Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিম এশিয়ার আকাশে এখনও বারুদের গন্ধ। পারস্য উপসাগরের জলে এখনও যুদ্ধজাহাজের ছায়া। তবু এই উত্তপ্ত মুহূর্তেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আচমকা এমন এক সুর তুললেন, যা একই সঙ্গে বিস্ময়কর, কৌশলী এবং রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর দাবি, ইরান নাকি “ভীষণভাবে” সমঝোতা চায়। এমনকি চলতে থাকা সংঘাতও “খুব দ্রুত” শেষ হয়ে যেতে পারে। শুধু তাই নয়, ট্রাম্প আরও ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম নাকি বড়সড় পতনের মুখে, কারণ সরবরাহ এত বেশি যে বাজার তা আর ধারণ করতে পারছে না।
মার্কিন সেনেটের ঐতিহাসিক প্রস্তাব ও ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক বিভাজন
এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন ওয়াশিংটনে যুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজন ভয়ঙ্কর রকম স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মার্কিন সেনেট সদ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব বিবেচনা করার পক্ষে রায় দিয়েছে, যার উদ্দেশ্য প্রেসিডেন্টের একতরফা যুদ্ধক্ষমতার ওপর লাগাম টানা। ভোটাভুটিতে ফল হয়েছে ৫০ বনাম ৪৭। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হল, কয়েকজন রিপাবলিকান সেনেটরও ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। অর্থাৎ বিষয়টি আর নিছক দলীয় রাজনীতির গণ্ডিতে নেই। প্রশ্ন উঠছে রাষ্ট্রক্ষমতা, সংবিধান এবং যুদ্ধের বৈধতা নিয়ে।
ট্রাম্পের নাটকীয় কূটনীতি
ট্রাম্পের রাজনীতির চরিত্র বরাবরই নাটকীয়। তিনি প্রায়শই এমন ভাষা ব্যবহার করেন, যাতে একই সঙ্গে শক্তির প্রদর্শন এবং দর কষাকষির ইঙ্গিত থাকে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। একদিকে তিনি ইরানের ওপর সামরিক চাপ বজায় রেখেছেন, অন্যদিকে এমন ছবি তুলে ধরছেন যেন তেহরান ইতিমধ্যেই নরম হয়ে এসেছে। তাঁর বক্তব্যের অন্তর্নিহিত বার্তা পরিষ্কার—“চাপ কাজ করছে।”
তেহরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি কি এত সরল?
সমস্যা হল, পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতি কখনও সরলরেখায় চলে না। ইরান প্রকাশ্যে এখনও মার্কিন অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করছে। তেহরানের শাসকগোষ্ঠী জানে, প্রকাশ্যে দুর্বলতা দেখানো মানে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিপদ ডেকে আনা। বিশেষত এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থায়, যেখানে বিপ্লবী জাতীয়তাবাদ এবং আমেরিকা-বিরোধিতাই শাসনের অন্যতম ভিত্তি। ফলে ট্রাম্পের বক্তব্য আংশিক সত্য হলেও, সেটি নিঃসন্দেহে আলোচনার টেবিলে নিজের অবস্থান শক্ত করার কৌশলও বটে।
উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলি কেন যুদ্ধ এড়াতে মরিয়া?
এখানেই এসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলির ভূমিকা। কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির নেতারা নাকি ট্রাম্পকে সামরিক হামলা স্থগিত রাখার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, এখনও আলোচনা সম্ভব। এই খবর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই দেশগুলিই দীর্ঘদিন ধরে ইরানের প্রভাব বিস্তার নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। অথচ তারাই এখন যুদ্ধ ঠেকাতে সক্রিয়।
কেন?
