বাংলাস্ফিয়ার: চিনে তৈরি পণ্য তৃতীয় কোনও দেশের মাধ্যমে আমেরিকায় পাঠিয়ে শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগে ভারতের নাম তুলল ওয়াশিংটন। আমেরিকার একটি নতুন প্রতিবেদনে ভারত-সহ ৪০টিরও বেশি দেশকে চিনা পণ্যের কথিত ‘ছায়া পুনঃরপ্তানি নেটওয়ার্ক’-এর অংশ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। অভিযোগ, সামান্য প্রক্রিয়াকরণ, নতুন মোড়ক কিংবা কাগজপত্রে পণ্যের উৎস বদলে চিনা সামগ্রী এই দেশগুলির মাধ্যমে আমেরিকার বাজারে প্রবেশ করছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পথে বছরে অন্তত ৪ হাজার কোটি ডলার থেকে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার ৩০০ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য আমেরিকায় ঢুকতে পারে। হিসাবের পদ্ধতি আলাদা হওয়ায় সম্ভাব্য অঙ্কটির মধ্যে এত বড় ব্যবধান রয়েছে। তবে মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য, প্রকৃত অঙ্ক যা-ই হোক, এই বাণিজ্যপথ আমেরিকার শুল্কনীতি এবং দেশীয় উৎপাদন—দুইয়ের পক্ষেই বড় চ্যালেঞ্জ।

আমেরিকার বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারো এই ব্যবস্থাকে ‘চায়নাজ শ্যাডো ট্রান্সশিপমেন্ট নেটওয়ার্ক’ বা চিনের ছায়া পুনঃরপ্তানি নেটওয়ার্ক বলে বর্ণনা করেছেন। সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের উদ্ধৃত বক্তব্যে তাঁর অভিযোগ, এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে চিন ৪০টিরও বেশি দেশের মাধ্যমে নিজের রপ্তানি পণ্যের পরিচয় কার্যত ‘ধুয়ে-মুছে’ ফেলছে।

তালিকায় শুধু ছোট কিংবা দুর্বল শুল্ক-ব্যবস্থার দেশ নেই। আমেরিকার বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদারদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ভারত ছাড়াও মেক্সিকো, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশ, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার নাম রয়েছে। ফলে এটি কেবল চিনের বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ নয়; আমেরিকার মিত্র ও অংশীদার দেশগুলির সঙ্গেও বাণিজ্যিক টানাপড়েন বাড়াতে পারে।

প্রতিবেদনের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রথমে চিন থেকে কোনও পণ্য তৃতীয় একটি দেশে পাঠানো হয়। সেখানে তার সামান্য প্রক্রিয়াকরণ, পুনরায় মোড়কবন্দি, নতুন নামাঙ্কন কিংবা নতুন চালানপত্র তৈরি করা হয়। কখনও পণ্যের যাত্রাপথ বদলে দেওয়া হয়, আবার কখনও নতুন দামে চালান তৈরি করা হয়। এর ফলে কাগজে-কলমে মনে হয় পণ্যটি ওই তৃতীয় দেশেই তৈরি। অথচ তার উপাদান, প্রযুক্তি কিংবা উৎপাদনের প্রধান অংশ চিনেরই থেকে যায়।

চিনা উৎপাদক ও বাণিজ্যিক সংস্থাগুলি সাধারণত এমন দেশ বা অঞ্চল বেছে নেয়, যেখানে শ্রমের খরচ কম, শুল্ক দফতরের নজরদারি তুলনামূলক শিথিল, মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল রয়েছে অথবা আমেরিকার বাজারে প্রবেশের সুবিধাজনক ব্যবস্থা আছে। তবে কোনও দেশে চিনা যন্ত্রাংশ এনে তা দিয়ে প্রকৃত উৎপাদন করা আর শুধু শুল্ক এড়াতে পণ্যের পরিচয় বদলে দেওয়া এক বিষয় নয়। এই দুইয়ের সীমারেখা নির্ধারণ করাই মার্কিন প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় সমস্যা।

ভারতের ক্ষেত্রে প্রতিবেদনে পুণে–গুজরাত–চেন্নাই উৎপাদন বলয়ের কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। দাবি করা হয়েছে, এই অঞ্চলে চিন থেকে আসা পাম্প ও কম্প্রেসর গ্রহণ করা হচ্ছে। মার্কিন প্রতিবেদনের ব্যাখ্যা, এই পণ্যগুলি আমেরিকার সিনসিনাটি, ডেটন ও কলম্বাসের মতো শিল্পাঞ্চলের সরবরাহ ব্যবস্থা এবং স্থানীয় উৎপাদকদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। যদিও ভারতীয় সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ভাবে আইনভঙ্গের কোনও প্রমাণ এই বিবরণে প্রকাশ করা হয়নি।

এই ধরনের পণ্য শনাক্ত করতে আমেরিকা ‘ডিটেকটিভ বর্ডার’ নামে কৃত্রিম মেধানির্ভর একটি ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা করেছে। এটি পণ্যের চালানপত্র, যাত্রাপথের ইতিহাস, পণ্যশ্রেণি, সংশ্লিষ্ট সংস্থার মালিকানা, সংশ্লিষ্ট দেশের উৎপাদনক্ষমতা এবং অস্বাভাবিক বাণিজ্যিক প্রবণতা বিশ্লেষণ করবে। কম্পিউটার-দৃষ্টিশক্তির সাহায্যে পণ্যের ছবি, মোড়ক এবং পরিচিতিচিহ্নও পরীক্ষা করা হতে পারে।

ওয়াশিংটনের দাবি, ব্যবস্থাটির উদ্দেশ্য বৈধ বিদেশি বিনিয়োগ ও নিকটবর্তী দেশে প্রকৃত উৎপাদনের সঙ্গে বেআইনি ‘পাশ কাটানো বাণিজ্য’-এর পার্থক্য করা। কোনও চালান সন্দেহজনক বলে চিহ্নিত হলে মার্কিন শুল্ক ও সীমান্ত সুরক্ষা দফতর অতিরিক্ত শুল্ক আদায়, জরিমানা অথবা সংশ্লিষ্ট পণ্যের প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে পারবে।

এই প্রতিবেদনের ফলে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের উপর নথিপত্র এবং পণ্যের প্রকৃত উৎস প্রমাণের চাপ বাড়তে পারে। বিশেষত যে সব শিল্প চিনা যন্ত্রাংশ বা কাঁচামালের উপর নির্ভরশীল, তাদের আমেরিকায় রপ্তানির ক্ষেত্রে আরও কঠোর পরীক্ষার মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে তালিকায় কোনও দেশের নাম থাকা মানেই সেই দেশের সরকার বা সব রপ্তানিকারক শুল্ক ফাঁকিতে যুক্ত—এমন নয়। শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট চালান, উৎপাদনের পরিমাণ এবং পণ্যের প্রকৃত মূল্য সংযোজনের ভিত্তিতেই অভিযোগ প্রমাণ করতে হবে।