Home খবর রুশ কারাগার থেকে ইউরোপের মঞ্চে: পুতিনবিরোধী তরুণ গায়িকার স্বাধীনতার গান

রুশ কারাগার থেকে ইউরোপের মঞ্চে: পুতিনবিরোধী তরুণ গায়িকার স্বাধীনতার গান

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
6 views 8 minutes read
A+A-
Reset

প্রথম কিস্তি

১৯ বছরের ডায়ানা লগিনোভার কাছে সেটি ছিল স্বাধীনতার প্রথম চুম্বন। ১২ জুন ওয়ারশতে ক্রেমলিনবিরোধী রুশ শিল্পীদের সংগীত উৎসব ‘আউটলাউড’-এ গান গেয়ে মঞ্চ থেকে নামার পর পর্দার আড়ালে তিনি জড়িয়ে ধরেছিলেন তাঁর গিটারবাদক ও বাগ্‌দত্ত আলেকজান্ডার অরলভকে। মাত্র সাত মাস আগে পর্যন্ত এই দু’জন ছিলেন সেন্ট পিটার্সবার্গে। সেখানকার রাস্তায় হঠাৎ হঠাৎ অনুষ্ঠান করে সরকারবিরোধী গান গাওয়ার অপরাধে তাঁরা কারাগারে বন্দি ছিলেন।

ডায়ানা এবং অরলভ সেই তরুণ প্রজন্মের মুখ, যাদের অনেকেই আজকের রাশিয়াকে ‘অন্য রাশিয়া’ বলে চিহ্নিত করেন—যে রাশিয়া ক্রেমলিন এবং ইউক্রেন যুদ্ধের বিরোধী। রাস্তায় তাঁদের গান শুনতে ছোট ছোট ভিড় জমত। পুতিনের জন্মশহরে এই ধরনের সমাবেশ প্রশাসনের চোখে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তার করে। আলাদা করে জেরা করা হয়। নানা চাপ সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু তাঁরা নতি স্বীকার করেননি।

“আমি ওদের জন্য গর্বিত,” বলছিলেন ৪১ বছর বয়সি ইভান আলেক্সেয়েভ, যিনি ‘নোইজ এমসি’ নামে পরিচিত এবং রাশিয়ার পুতিনবিরোধী বিকল্প রক সংগীতের অন্যতম প্রধান মুখ। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনের পর যাঁরা নির্বাসনে যেতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁদের অনেকেই ২০২৫ সালের নভেম্বরে ডায়ানা ও অরলভকে কারাগার থেকে বের করে আনার আন্তর্জাতিক প্রচারে যোগ দেন। ওয়ারশর মঞ্চে সেই নোইজ এমসির সঙ্গেই গান গাইলেন ডায়ানা।

নোইজ এমসির কথায়, “আমাদের গান, আমাদের কথা—সবই ক্রেমলিন ও তার প্রচারযন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের এক একটি অস্ত্র।” তাঁর গান রাশিয়ায় নিষিদ্ধ। এমনকি সেই গান শোনা বা বাজানোও অনেক সময় রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড হিসেবে গণ্য হতে পারে।

৭২ বছর বয়সি কিংবদন্তি রকশিল্পী আন্দ্রেই মাকারেভিচও ছিলেন উৎসবে। সোভিয়েত যুগ থেকেই তিনি ভিন্নমতের শিল্পী হিসেবে পরিচিত। ২০২২ সালে দেশ ছেড়ে ইজরায়েলে চলে যান। তাঁর দীর্ঘশ্বাস, “ইতিহাস রাশিয়ায় বারবার ফিরে আসে। সবকিছু আবার ঘটছে।”

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ষাটের দশকে তাঁর ব্যান্ড ‘মাশিনা ভ্রেমেনি’ (সময়যন্ত্র)-এর প্রথম দিকের গোপন অনুষ্ঠানও পুলিশ ভেঙে দিত। “ছয় দশক পরে আমি খুব ভালো বুঝতে পারি ডায়ানা কী অনুভব করছে। সংগীত মানুষকে আশা দেয়, কিন্তু সেই আশাও কখনও কখনও সাময়িক,” বলেন তিনি।

প্রায় আট হাজার দর্শকে ভরা সেই উৎসবে—যাঁদের মধ্যে ছিলেন রুশ, ইউক্রেনীয়, বেলারুশীয় এবং পোলিশ নাগরিক—মাকারেভিচ গাইলেন তাঁর কিংবদন্তি গান ‘পোভোরত’ (মোড় পরিবর্তন)। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জনপ্রিয় এই গানের সঙ্গে গলা মেলাল গোটা মাঠ। দর্শকদের প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে আবেগে ভেসে যাচ্ছিলেন ডায়ানা লগিনোভাও।

এর কিছুক্ষণ আগেই তিনি নোইজ এমসির সঙ্গে গেয়েছিলেন তাঁর জনপ্রিয় গান ‘স্বেতলায়া পলোসা’ (আলো ফিরবেই)। সেন্ট পিটার্সবার্গের প্রতিটি পথ-অনুষ্ঠানেই ডায়ানা এই গান গাইতেন। প্রতিবাদী তরুণদের কাছে গানটির কথা আজ প্রায় মুখস্থ—

“আমরা এই সময়টাও পার করে যাব। এখনও আশার আলো নিভে যায়নি। এই মেরুপ্রদেশের তুষারের মতো ঘন অন্ধকারের মধ্যেও ছাই ভেদ করে নতুন অঙ্কুর আকাশের দিকে মাথা তুলবে।”

গানের কথায় কোথাও সরাসরি রাজনীতির উল্লেখ নেই। কিন্তু তার ইঙ্গিত সবাই বুঝতে পারে।

আমরা সবাই একদিন রাশিয়ায় ফিরতে চাই। আবার দিদিমাদের দেখতে চাই। স্বাভাবিক, স্বাধীন একটা জীবন চাই।” শান্ত গলায় কথাগুলো বলছিলেন ডায়ানা লগিনোভা। নির্বাসনের জীবন তাঁর কাছে কোনও রোমাঞ্চ নয়; বরং বাধ্য হয়ে বেছে নেওয়া এক কঠিন পথ।

সংগীতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক খুব ছোটবেলা থেকেই। মাত্র ১৩ বছর বয়সে নিজের গান লেখা শুরু করেন। পরে ভর্তি হন রাশিয়ার অন্যতম সেরা সংগীত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রিমস্কি-করসাকভ কনজারভেটরিতে। পিয়ানোয় অসাধারণ দক্ষতার জন্য ছোটবেলায় একাধিক পুরস্কারও জিতেছিলেন। কিন্তু ধ্রুপদি সংগীতের বাঁধা ছকে নিজেকে খুঁজে পাননি।

“খুব তাড়াতাড়িই বুঝেছিলাম, এটাই আমার পথ নয়। আমি গান গাইতে চাই, নিজের কথা বলতে চাই,” স্মৃতিচারণ করেন তিনি।

বন্ধুদের নিয়ে প্রথম একটি ছোট দল গড়েছিলেন। পরে ২০২৫ সালের আগস্টে আলেকজান্ডার অরলভকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন নতুন ব্যান্ড ‘স্টপটাইম’। সংগীতের ভাষায় ‘স্টপটাইম’ এমন একটি কৌশল, যেখানে ছন্দ হঠাৎ থেমে গিয়ে নতুন তীব্রতায় ফিরে আসে। তাঁদের কাছে এই নামও ছিল এক প্রতীক—একটি সমাজকে থামিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করার প্রতীক।

ডায়ানা বাজাতেন কী-বোর্ড, অরলভ গিটার। সেন্ট পিটার্সবার্গের রাস্তা, চত্বর কিংবা ব্যস্ত মোড়েই শুরু হতো তাঁদের অনুষ্ঠান। তাঁরা গাইতেন নির্বাসিত রুশ শিল্পীদের গান। নোইজ এমসির প্রতিবাদী সুর, মনেতোচকার যুদ্ধবিরোধী গান, আবার পাঙ্ক ব্যান্ড পর্নোফিলমি-র সেই বিখ্যাত গানও, যেখানে পুতিনকে ব্যঙ্গ করে তাঁকে আদর করে ডাকা নাম ‘ভলোদিয়া’ ব্যবহার করা হয়েছে।

মনেতোচকার ‘তুমি একজন সৈনিক’ গানটি বিশেষ জনপ্রিয় ছিল। ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানো সাধারণ রুশ সেনাদের উদ্দেশে লেখা এই গানে যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা, ক্ষত আর মানবিক বেদনার কথা বলা হয়েছে। ডায়ানার কণ্ঠে সেই গান শুনতে শত শত মানুষ রাস্তায় ভিড় করতেন।

সামাজিক মাধ্যমে তাঁদের পরিবেশনার ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। লাখ লাখ মানুষ তা দেখতে শুরু করেন। জনপ্রিয়তা যত বাড়ছিল, প্রশাসনের নজরও ততই কঠোর হচ্ছিল।

মনেতোচকা, যার আসল নাম ইয়েলিজাভেতা গিরদিমোভা, ওয়ারশর উৎসবে দাঁড়িয়ে বলেন, “প্রথম ভিডিও, প্রথম সুর শুনেই ডায়ানার কণ্ঠ আমাকে মুগ্ধ করেছিল। পরে যখন দেখলাম সে আমার ‘তুমি একজন সৈনিক’ গানটি সেন্ট পিটার্সবার্গের রাস্তায় গাইছে, তখন আমি একই সঙ্গে গর্বিত এবং আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। নির্বাসনে থাকা আমাদের সঙ্গে রাশিয়ার ভেতরে লড়ে যাওয়া মানুষগুলোর একটা অদৃশ্য বন্ধন আছে। কিন্তু আমি জানতাম, ও কী ভয়ঙ্কর ঝুঁকি নিচ্ছে।”

পর্নোফিলমির প্রধান কণ্ঠশিল্পী ভ্লাদিমির কটলিয়ারভের বক্তব্যও একই রকম। তাঁর কথায়, “সেন্ট পিটার্সবার্গের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমাদের গান গাইতে অসীম সাহস লাগে। আজকের রাশিয়ায় একটি ভুল শব্দ বললেও, অথবা সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্ট লিখলেও মানুষ কারাগারে চলে যাচ্ছে।”

মানবাধিকার সংগঠনগুলির হিসাব অনুযায়ী, গত চার বছরে রাশিয়ায় রাজনৈতিক বন্দির সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়ে গেছে। কিছু সংগঠনের মতে, প্রকৃত সংখ্যা চার হাজার ছয়শোরও বেশি। বিরোধী মত, যুদ্ধবিরোধী অবস্থান কিংবা সরকারের সমালোচনাই আজ অনেকের কারাবাসের কারণ।

এই বাস্তবতার মধ্যেই ডায়ানা এবং আলেকজান্ডার গান গেয়ে চলেছিলেন। তাঁরা জানতেন, প্রতিটি অনুষ্ঠান হয়তো তাঁদের স্বাধীনতার শেষ দিন হতে পারে। তবু তাঁরা থামেননি।


 

ইউরোপের মঞ্চে উঠে নোইজ এমসি, মনেতোচকা কিংবা ভ্লাদিমির কটলিয়ারভরা নির্দ্বিধায় স্লোগান দেন—“নিয়েত ভইনে!”, অর্থাৎ “যুদ্ধ নয়”। কিন্তু রাশিয়ার ভেতরে একই কথা বলা কতটা বিপজ্জনক, তা নিজের জীবনে টের পেয়েছেন ডায়ানা লগিনোভা ও আলেকজান্ডার অরলভ।