কারণ উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলি খুব ভাল করেই জানে, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হলে তার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অভিঘাত প্রথমে তাদের ওপরই পড়বে। ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, তেল স্থাপনায় আঘাত, জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া—সব মিলিয়ে গোটা অঞ্চলের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে সৌদি আরবের মতো দেশ, যারা অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে বের করে আনতে চাইছে, তারা দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা একেবারেই চায় না।
তেলের বাজার নিয়ে ট্রাম্পের পূর্বাভাস
তেলের দাম নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যও এই বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক অঙ্কের অংশ। সাধারণত পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ মানেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ে। কারণ বাজার আশঙ্কা করে সরবরাহ ব্যাহত হবে। কিন্তু ট্রাম্প উল্টো কথা বলছেন। তিনি বলছেন, সরবরাহ এত বেশি যে দাম বরং নামবে।
এ বক্তব্যের মধ্যে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক—দুই ধরনের উদ্দেশ্যই রয়েছে।
অর্থনৈতিক কারণ হল, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আমেরিকা নিজেই এক বিশাল জ্বালানি উৎপাদক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। শেল তেল উৎপাদনের বিস্ফোরণ বিশ্ববাজারের সমীকরণ বদলে দিয়েছে। অন্যদিকে ওপেকের (OPEC) সদস্য দেশগুলি উৎপাদন কমিয়ে দাম ধরে রাখার চেষ্টা করলেও, বাজারে উদ্বৃত্ত সরবরাহের ভয় এখনও রয়েছে। ট্রাম্প সম্ভবত সেই বাস্তবতার কথাই বলতে চাইছেন।
কিন্তু রাজনৈতিক দিকটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকান ভোটারদের কাছে পেট্রোলের দাম অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। যুদ্ধের কারণে যদি তেলের দাম হু হু করে বাড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়বে। তাই ট্রাম্প আগেভাগেই এমন এক বয়ান তৈরি করতে চাইছেন, যাতে বোঝানো যায়—“এই সংঘাত অর্থনীতিকে ধ্বংস করবে না।”
হোয়াইট হাউসের একচ্ছত্র ক্ষমতার বিরুদ্ধে ক্যাপিটল হিলের প্রতীকী বিদ্রোহ
তবে সেনেটের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ প্রমাণ করছে, ওয়াশিংটনে সবাই এই আশ্বাসে ভরসা করছেন না।
যে প্রস্তাবটি অগ্রসর হয়েছে, তার মূল লক্ষ্য প্রেসিডেন্টের একতরফা সামরিক ক্ষমতা সীমিত করা। মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণা করার চূড়ান্ত ক্ষমতা কংগ্রেসের। কিন্তু গত কয়েক দশকে প্রেসিডেন্টরা নানা আইনি অজুহাতে সেই সীমা ক্রমাগত প্রসারিত করেছেন। আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কংগ্রেস কার্যত দর্শকের ভূমিকায় নেমে এসেছে।
এই প্রস্তাব সেই একতরফা প্রবণতার বিরুদ্ধে এক প্রতীকী বিদ্রোহ।
রিপাবলিকান শিবিরে ফাটল এবং আমেরিকার ‘যুদ্ধ ক্লান্তি’
এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হল রিপাবলিকানদের ভাঙন। কারণ ট্রাম্পের দলে সাধারণত তাঁর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে যাওয়ার সাহস খুব কম নেতাই দেখান। অথচ এবার চারজন রিপাবলিকান সেনেটর ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ভোট দিয়েছেন এবং কয়েকজন ভোটদানে অনুপস্থিত ছিলেন। এর অর্থ, দলের ভেতরেও উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকে আশঙ্কা করছেন, ইরানের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
মনে রাখতে হবে, আমেরিকার সাধারণ মানুষের মধ্যেও ‘যুদ্ধ ক্লান্তি’ (War fatigue) প্রবল। ইরাক এবং আফগানিস্তানের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আমেরিকান সমাজকে বদলে দিয়েছে। কোটি কোটি ডলার খরচ, হাজার হাজার প্রাণহানি, অথচ শেষ পর্যন্ত স্থায়ী রাজনৈতিক সাফল্য প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে নতুন করে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার প্রশ্নে মানুষের উৎসাহ অত্যন্ত কম।
ভারসাম্য রক্ষার কঠিন পরীক্ষা
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের বর্তমান অবস্থানকে একধরনের দ্বৈত কৌশল বলা যায়। তিনি একদিকে শক্তিমান নেতার ভাবমূর্তি বজায় রাখতে চাইছেন, অন্যদিকে এমনও দেখাতে চাইছেন যে তিনি যুদ্ধ নয়, “চুক্তি” চান। অর্থাৎ তিনি একই সঙ্গে যুদ্ধপ্রিয় এবং শান্তির দূত—দুই চরিত্রই ধারণ করতে চাইছেন।
কিন্তু ইতিহাস বলে, এই ধরনের ভারসাম্য রক্ষা অত্যন্ত কঠিন।
একটি ভুল হিসাব, একটি অতিরিক্ত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, অথবা কোনও প্রক্সি গোষ্ঠীর আকস্মিক আক্রমণ মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের সবচেয়ে বড় বিপদই হল, সেখানে প্রায়ই যুদ্ধ শুরু হয় সুপরিকল্পিতভাবে নয়, বরং ভুল বোঝাবুঝি বা তাৎক্ষণিক উত্তেজনা থেকে।
তাই আজ ট্রাম্প যতই বলুন “খুব দ্রুত” সব শেষ হয়ে যেতে পারে, বাস্তবতা হল এই সংকট এখনও ভয়ঙ্কর অনিশ্চয়তার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে।
বিশ্ব আপাতত অপেক্ষা করছে—এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে থামবে, নাকি আবারও পশ্চিম এশিয়া নতুন এক দীর্ঘ যুদ্ধের সাক্ষী হবে।