Home খবর ভাতা-রাজনীতির ফাঁদ: কল্যাণরাষ্ট্র না নির্ভরতন্ত্র?

ভাতা-রাজনীতির ফাঁদ: কল্যাণরাষ্ট্র না নির্ভরতন্ত্র?

0 comments 2 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: একটি রাষ্ট্র যখন নাগরিককে বলে—”তুমি কাজ করো বা না-করো, উৎপাদন করো বা না-করো, আমরা তোমার হাতে মাসে মাসে টাকা তুলে দেব”—তখন সেই রাষ্ট্র আসলে কী তৈরি করছে? এই প্রশ্নটাই আজ ভারতের রাজনৈতিক অর্থনীতির কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি বি আর গাভাই সম্প্রতি সতর্ক করেছিলেন, রাজ্যগুলিতে যে প্রতিযোগিতামূলক ভাতা-রাজনীতি শুরু হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে ভারতকে “পরগাছার দেশে” পরিণত করতে পারে। মন্তব্যটি শুনে অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। কেউ বলেছিলেন এটি দরিদ্রবিরোধী, কেউ বলেছিলেন বিচারপতির কাজ অর্থনীতি শেখানো নয়। কিন্তু আবেগ সরিয়ে রেখে যদি ঠান্ডা মাথায় প্রশ্নটি দেখা যায়, তবে বোঝা যায় গাভাই আসলে ভারতের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও সমাজের এক গভীর বিপদের দিকেই আঙুল তুলেছিলেন।

উল্টো হয়েছে স্বাধীনতার স্বপ্ন

ভারতের স্বাধীনতার পরে কল্যাণনীতির ধারণা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন রাষ্ট্রের লক্ষ্য ছিল নাগরিককে এমন অবস্থায় পৌঁছে দেওয়া যাতে সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সেচ, রাস্তা, শিল্প, বিদ্যুৎ, কৃষি-সহায়তা—এসব ছিল ক্ষমতায়নের উপকরণ। রাষ্ট্র মাছ খেতে দিত না, মাছ ধরতে শেখাত।

আজকের রাজনৈতিক সংস্কৃতি তার উল্টো। ভোটের বাজারে সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রতিশ্রুতি এখন সরাসরি নগদ ভাতা। যেন নাগরিক আর উৎপাদক নয়, তিনি কেবল ভোক্তা। আর রাজনীতি যেন অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতিযোগিতা নয়, দানখয়রাতের নিলাম।

বিপজ্জনক নিলাম

এই সংস্কৃতির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হল এর প্রতিযোগিতামূলক চরিত্র। এক রাজ্য যদি মহিলাদের মাসে এক হাজার টাকা দেয়, অন্য রাজ্য বলে আমরা দেব দেড় হাজার। কেউ বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দেয়, অন্য কেউ বলে আরও বেশি ইউনিট বিনামূল্যে। কেউ বলে ছাত্রদের সাইকেল, অন্য কেউ বলে ল্যাপটপ, স্কুটি, মোবাইল, নগদ অনুদান। ফলত রাজনীতি ক্রমশ একটি বিপজ্জনক নিলামে পরিণত হচ্ছে, যেখানে প্রশ্ন একটাই—কে কত বেশি বিনামূল্যে দিতে পারে।

সমস্যা হল, রাষ্ট্রের টাকা বলে আলাদা কোনও টাকা নেই। সরকার নিজে অর্থ উৎপাদন করে না। সে কর তোলে, ঋণ নেয়, অথবা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর বোঝা চাপায়। অর্থাৎ আজ যে ভাতা বিতরণ হচ্ছে, তার প্রকৃত দাম দিচ্ছে আগামী দিনের করদাতা।

ডুবছে রাজ্যের কোষাগার

ভারতের বহু রাজ্যের আর্থিক অবস্থা ইতিমধ্যেই বিপজ্জনক। পঞ্জাবের ঋণ রাজ্যের মোট উৎপাদনের তুলনায় ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে। হিমাচল প্রদেশ বেতন ও পেনশন দিতেই হিমশিম খাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ বহু বছর ধরেই ঋণের ভারে ন্যুব্জ। রাজস্থানের অবস্থাও উদ্বেগজনক। অথচ এই রাজ্যগুলিই আবার নতুন নতুন নগদ প্রকল্প ঘোষণা করে চলেছে। যেন অর্থনীতির নিয়ম নয়, ভোটের ক্যালেন্ডারই শেষ কথা।