২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর সেন্ট পিটার্সবার্গে তাঁদের প্রথম গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ ছিল, তাঁরা নাকি জনশৃঙ্খলা নষ্ট করেছেন। আদালত তুলনামূলক হালকা প্রশাসনিক সাজা দেয়। কিন্তু সেই প্রথম গ্রেপ্তারই তাঁদের জীবনের এক আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে থাকে। পুলিশ ভ্যানে বসেই দু’জনে বাগদান সেরে ফেলেন। কাগজ কেটে বানানো দুটি আংটি পরিয়ে একে অপরকে জীবনসঙ্গী হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

কিন্তু সেই সুখের মুহূর্ত দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

মুক্তি পাওয়ার মাত্র তেরো দিন পর আবার গ্রেপ্তার করা হয় তাঁদের। দ্বিতীয় দফার সাজা শেষ হওয়ার মুখে আবার নতুন অভিযোগ। তারপর আবার। একই কৌশল বারবার প্রয়োগ করা হয়।

রাশিয়ায় এই পদ্ধতির একটি পরিচিত নাম আছে—‘ক্যারোসেল’। একটি মামলার সাজা শেষ হওয়ার আগেই নতুন অভিযোগ এনে বন্দিকে আবার আটক করা হয়। এভাবে মাসের পর মাস, কখনও বছরের পর বছর কাউকে কারাগারে আটকে রাখা হয়, যাতে তদন্তকারীরা বড় ফৌজদারি মামলা তৈরির সময় পেয়ে যান।

ডায়ানার ভাষায়, “কারাগারে আমাকে বলা হয়েছিল, আমার বিরুদ্ধে সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। ইতিমধ্যেই ছয়টি অভিযোগপত্র তৈরি ছিল। তদন্তকারীরা সব নথিও প্রস্তুত রেখেছিল।”

শুধু আইনের ভয় দেখিয়েই থামেনি প্রশাসন। শুরু হয় মানসিক চাপ ও দর-কষাকষি।

তাঁকে বলা হয়, যদি তিনি প্রকাশ্যে নিজের ভুল স্বীকার করেন, সংবাদ সম্মেলনে ক্ষমা চান এবং ভবিষ্যতে মঞ্চে উঠে সরকারের বিরুদ্ধে আর কোনও গান না গাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, তাহলে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হতে পারে।

ডায়ানা বলেন, “আমি সঙ্গে সঙ্গে না বলিনি, আবার হ্যাঁ-ও বলিনি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি জানতাম, আমি কখনও এটা করতে পারব না। ওটা করলে নিজের বিশ্বাস, নিজের মূল্যবোধ—সবকিছুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হতো।”

এই সময়েই সামনে আসেন তাঁর মা ইরিনা লগিনোভা।

বাইরের দুনিয়ায় তিনি এমন অভিনয় শুরু করেন যেন মেয়েকে ‘সঠিক পথে’ ফিরিয়ে আনতে তিনি রাজি। কর্তৃপক্ষের কাছে তিনি আশ্বাস দেন, ডায়ানা অনুতপ্ত। মুক্তি পেলেই সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে ক্ষমা চাইবে। এমনকি এক সরকারপন্থী সাংসদকে সেই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজনের দায়িত্বও দেওয়া হয়।

কিন্তু সবটাই ছিল নিখুঁত অভিনয়।

বাস্তবে ইরিনা গোপনে মেয়ের কাপড় গুছিয়ে ফেলেছিলেন। বিমানের টিকিটও কেটে রেখেছিলেন। লক্ষ্য ছিল একটাই—যে কোনও মূল্যে রাশিয়া ছেড়ে পালানো।

ইরিনা পরে বলেন, “আমরা সবাইকে বোকা বানাতে পেরেছিলাম। ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কিন্তু আমাদের সামনে আর কোনও পথ খোলা ছিল না।


 

২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর। সরকারপন্থী সাংসদ, সংবাদমাধ্যম এবং নিরাপত্তা কর্তারা অপেক্ষা করছিলেন এক নাটকীয় দৃশ্যের জন্য। তাঁদের ধারণা ছিল, কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ডায়ানা লগিনোভা প্রকাশ্যে অনুতাপ প্রকাশ করবেন, সরকারের কাছে ক্ষমা চাইবেন এবং ঘোষণা করবেন যে তিনি আর কখনও সরকারবিরোধী গান গাইবেন না।

কিন্তু সেই মঞ্চে ডায়ানা আর তাঁর মা কোনও দিনই পৌঁছাননি।

সংবাদ সম্মেলনের জন্য সবাই অপেক্ষা করার সময় মা-মেয়ে তখন অনেক দূরে। তাঁরা ইতিমধ্যেই বিমানবন্দরের পথে রওনা দিয়েছেন। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশঙ্কা ছিল, সীমান্তে কিংবা বিমানবন্দরে তাঁদের আটক করা হতে পারে। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে নিরাপত্তা বাহিনী কোনও বাধা দেয়নি।

বিমানটি আকাশে উড়ে যাওয়ার পরই তাঁরা প্রথমবারের মতো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন।

গন্তব্য ছিল আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভান। সেটি ছিল একমুখী যাত্রা। ভবিষ্যতে কোথায় থাকবেন, কীভাবে নতুন জীবন শুরু করবেন—সে সম্পর্কে তাঁদের কোনও নিশ্চিত পরিকল্পনা ছিল না। শুধু একটি বিষয় নিশ্চিত ছিল—রাশিয়ায় আর ফেরা যাচ্ছে না।

ডায়ানার মা ইরিনা লগিনোভা বলেন, “আমি সব সময় মেয়ের পাশে ছিলাম। কনজারভেটরিতে পড়ার সময়ও, রাস্তায় দাঁড়িয়ে গান গাওয়ার সময়ও। শেষ পর্যন্ত দেশ ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্তও আমরা একসঙ্গেই নিয়েছিলাম।”

আজ ওয়ারশতে দাঁড়িয়ে ডায়ানা, তাঁর বাগ্‌দত্ত আলেকজান্ডার এবং মা—তিনজনই সেই সিদ্ধান্তের কথা মনে করেন আবেগ নিয়ে। তাঁদের চোখে এটি কেবল দেশত্যাগ নয়, স্বাধীনতাকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত।

ডায়ানা বলেন, “আমরা স্বাধীনতাকে বেছে নিতে পেরেছি। এটাই সবচেয়ে বড় কথা।”

এখন তিনি তাঁর প্রথম পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পাশাপাশি ফরাসি ভাষাও শিখছেন। কারণ তাঁর নতুন স্বপ্ন প্যারিসে বসবাস করা এবং সেখান থেকেই সংগীতচর্চা চালিয়ে যাওয়া।

তাঁর গল্প শুধু একজন তরুণ শিল্পীর ব্যক্তিগত সংগ্রামের কাহিনি নয়। এটি আজকের রাশিয়ার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতারও এক প্রতিচ্ছবি। যেখানে একটি গান, একটি কবিতা, একটি সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট কিংবা যুদ্ধবিরোধী একটি বাক্যও রাষ্ট্রের চোখে অপরাধ হয়ে উঠতে পারে।

তবু সেই দমননীতির মধ্যেও প্রতিবাদের সুর থেমে নেই। রাশিয়ার ভেতরে এবং নির্বাসনে ছড়িয়ে থাকা শিল্পীরা এখনও বিশ্বাস করেন, সংগীত শুধু বিনোদন নয়—এটি স্মৃতি, বিবেক এবং স্বাধীনতার ভাষা।

ওয়ারশর মঞ্চে হাজারো দর্শকের সঙ্গে যখন ডায়ানা লগিনোভা আবার সেই প্রতিবাদের গান গাইলেন, তখন সেটি ছিল শুধু একটি সংগীত পরিবেশনা নয়। সেটি ছিল কারাগারের অন্ধকার পেরিয়ে স্বাধীন আকাশের নিচে ফিরে আসা এক তরুণীর ঘোষণা—কণ্ঠস্বরকে বন্দি করা যায়, কিন্তু গানকে নয়।


 

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles