Table of Contents
ইতিহাসের আদালতে সবচেয়ে বড় অপরাধ
ইতিহাস বড় বিচিত্র বিচারক।
সে কখনো নির্মম, কখনো উদার। কখনো হাজার হাজার মানুষের হত্যাকারীকে মহান শাসক বলে সম্মান দেয়, আবার কখনো একটিমাত্র রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জন্য কাউকে চিরস্থায়ী নিন্দার অন্ধকূপে নিক্ষেপ করে।
মানুষের স্মৃতি আরও বিচিত্র।
পাড়ার যে লোকটা একসময় চুরি করেছিল, কয়েক বছর পরে তার কথা কেউ মনে রাখে না। যে ব্যবসায়ী কর ফাঁকি দিয়েছিল, কিছুদিন পরে সে আবার সমাজসেবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। যে রাজনীতিবিদ দুর্নীতি করেছিল, ভোটের সময় তার গলায় আবার ফুলের মালা পড়ে।
কিন্তু কেউ যদি একবার ‘বেইমান’ বলে চিহ্নিত হয়, তাহলে তার সর্বনাশ। সেই তকমা আর ওঠে না। একবার নয়, দুইবার নয়, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তার নাম উচ্চারিত হয় অভিশাপ হিসেবে।
মিরজাফর: এক অদ্ভুত অমরত্বের গল্প
এই কারণেই ইতিহাসে মিরজাফর বেঁচে আছেন। বীর হিসেবে নয়। শাসক হিসেবে নয়। মানুষ হিসেবে তো নয়ই। তিনি বেঁচে আছেন একটি গালাগাল হয়ে।
একজন স্কুলপড়ুয়া হয়তো জানে না পলাশীর যুদ্ধ কবে হয়েছিল। কিন্তু সে জানে, কাউকে বিশ্বাসঘাতক বলতে হলে তাকে ‘মিরজাফর’ বলা যায়।
এ এক অদ্ভুত অমরত্ব। যে অমরত্বের জন্য কেউ প্রার্থনা করে না।
চুরির ক্ষমা হয়, বিশ্বাসঘাতকতার হয় না কেন?
আসলে মানুষ চুরিকে ক্ষমা করতে পারে। কারণ চুরি বস্তুগত ক্ষতি করে। টাকা হারায়। গয়না হারায়। জমি হারায়। এমনকি ক্ষমতাও হারায়।
কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা অন্য জিনিস। এটি মানুষের মানসিক জগতকে আঘাত করে। যাকে আপনি বন্ধু ভাবতেন, সে শত্রু হয়ে উঠেছে। যাকে আপনি নিজের মানুষ মনে করতেন, সে অন্যের হয়ে কাজ করছে। যার হাতে আপনি নিজের নিরাপত্তা তুলে দিয়েছিলেন, সেই হাতই আপনার বিরুদ্ধে ছুরি তুলছে।
এই আঘাত অর্থনৈতিক নয়। এটি অস্তিত্বগত। তাই মানুষের মনে এর ক্ষত গভীরতর।
রক্তাক্ত শাসক বনাম বিশ্বাসঘাতক: ইতিহাসের দ্বিমুখী বিচার
একবার ভাবুন। ইতিহাসে কত ভয়ংকর শাসক ছিলেন। অনেকে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী। অনেক রাজা নিজের ভাইকে হত্যা করেছেন। অনেক সম্রাট প্রতিদ্বন্দ্বীদের চোখ উপড়ে ফেলেছেন। অনেক বিপ্লবী ক্ষমতায় এসে অত্যাচারী হয়ে উঠেছেন। কিন্তু তাঁদের অনেকের নামের পাশে এখনো নানা বিশেষণ জুড়ে দেওয়া হয়। কেউ মহান। কেউ সাহসী। কেউ দূরদর্শী। কেউ রাষ্ট্রনির্মাতা।
অর্থাৎ ইতিহাস তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করলেও পুরোপুরি বর্জন করেনি। কিন্তু বিশ্বাসঘাতকদের ক্ষেত্রে ইতিহাসের আচরণ আলাদা। সেখানে আপিলের সুযোগ কম। সেখানে জামিন মেলে না। সেখানে সাজা প্রায় চিরস্থায়ী।
