হাইলাইটস:

  • অভিযুক্তদের লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া, গণপিটুনি ও জনসমক্ষে অপমান বন্ধে রাজ্যজুড়ে নির্দেশিকা জারির নির্দেশ।
  • কলকাতা হাই কোর্ট বলেছে, সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক অভিযুক্তই মর্যাদা, নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষার অধিকারী।
  • ডিরেক্টর জেনারেল অব পুলিশকে অবিলম্বে সমস্ত থানায় নির্দেশ পাঠাতে বলা হয়েছে।
  • আদালতের পর্যবেক্ষণ, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার সাধারণ মানুষের নেই।
  • ২০ জুলাইয়ের মধ্যে রাজ্যকে হলফনামা দিয়ে জানাতে হবে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাস্ফিয়ার: কলকাতা হাই কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিল, অভিযুক্ত মানেই তিনি জনরোষের শিকার হবেন—এমন ধারণার কোনও স্থান আইনের শাসনে নেই। কোনও ব্যক্তি অপরাধে অভিযুক্ত হলেই তাঁকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া, গণপিটুনি, জনসমক্ষে অপমান বা হেনস্তা করা সংবিধানসম্মত নয়। এই ধরনের প্রবণতা রুখতে রাজ্যের ডিরেক্টর জেনারেল অব পুলিশকে (ডিজিপি) অবিলম্বে রাজ্যজুড়ে একটি অভিন্ন নির্দেশিকা জারি করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চ এক জনস্বার্থ মামলার শুনানিতে এই নির্দেশ দেয়। আদালত পর্যবেক্ষণ করে, অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি আইনের চোখে নির্দোষ। তাই তাঁর মানবিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষা করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।

এই জনস্বার্থ মামলাটি দায়ের করেছিলেন মহম্মদ দানিশ ফারুকি। তাঁর অভিযোগ, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী এবং সমর্থকদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে জনসমক্ষে হামলা, অপমান, ডিম নিক্ষেপ, এমনকি গণপিটুনির মতো ঘটনা ঘটছে। বহু অভিযোগ দায়ের করা হলেও পুলিশ যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

আবেদনকারীর পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতে বলেন, শুধু রাজনৈতিক কর্মী নন, সাধারণ নাগরিকের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটছে। অভিযুক্তদের কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যাওয়া, অর্ধপ্যান্ট ও চটি পরিয়ে জনসমক্ষে হাঁটানো, জনতার হাতে অপমানিত হতে দেওয়া—এসব আচরণ সংবিধানের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। তিনি আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন সুপ্রিম কোর্টের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রায়ের দিকে, যেখানে মানবিক মর্যাদা ও আইনের শাসনের প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।

রাজ্যের পক্ষে অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজদীপ মজুমদার আদালতকে জানান, যেখানে নির্দিষ্ট অভিযোগ এসেছে সেখানে ইতিমধ্যেই এফআইআর দায়ের হয়েছে এবং অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথি আদালতের সামনে পেশ করার জন্য তিনি কিছু সময় চান।

উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর হাই কোর্ট জানায়, আবেদনকারীর অভিযোগকে হালকাভাবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আদালত মন্তব্য করে, এই ধরনের অভিযোগকে প্রতিদিনের সাধারণ ঘটনা বলে চাপা দেওয়া চলবে না। বরং বিষয়টিকে সংবিধানের মৌলিক অধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে হবে। আদালতের মতে, কোনও মানুষকে অমানবিক আচরণের শিকার করা হলে সংবিধানের ১৪, ১৯ এবং ২১ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত সমতা, স্বাধীনতা ও জীবনের অধিকারের প্রশ্ন সামনে আসে।

আদালত আরও বলে, মর্যাদা ও নিরাপত্তা কোনও সরকারি অনুগ্রহ নয়, এগুলি প্রত্যেক মানুষের জন্মগত অধিকার। ব্যক্তি ধনী না দরিদ্র, ক্ষমতাবান না সাধারণ নাগরিক, এমনকি তিনি কোনও অপরাধে অভিযুক্ত হলেও তাঁর এই অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকে।

ডিভিশন বেঞ্চ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার কোনও অধিকার নেই। আদালতের পর্যবেক্ষণ, অভিযুক্তদের লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া, তাঁদের প্রতারক বলে জনসমক্ষে অপদস্থ করা কিংবা জনতার বিচারের পরিবেশ তৈরি করা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করা এবং অভিযুক্তদের যথাযথ নিরাপত্তা দেওয়া সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এই কারণেই আদালত ডিজিপিকে নির্দেশ দিয়েছে, অবিলম্বে রাজ্যের সমস্ত থানায় একটি বিস্তারিত নির্দেশিকা পাঠাতে হবে। সেই নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে যে, কোনও অভিযুক্তকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া, গণপিটুনি, জনতার হামলা বা অন্য কোনও ধরনের অপমানজনক আচরণ যাতে না ঘটে, তার জন্য পুলিশকে সক্রিয় ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু নির্দেশ জারি করলেই চলবে না, সমস্ত পুলিশ আধিকারিককে তা কঠোরভাবে পালন করতেও হবে।

আদালত আরও বলেছে, পুলিশকে সর্বক্ষণ সতর্ক নজরদারি রাখতে হবে। কোথাও এ ধরনের ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং আইনভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ করতে হবে।

একই সঙ্গে ডিজিপিকে পরবর্তী শুনানির দিন একটি বিস্তারিত হলফনামা জমা দিতে বলা হয়েছে। সেখানে আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তার পূর্ণ বিবরণ দিতে হবে। এছাড়া রাজ্য সরকারকেও দুই সপ্তাহের মধ্যে পৃথক হলফনামা দাখিল করতে হবে। সেখানে জনস্বার্থ মামলায় উত্থাপিত প্রতিটি অভিযোগের জবাব দেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলিতে কতগুলি মামলা দায়ের হয়েছে, তার তালিকাও আদালতে পেশ করতে হবে।

মামলার পরবর্তী শুনানি হবে আগামী ২০ জুলাই।

এই নির্দেশের তাৎপর্য শুধু একটি রাজনৈতিক দল বা নির্দিষ্ট কয়েকটি ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হাই কোর্ট কার্যত পুনর্ব্যক্ত করল, ভারতে বিচার করার একমাত্র অধিকার আদালতের। কোনও ব্যক্তি অভিযুক্ত হলেই তাঁকে জনসমক্ষে অপমান, হেনস্তা বা আক্রমণের মুখে ঠেলে দেওয়া আইনের শাসনের পরিপন্থী। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি গণতন্ত্রকে দুর্বল করে এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা নষ্ট করে। তাই অভিযুক্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন পুলিশের কর্তব্য, তেমনই বিচার শেষ হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে শাস্তি দেওয়ার অধিকার কারও নেই—এই মৌলিক নীতিকেই আবারও জোরালোভাবে সামনে আনল কলকাতা হাই কোর্ট।