একটি সহজ উপমা দেওয়া যাক। কোনও পরিবার যদি তার উপার্জনের বড় অংশ ধার করে প্রতিদিন উৎসব পালন করতে থাকে, তবে কিছুদিন পরে কী হবে? প্রথমে বাহবা মিলবে। কিন্তু একসময় ঋণের সুদই সংসারটাকে গ্রাস করবে। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই।

উৎপাদনশীলতা কমছে, বাড়ছে নির্ভরতা

অর্থনীতিবিদরা বহুদিন ধরেই সতর্ক করছেন যে ভারতের রাজ্যগুলির ব্যয়ের প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে। উৎপাদনশীল পুঁজি বিনিয়োগ কমছে, আর বাড়ছে তাৎক্ষণিক ভোগমূলক খরচ। একটি সেতু তৈরি করলে তার অর্থনৈতিক প্রতিফল বহু বছর থাকে। একটি শিল্পাঞ্চল কর্মসংস্থান তৈরি করে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় মানবসম্পদ তৈরি করে। কিন্তু মাসিক ভাতা রাজনৈতিকভাবে তাৎক্ষণিক জনপ্রিয় হলেও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনক্ষমতা বাড়ায় না।

এখানেই গাভাইয়ের “পরগাছা” শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরগাছা নিজে খাদ্য উৎপাদন করে না, অন্য গাছের রস শুষে বেঁচে থাকে। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা যায় “ডিপেনডেন্সি কালচার” বা নির্ভরতার সংস্কৃতি। যখন নাগরিক ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাঁকে ক্রমাগত নগদ সুবিধা দিয়ে যাওয়া, তখন কর্মসংস্থান, দক্ষতা, উদ্যোগ, উৎপাদন—এসবের সামাজিক গুরুত্ব কমতে শুরু করে।

সুরক্ষা আর প্রলোভন এক নয়

অবশ্যই এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। দরিদ্রের জন্য সামাজিক সুরক্ষা অপরিহার্য। বৃদ্ধভাতা, প্রতিবন্ধী সহায়তা, খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান প্রকল্প—এসব একটি সভ্য রাষ্ট্রের দায়িত্ব। প্রশ্নটি সামাজিক সুরক্ষা বনাম নিষ্ঠুর বাজারনীতির নয়। প্রশ্ন হল, সহায়তা কি লক্ষ্যভিত্তিক ও প্রয়োজনভিত্তিক, না সর্বজনীন ভোটনীতি?

ইউরোপের কল্যাণরাষ্ট্রগুলিও ভাতা দেয়, কিন্তু সেই ব্যবস্থার সঙ্গে উচ্চ উৎপাদনশীল অর্থনীতি, শক্তিশালী করব্যবস্থা এবং কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো জড়িত। সেখানে সামাজিক নিরাপত্তা নাগরিককে কর্মবিমুখ করার জন্য নয়, ঝুঁকির সময় তাকে রক্ষা করার জন্য। ভারতীয় রাজনীতিতে বহু ক্ষেত্রেই ভাতা হয়ে উঠছে নির্বাচনী প্রলোভনের হাতিয়ার।

বদলে যাচ্ছে নাগরিক-রাষ্ট্র সম্পর্ক

এই সংস্কৃতি নাগরিক ও রাষ্ট্রের সম্পর্ককেই বদলে দিচ্ছে। গণতন্ত্রে নাগরিক রাষ্ট্রের মালিক। তিনি কর দেন, জবাবদিহি চান, নীতি বিচার করেন। কিন্তু যখন রাজনীতি কেবল নগদ সুবিধার বিনিময়ে ভোটে নেমে আসে, তখন নাগরিক ধীরে ধীরে “অধিকারসম্পন্ন অংশীদার” থেকে “অনুদানপ্রত্যাশী গ্রাহক”-এ পরিণত হন। তখন ভাঙাচোরা রাস্তা , হাসপাতাল, স্কুলে শিক্ষক নেই—এসব প্রশ্ন পিছিয়ে যায়। সামনে আসে একটাই প্রশ্ন: “আমার অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকল তো?”

