বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের আকাশপথে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছে কেন্দ্রীয় সরকার। দেশের অসংখ্য ছোট শহর, প্রত্যন্ত অঞ্চল এবং দুর্গম এলাকাকে বিমান যোগাযোগের আওতায় আনার লক্ষ্যে কেন্দ্র ঘোষণা করল ‘উড়ান ২’ প্রকল্প। কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রী কে. রামমোহন নাইডু জানিয়েছেন, আগামী দশ বছরে দেশে আরও ১০০টি নতুন বিমানবন্দর এবং ২০০টি হেলিপ্যাড তৈরি করা হবে। ঝাড়খণ্ডের রাঁচিতে এক অনুষ্ঠানে এই মেগা প্রকল্পের ঘোষণা করে তিনি বলেন, আকাশপথে যাতায়াতকে “সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে” নিয়ে আসাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।

২০১৬ সালে চালু হওয়া ‘উড়ান’ প্রকল্পের মূল ভাবনাই ছিল — “উড়ে দেশ কা আম নাগরিক”। অর্থাৎ, বিমানে চড়া যেন শুধু ধনী বা শহুরে মানুষের একচেটিয়া সুবিধা না থাকে। সেই সফল প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় এখন আরও বৃহৎ আকার নিতে চলেছে। সরকারের উচ্চপদস্থ মহলের মতে, দেশের অর্থনৈতিক বিকাশের পরবর্তী ধাপ অনেকটাই নির্ভর করছে আঞ্চলিক সংযোগ ব্যবস্থার ওপর। রেল ও সড়কপথের পাশাপাশি বিমান যোগাযোগও যদি ছোট শহর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে যায়, তাহলে স্থানীয় অর্থনীতি দ্রুত গতি পাবে।

পাহাড়ি ও দুর্গম অঞ্চলে বিশেষ গুরুত্ব

‘উড়ান ২’ প্রকল্পে শুধু নতুন বিমানবন্দর নির্মাণই নয়, বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে হেলিপ্যাড তৈরির ওপরও। ভারতের বহু পাহাড়ি অঞ্চল, সীমান্ত এলাকা এবং দ্বীপাঞ্চলে বড় রানওয়ে বা বিমানবন্দর তৈরি করা ভৌগোলিক কারণেই অত্যন্ত কঠিন। সেইসব দুর্গম স্থানে হেলিকপ্টার পরিষেবা চালু করলে দ্রুত যোগাযোগ সম্ভব হবে। বিশেষত উত্তর-পূর্ব ভারত, হিমালয় সংলগ্ন এলাকা, আন্দামান-নিকোবর কিংবা লাদাখের মতো স্ট্র্যাটেজিক ও পর্যটনপ্রধান অঞ্চলে এই উদ্যোগ এক বড়সড় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।

অর্থনৈতিক বিকাশ ও কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত

সরকারের বক্তব্য, উন্নত বিমান যোগাযোগ মানে শুধু দ্রুত যাতায়াত নয়; এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে কর্মসংস্থান, পর্যটন, ব্যবসা এবং নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা।

  • স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশ: একটি নতুন বিমানবন্দর তৈরি হলে তার আশেপাশে হোটেল, পরিবহণ, গুদামজাতকরণ (ওয়্যারহাউজিং), ক্ষুদ্র শিল্প এবং পরিষেবা খাতের দ্রুত বিস্তার ঘটে।

  • কর্মসংস্থান: এর ফলে স্থানীয় মানুষের জন্য বিপুল পরিমাণে নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হয়।

  • বৈষম্য দূরীকরণ: বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের মতো বিশাল ও বৈচিত্র্যময় দেশে আঞ্চলিক বিমান যোগাযোগ অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

গত কয়েক বছরে মূল ‘উড়ান’ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের বহু ছোট শহর প্রথমবার বিমান মানচিত্রে জায়গা পেয়েছে। যেসব বিমানবন্দর বহু বছর ধরে অচল বা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল, সেগুলিকেও সংস্কার করে নতুন করে চালু করা হয়েছে। সরকারের বেঁধে দেওয়া কম ভাড়ায় বিমান পরিষেবা চালুর ফলে মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের মধ্যেও বিমান ভ্রমণের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কেন্দ্রের দাবি, এই প্রকল্পের সুবাদেই দেশের অসংখ্য সাধারণ মানুষ জীবনে প্রথমবার বিমানে চড়ার সুযোগ পেয়েছেন।

চ্যালেঞ্জ যেখানে স্থায়িত্ব ও আর্থিক সংশয়

তবে এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পকে ঘিরে কিছু প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জও উঠে আসছে। এত বিপুল সংখ্যক বিমানবন্দর ও হেলিপ্যাড নির্মাণের জন্য প্রয়োজন বিপুল অঙ্কের সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ। সমালোচকদের একাংশের মতে, শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না; সেগুলি দীর্ঘমেয়াদে আর্থিকভাবে টেকসই (Financially Viable) কি না, সেটাও খতিয়ে দেখা জরুরি। কারণ, বর্তমানে ভারতের বেশ কিছু ছোট বিমানবন্দর পর্যাপ্ত যাত্রী না পাওয়ার কারণে লোকসানের মুখে পড়েছে। ফলে, ‘উড়ান ২’ প্রকল্পের চূড়ান্ত সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে এর বাস্তবায়ন দক্ষতা, সঠিক রুট নির্বাচন এবং যাত্রী চাহিদার ওপর।

সমস্ত চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে কেন্দ্রের এই ঘোষণা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নয়াদিল্লি এই বার্তার মাধ্যমে স্পষ্ট করে দিল যে, আগামী দশকের ভারতের উন্নয়ন শুধু মহানগরকেন্দ্রিক হবে না; ছোট শহর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলকেও জাতীয় অর্থনীতির মূল স্রোতে সামিল করা হবে। আর সেই লক্ষ্যপূরণের অন্যতম বড় হাতিয়ার হতে চলেছে দেশের আকাশপথের এই মহাপরিকল্পনা।