বিবর্তনের ঋণ: কেন সমাজ বিশ্বাসঘাতককে ভুলতে পারে না
এর কারণ সম্ভবত বিবর্তনের ইতিহাসে লুকিয়ে আছে। মানুষ আদিম যুগ থেকে দলবদ্ধ প্রাণী। একটি গোষ্ঠী টিকে থাকে পারস্পরিক আস্থার উপর। যোদ্ধা যদি যুদ্ধক্ষেত্রে পালিয়ে যায়, পুরো দল মারা পড়তে পারে। প্রহরী যদি শত্রুর সঙ্গে হাত মেলায়, গোটা দুর্গ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
অতএব, সমাজের কাছে বিশ্বাসঘাতকতা শুধু নৈতিক অপরাধ নয়। এটি সমষ্টিগত অস্তিত্বের বিরুদ্ধে অপরাধ। এই কারণেই সমাজ বিশ্বাসঘাতকদের প্রতি এত নির্মম। চোরকে ঘৃণা করা হয়। কিন্তু বিশ্বাসঘাতককে ঘৃণা করার সঙ্গে সঙ্গে তাকে স্মরণও রাখা হয়। কারণ সমাজ চায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সতর্ক থাকুক।
বিশ্বাসঘাতক কি নিজেকে বেইমান ভাবেন?
এখানেই মজার বিষয়। অনেক সময় ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতকরা নিজেরা মনে করেন তাঁরা মোটেই বিশ্বাসঘাতক নন। তাঁরা মনে করেন তাঁরা বাস্তববাদী। তাঁরা মনে করেন তাঁরা সুযোগসন্ধানী নন, বরং দূরদর্শী। তাঁরা মনে করেন তাঁরা ভুল পক্ষ ছেড়ে সঠিক পক্ষ বেছে নিয়েছেন।
কিন্তু সমস্যা হলো, ইতিহাসের ভোটবাক্সে নিজের ভোট নিজে দেওয়া যায় না। সেখানে অন্যরা ভোট দেয়। আর সেই ভোটে অনেক সময় রায় বেরোয় — ‘বেইমান’।
চোর বনাম বিশ্বাসঘাতক: আত্মপক্ষ সমর্থনের ফারাক
একজন চোরের পক্ষে আত্মপক্ষ সমর্থন সহজ। সে বলতে পারে, অভাব ছিল। লোভ হয়েছিল। ভুল করেছি। ক্ষমা চাই।
কিন্তু একজন বিশ্বাসঘাতকের সমস্যা হলো, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ শুধু কাজের নয়, চরিত্রের। লোকেরা মনে করে, সে শুধু একটি ভুল সিদ্ধান্ত নেয়নি। সে আসলে এমন একজন মানুষ, যার উপর ভরসা করা যায় না। আর একবার যদি মানুষের মনে এই ধারণা জন্মায়, তাহলে তা দূর করা প্রায় অসম্ভব।
ইতিহাসের বিচিত্র বৈপরীত্য: মূর্তি বনাম অভিধান
ইতিহাসে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা যায়। অনেক রক্তাক্ত সেনাপতি সম্মানের সঙ্গে স্মরণীয়। অনেক নিষ্ঠুর শাসক পর্যটনকেন্দ্রের নাম হয়ে গেছেন। অনেক দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকের মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু বিশ্বাসঘাতকদের নাম অভিধানে পরিণত হয়েছে। মিরজাফর ব্যক্তি নন, বিশেষণ। ব্রুটাস ব্যক্তি নন, সতর্কবার্তা। কুইসলিং ব্যক্তি নন, রাজনৈতিক গালি।
ইতিহাস যেন বলছে — চুরি করো, যুদ্ধ করো, রাজনীতি করো, ক্ষমতার লড়াই করো। কিন্তু নিজের দলের পিঠে ছুরি মারার আগে দু’বার ভেবে নিও।
কারণ বংশধরেরা হয়তো তোমার সম্পত্তি পাবে। কিন্তু তোমার নাম পাবে না। নামটা ইতিহাস নিজের কাছে রেখে দেবে। আর সেই নামের পাশে লাল কালিতে লিখে দেবে — “বিশ্বাসঘাতক।”