একজনকে দেখে ভয় পায় গোটা শহর, অন্যজনের পৃথিবী এখনও স্কুলের বেঞ্চে আটকে। দু’জনের পথ এক হওয়ার কথা নয়। অথচ ঘটনাচক্রে সেই অসম্ভব জুটিই তৈরি করে ফেলে এক অদ্ভুত বন্ধুত্ব। এই সম্পর্ককে কেন্দ্র করেই পরিচালক বালাজি থরণীথরনের নতুন ছবি ‘বাথ্থা’—যেখানে ডনের দাপটের আড়ালে খুঁজে দেখা হয় মানুষের কোমলতা, শৈশবের সরলতা এবং পরিচয়ের নানা স্তর।
হাসি আছে, আবেগও আছে। কিন্তু ‘বাথ্থা’ শুধু এক দুর্ধর্ষ ডন আর এক স্কুলপড়ুয়ার অস্বাভাবিক বন্ধুত্বের মজার গল্পে আটকে থাকে না। বরং সেই সম্পর্কের ভিতর দিয়ে ছবিটি প্রশ্ন তোলে—সমাজ একজন মানুষকে যে পরিচয় দেয়, তার আড়ালে কি অন্য আর একটি মানুষ লুকিয়ে থাকে?
অসম জুটি
গল্পের কেন্দ্রে দু’জন সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর মানুষ। একজনের নাম শুনলেই আতঙ্ক, অন্যজন এখনও শৈশবের দোরগোড়ায়। ঘটনাচক্রে স্কুলপড়ুয়া ছেলেটি ঢুকে পড়ে ডনের জগতে। আর সেখান থেকেই শুরু হয় এমন এক সম্পর্ক, যার মধ্যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে অপ্রত্যাশিত মায়া।
ডনের ভয়ংকর ভাবমূর্তি আর ছেলেটির নিষ্পাপ দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত থেকেই জন্ম নেয় ছবির বেশ কিছু হাসির মুহূর্ত। কিন্তু সেই হাসির আড়ালেই ধীরে ধীরে তৈরি হয় দু’জনের আবেগের যোগসূত্র।
ডনেরও মন আছে
‘বাথ্থা’র সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা সম্ভবত এখানেই। ছবিতে ডনকে শুধুই ভয়ংকর অপরাধী চরিত্র হিসেবে দেখা হয়নি। আবার স্কুলপড়ুয়াটিকেও নিছক সরলতার প্রতীক বানানো হয়নি।
দু’জনের সম্পর্ক যত এগোয়, ততই স্পষ্ট হয়—মানুষকে একটি পরিচয় দিয়ে পুরোপুরি বোঝা যায় না। হিংসা, ভয় কিংবা ক্ষমতার সঙ্গে যে মানুষটিকে সবাই চেনে, তার মধ্যেও হয়তো থেকে যেতে পারে এমন এক কোমল অংশ, যা অন্য কারও সামনে প্রকাশের সুযোগ পায়নি।
শৈশবের চোখে
ছেলেটির চোখ দিয়ে ডনের জগতকে দেখা ছবিটিকে অন্য মাত্রা দেয়। যে বিষয় একজন প্রাপ্তবয়স্কের কাছে ভয়ংকর, শিশুর চোখে সেটিই কখনও হয়ে ওঠে কৌতূহলের বিষয়, কখনও আবার নিছক অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা।
এই দৃষ্টিভঙ্গিই ছবির স্মৃতিমেদুর সুর তৈরি করে। ‘বাথ্থা’ যেন মনে করিয়ে দেয় সেই শৈশবকে, যখন বন্ধুত্বের জন্য সামাজিক পরিচয়, বয়স কিংবা পরিস্থিতির হিসাব এতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।
পরিচয়ের ফাঁদ
তবে ছবির প্রশ্ন শুধু বন্ধুত্বে থেমে নেই। পরিবার, সমাজ এবং পরিস্থিতি একজন মানুষকে নির্দিষ্ট কিছু ভূমিকা পালন করতে শেখায়। কেউ হয়ে ওঠে ‘ভয়ংকর লোক’, কেউ ‘ভালো ছেলে’, কেউ ‘দায়িত্বশীল মানুষ’। সেই ভূমিকাগুলি পালন করতে করতে নিজের অন্য সত্তাগুলিকে মানুষ কতটা আড়াল করে ফেলে—সেই প্রশ্নও উঁকি দেয় গল্পে।
থরণীথরন তাই ডনের গল্পকে ‘খারাপ মানুষ ভালো হয়ে গেল’ ধরনের সরল পথে নিয়ে যান না। বরং জানতে চান, সমাজ যে মুখটি দেখতে অভ্যস্ত, তার আড়ালে মানুষটির নিজের মুখটি কোথায়?
হাসির আড়ালে
‘বাথ্থা’র শক্তি তার ভারসাম্যে। এক মুহূর্তে যে দৃশ্য হাসায়, পরের মুহূর্তেই সেটি চরিত্র দু’টির সম্পর্কের অন্য একটি দিক খুলে দিতে পারে। কৌতুক আর আবেগ একে অন্যকে সরিয়ে দেয় না; বরং পাশাপাশি এগোয়।
এই কারণেই ছবির কেন্দ্রীয় বন্ধুত্বকে বিদ্রূপের চোখে না দেখে মমতার সঙ্গে দেখেন পরিচালক। ডন যেমন শুধু আতঙ্কের প্রতীক নন, তেমনই স্কুলপড়ুয়াও কেবল হাসির উপকরণ নয়।
ভালোত্বটা বেঁচে থাকে
থরণীথরনের গল্প বলার ধরনে সাধারণ মানুষ, ব্যক্তিগত স্মৃতি এবং দৈনন্দিন জীবনের সূক্ষ্ম আবেগ বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। ‘বাথ্থা’তেও সেই প্রবণতা বজায় রয়েছে। পরিচিত একটি কাঠামো—ডন এবং শিশুর অপ্রত্যাশিত বন্ধুত্ব—নিয়ে শুরু হলেও ছবির আসল আগ্রহ চরিত্র দু’টির অন্তর্জগতে।
শেষ পর্যন্ত ‘বাথ্থা’ তাই শুধুই দু’জন অসম্ভব মানুষের বন্ধুত্বের গল্প নয়। এটি সেই মানুষটির খোঁজ, যাকে আমরা সামাজিক পরিচয়ের আড়ালে হারিয়ে ফেলি। আর সেই খোঁজে শৈশবের নিষ্পাপ চোখ হয়ে ওঠে সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত আয়না।