র মিজোরামকে ১৯ কোটি ১৯ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করেছে। মাস্টার ট্রেনার, মাঠপর্যায়ের প্রশিক্ষক, গণনাকারী এবং তত্ত্বাবধায়কদের প্রশিক্ষণ নভেম্বরের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রত্যেক গণনাকারীর দায়িত্বে আনুমানিক ৮০০ জনের তথ্য সংগ্রহ থাকবে। রাজ্যে বসবাসকারী ১৬টি তফসিলি জাতির জনগোষ্ঠীকেও গণনার আওতায় আনা হবে।
মুখ্যসচিব নির্ভুল ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহের উপর জোর দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, সরকারি নীতি নির্ধারণ এবং উন্নয়নের পরিকল্পনায় এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার পাশাপাশি দেশের অন্য রাজ্যগুলির আগে জনগণনা সম্পূর্ণ করার লক্ষ্যও নিয়েছে মিজোরাম। তবে দ্রুততার সঙ্গে তথ্যের যথার্থতা বজায় রাখাই এই উদ্যোগের মূল চ্যালেঞ্জ। আশ্রিত মানুষদের সংখ্যা নিয়ে সরকারি হিসাব ও স্থানীয় সংগঠনগুলির অনুমানের ফারাক মেটাতে গণনার ফল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হবে।