ভারতের বহু রাজ্যে এই মানসিকতার লক্ষণ ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। চাকরি নেই, শিল্প নেই, কিন্তু নগদ ভাতা আছে। কৃষি সংকটে, কিন্তু উৎসব ভাতা আছে। সরকারি হাসপাতাল দুর্বল, কিন্তু নির্বাচনের আগে নগদ অনুদান আছে। যেন দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রগঠনের বদলে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক তৃপ্তিই প্রধান উদ্দেশ্য।

সবচেয়ে বড় ক্ষতি যুবসমাজের

সবচেয়ে উদ্বেগজনক হল যুবসমাজের ওপর এর প্রভাব। যে দেশে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, সেখানে রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিৎ দক্ষতা, শিল্প, প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু যদি রাজনীতির বার্তা দাঁড়ায়—”রাষ্ট্র তোমাকে ভাতা দেবে”, তবে তা মনস্তাত্ত্বিক স্তরেও কর্মপ্রেরণাকে আঘাত করে। সমাজে উৎপাদনের মর্যাদা কমে যায়।

ভারতের ইতিহাসে এর উল্টো উদাহরণও আছে। স্বাধীনতার পরে দারিদ্র্য ছিল আরও গভীর, সম্পদ ছিল আরও কম। কিন্তু তখন রাষ্ট্রের জোর ছিল বাঁধ, কারখানা, গবেষণাকেন্দ্র, কৃষিবিপ্লব, বিজ্ঞানশিক্ষা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ার ওপর। ভুল ছিল, অপচয় ছিল, কিন্তু অন্তত লক্ষ্য ছিল উৎপাদনক্ষম রাষ্ট্র তৈরি করা। আজ বহু জায়গায় সেই লক্ষ্য সরে এসে দাঁড়িয়েছে তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তায়।

পাল্টা যুক্তিও আছে

গাভাইয়ের মন্তব্যের বিরুদ্ধে একটি পাল্টা যুক্তি অবশ্যই আছে। বলা হয়, অসমতা এত বেড়েছে এবং কর্মসংস্থান এত দুর্বল যে নগদ সহায়তা ছাড়া গরিব মানুষের বাঁচার উপায় নেই। এই যুক্তিকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভারতের বিপুল সংখ্যক মানুষ এখনও অনিশ্চিত জীবনে বাস করেন। কিন্তু এখানেও প্রশ্নটি “সহায়তা থাকবে কি থাকবে না” নয়। প্রশ্ন হল, রাষ্ট্রের সামগ্রিক অগ্রাধিকার কী?

যদি কোনও রাজ্য একই সঙ্গে শিল্প আনে, কর্মসংস্থান বাড়ায়, শিক্ষায় বিনিয়োগ করে এবং সীমিত লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা দেয়, তবে সেটি সুস্থ কল্যাণনীতি। কিন্তু যদি উন্নয়নের জায়গায় ভাতা নিজেই প্রধান রাজনৈতিক দর্শনে পরিণত হয়, তবে সেটি বিপজ্জনক।

নীরব থাকছে সব দল

আজ ভারতের রাজনীতিতে একটি অদ্ভুত নীরবতা আছে। কোনও দলই প্রকাশ্যে এই প্রতিযোগিতার বিরোধিতা করতে সাহস পায় না। কারণ সবাই জানে ভোটের বাজারে “ফ্রি” শব্দটির বিপুল আকর্ষণ। ফলে এক ধরনের সমষ্টিগত আর্থিক আত্মবিনাশের দিকে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে রাজ্যগুলি।

এই কারণেই গাভাইয়ের মন্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি হয়তো অর্থনীতিবিদ নন। কিন্তু কখনও কখনও একটি রাষ্ট্রের নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্য বিচার করতে অর্থনীতির সমীকরণের চেয়েও বেশি প্রয়োজন হয় সাধারণ বোধবুদ্ধির। আর সেই সাধারণ বোধবুদ্ধি বলছে—কোনও সমাজ দীর্ঘদিন ধরে কেবল ভোগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। উৎপাদন, পরিশ্রম, দক্ষতা ও সৃষ্টিশীলতাই শেষ পর্যন্ত একটি জাতির মেরুদণ্ড।

রাজনীতি যদি নাগরিককে ক্রমাগত কেবল গ্রহণ করতে শেখায়, সৃষ্টি করতে নয়, তবে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে দুর্বল হয়। অর্থনীতি ঋণে ডুবে যায়। প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ে। আর গণতন্ত্র একসময় নাগরিকের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে নয়, নির্ভরতাকেই পুরস্কৃত করতে শুরু করে।

সম্ভবত সেই আশঙ্কাই উচ্চারণ করেছিলেন বি আর গাভাই। তাঁর ভাষা হয়তো কঠোর ছিল। কিন্তু ভারতের রাজ্যগুলির আর্থিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক প্রবণতা এবং সামাজিক মনস্তত্ত্ব বিচার করলে বলা কঠিন নয় যে সতর্কবার্তাটি অমূলক ছিল না।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles