Home দৃষ্টিভঙ্গিবিশ্লেষণ দুই ভারত, দুই বাস্তবতা

দুই ভারত, দুই বাস্তবতা

উত্তর-দক্ষিণ বিভাজনের রাজনীতি যখন সংসদে উত্তাল, তখন নীরবে উপেক্ষিত রয়ে যাচ্ছে ভারতের শহরগুলির কোটি কোটি ভোটার

0 comments 3 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের মতভেদ কখনও কখনও তিক্ত, আবার প্রায়ই ক্লান্তিকর ও একঘেয়ে। উত্তর ভারত দরিদ্র, বিপুল হারে সন্তান উৎপাদন করে এবং নির্ভরযোগ্যভাবে নরেন্দ্র মোদিকে ভোট দেয়। দক্ষিণ ভারত তুলনায় সমৃদ্ধ, কম সন্তান জন্ম দেয় এবং মোদিকে ভোট দেয় না।

দুই অঞ্চলের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাও ভিন্ন। মুসলিম সাম্রাজ্য উপদ্বীপের দক্ষিণে উত্তর ভারতের মতো গভীর অনুপ্রবেশ করতে পারেনি। ভাষাগত শিকড়ও সম্পূর্ণ আলাদা — দক্ষিণের ভাষাগুলি দ্রাবিড় ভাষাপরিবারভুক্ত, উত্তরের ভাষাগুলি মূলত ইন্দো-আর্য পরিবারভুক্ত। এমনকি খাদ্যাভ্যাসও সাংস্কৃতিক বিভেদের অংশ। ভাতখেকো দক্ষিণ ভারত প্রায়শই রুটি-খেকো উত্তর ভারতীয়দের এমন সব বর্বর হিসেবে ব্যঙ্গ করে, যারা তাদের ওপর এক বহিরাগত সংস্কৃতি চাপিয়ে দিতে চায়।

সংসদে নাটকীয় সংঘর্ষ

এই বিভাজনই সম্প্রতি ভারতের সংসদে ঘটে যাওয়া নাটকীয় রাজনৈতিক সংঘর্ষের কেন্দ্রে ছিল। নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি একগুচ্ছ সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাব আনে। সেই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য ছিল লোকসভার আসনসংখ্যা বর্তমান ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ করা, দেশের জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের ভিত্তিতে রাজ্যগুলির মধ্যে আসন পুনর্বণ্টন করা, এবং নতুন আসনের এক-তৃতীয়াংশ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত রাখা।

বিরোধীরা, বিশেষত দক্ষিণ ভারতের নেতারা, এই প্রস্তাবকে নারীর ক্ষমতায়নের মুখোশে মোড়া এক রাজনৈতিক ক্ষমতা-কেন্দ্রীকরণের প্রকল্প বলে অভিযুক্ত করেন। শেষ পর্যন্ত বিলগুলি পাস হয়নি।

উত্তর প্রদেশের সাংসদরা গড়ে তামিলনাড়ুর সাংসদদের তুলনায় প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বেশি ভোটারের প্রতিনিধিত্ব করেন।

দক্ষিণের আশঙ্কা কতটা যুক্তিসঙ্গত

দক্ষিণ ভারতের আশঙ্কা যে অমূলক নয়, তা সহজেই বোঝা যায়। ওই প্রস্তাব কার্যকর হলে সংসদে দক্ষিণের রাজনৈতিক ওজন কমে যেত এবং উত্তর ভারতের বিজেপি-ঘাঁটিগুলি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠত। বিজেপির উদ্দেশ্য নিয়েও সন্দেহের যথেষ্ট কারণ রয়েছে, কারণ দলটি এই প্রস্তাবগুলি প্রায় কোনও রাজনৈতিক পরামর্শ বা ঐকমত্য গড়ে না তুলেই সামনে এনেছিল।

কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের প্রশ্নে উত্তর ভারতের দাবির ভিত পুরোপুরি ফাঁপা নয়। উত্তর প্রদেশের উত্তরাঞ্চলের সাংসদরা গড়ে তামিলনাড়ুর সাংসদদের তুলনায় প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বেশি ভোটারের প্রতিনিধিত্ব করেন। এই অসাম্য শেষ পর্যন্ত কোনও না কোনও সময়ে সংশোধন করতেই হবে, সম্ভবত আগামী জনগণনার পর।

আদর্শ গণতান্ত্রিক পদ্ধতি হত শান্ত আলোচনা, সমঝোতা এবং ধাপে ধাপে সংস্কারের পথে হাঁটা। কিন্তু বিজেপির রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনেক সময়ই আলোচনার বদলে বিরোধীদের ওপর সংখ্যার জোরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতায় বিশ্বাসী। ফলে এই সংঘাত এখনই থামছে না; বরং আরও দীর্ঘ রাজনৈতিক নাটকের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আড়ালে থাকা বড় সংকট: শহুরে অপ্রতিনিধিত্ব

তবে উত্তর-দক্ষিণ সংঘর্ষ ভারতের আরেকটি গভীর সংকটকে আড়াল করে রাখে — শহুরে ভারতের কম প্রতিনিধিত্ব। এই সমস্যাটি সমান গুরুত্বপূর্ণ, অথচ তুলনামূলকভাবে অনেক কম আলোচিত। গোটা ভারত জুড়েই শহরের ভোটাররা বাস্তবে অনেক কম রাজনৈতিক গুরুত্ব পান। গড়ে মহানগর এলাকার সাংসদরা গ্রামীণ এলাকার সাংসদদের তুলনায় প্রায় দশ শতাংশ বেশি ভোটারের প্রতিনিধিত্ব করেন।

বহু ক্ষেত্রে বৈষম্য আরও চরম। বেঙ্গালুরুর মাত্র চারটি লোকসভা কেন্দ্রে যত ভোটার রয়েছে, দেশের গড়পড়তা ছ’টি গ্রামীণ কেন্দ্রে মিলিয়েও প্রায় তত ভোটার নেই। সবচেয়ে বেশি ভোটারসংখ্যা-সম্পন্ন ২০টি কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র একটি পুরোপুরি গ্রামীণ। ভারতের কিছু সবচেয়ে অস্বস্তিকর, বিশৃঙ্খল ও অপরিকল্পিত শহর, যেমন গাজিয়াবাদ — আসলে সবচেয়ে কম প্রতিনিধিত্বপ্রাপ্ত।

শহর দেয় বেশি, পায় কম

দক্ষিণ ভারতের শিল্পোন্নত রাজ্যগুলি প্রায়ই অভিযোগ করে যে তারা জাতীয় অর্থনীতিতে বিপুল অবদান রাখলেও দিল্লি তাদের যথাযথ মর্যাদা দেয় না। কিন্তু ভারতের শহরগুলি আরও জোরালোভাবে একই দাবি করতে পারে। দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ শহরে বাস করলেও তারা জাতীয় উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ সৃষ্টি করে।

অথচ বিনিময়ে শহুরে ভারত পায় ভাঙা ফুটপাত, খানাখন্দে ভরা রাস্তা, ভঙ্গুর গণপরিবহণ ব্যবস্থা, শ্বাসরুদ্ধকর দূষণ, নর্দমায় ভরা জলপথ এবং পচা আবর্জনার স্তূপ। ভারতীয় শহরগুলির অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা এবং তাদের বাস্তব জীবনযাত্রার মানের মধ্যে এই বৈপরীত্য ভয়াবহ। যদি শহরগুলি সত্যিই বাসযোগ্য হত, তবে ভারতের অর্থনীতি আরও কতদূর এগোতে পারত, তা কল্পনা করাও কঠিন।

সংস্কার হলে কী বদলাত

দ্য ইকনমিস্ট-এর হিসাব অনুযায়ী, সুষ্ঠু আসন পুনর্বিন্যাস করা হলে ভারতের ছ’টি বৃহত্তম শহরেই লোকসভা আসনসংখ্যা প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ বৃদ্ধি পেত। বৃহত্তর লোকসভা আরও কিছু কাঠামোগত সুবিধাও এনে দিতে পারত। ভারতের শহরতলি এবং আধা-শহুরে অঞ্চলগুলি দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু সেগুলি এখনও বিশাল গ্রামীণ আসনের মধ্যে গুঁজে রাখা হয়েছে।

পুনর্বিন্যাস ও আসনবৃদ্ধি মিলিয়ে শহুরে ভারতের সাংসদ-সংখ্যা অন্তত তার জনসংখ্যার অনুপাতে পৌঁছত। তখন হয়তো সরকারগুলিও শহুরে জীবনের সর্বব্যাপী বিশৃঙ্খলাকে গুরুত্ব সহকারে দেখতে বাধ্য হত।

উপনিবেশিক মনোভাবে শহর শাসন

ভারতের আরেকটি অদ্ভুত বৈপরীত্য হল — রাজ্য সরকারগুলি প্রায় উপনিবেশিক মনোভাব নিয়ে শহর শাসন করে। তিন দশকেরও বেশি আগে শহরাঞ্চলকে আরও স্বশাসনের ক্ষমতা দেওয়ার জন্য যে সাংবিধানিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তা কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। শহরের মানুষ কাউন্সিলর নির্বাচন করলেও প্রকৃত ক্ষমতা থাকে রাজ্য-নিযুক্ত আমলাদের হাতে, যাদের মেয়াদও সাধারণত স্বল্পস্থায়ী।

মেয়ররা প্রায় প্রতীকী চরিত্র। নগর পরিষদগুলি বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণে তেমন ভূমিকা রাখে না। অন্যদিকে রাজ্যের বিধানসভাগুলিতে গ্রামীণ অঞ্চলগুলির কণ্ঠস্বরই প্রধান।

আসন পুনর্বিন্যাস শুধু লোকসভায় নয়, রাজ্য বিধানসভাগুলিতেও শহুরে ভোটারদের প্রভাব বাড়াতে পারে। এর বাস্তব উদাহরণও রয়েছে। দুই দশক আগে রাজ্যগুলির অভ্যন্তরে আসন পুনর্বিন্যাসের সময় বেঙ্গালুরুর বিধানসভা প্রতিনিধিত্ব ১৬ থেকে বেড়ে ২৮ হয়েছিল। শহরটি এখনও সমস্যাগ্রস্ত, কিন্তু ভারতবর্ষে এটিই এমন কয়েকটি জায়গার একটি যেখানে রাজ্য সরকার একটি নতুন মহানগর কর্তৃপক্ষ গঠনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে, যা ভবিষ্যতে শহর পরিচালনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

আংশিক সমাধানের পথে

অবশ্যই নির্বাচনী সংস্কার এক লহমায় ভারতের শহুরে সংকট মিটিয়ে দেবে না। তবু এটি অন্তত প্রতিনিধিত্বের গভীর সংকটগুলির একটি আংশিক সমাধান করতে পারে। দক্ষিণ ভারতের উচ্চকণ্ঠ রাজ্যগুলি প্রায়শই তাদের ‘অ্যান্টি-রুটি’ ক্ষোভ দিয়ে জাতীয় মনোযোগ আকর্ষণ করে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বৃহত্তর অভিযোগ রয়েছে ভারতের সেই বিশ্বনাগরিক শহরগুলির, যেখানে ভাত, রুটি, ধোসা, বিরিয়ানি — সব ধরনের খাদ্যই সমানভাবে স্বাগত।

 

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles