Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ারঃ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই দিনের বেজিং সফর শেষ করেছেন শুক্রবার, ১৫ মে। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠক হলেও, এয়ার ফোর্স ওয়ান আকাশে ওঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায় — তাইওয়ান, শুল্কযুদ্ধ এবং ইরান প্রশ্নে দুই দেশের মধ্যে কোনও কংক্রিট সমঝোতা হয়নি। যে সম্পর্ককে শি নিজেই বলেছিলেন “এই শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক”, তার জটিল, অমীমাংসিত বাস্তবতা ততক্ষণে আবার সামনে ফিরে এসেছে।

তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি: সম্পর্কের প্রথম বড় পরীক্ষা
ফেরার পথে ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানান, শি তাঁকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিলেন — তিনি তাইওয়ানকে রক্ষা করবেন কি না। ট্রাম্পের জবাব ছিল ইচ্ছাকৃতভাবেই অস্পষ্ট। তিনি বলেন, “এই প্রশ্নের উত্তর শুধু একজনই জানে। জানেন কে? আমি। একমাত্র আমিই জানি।” সঙ্গে যোগ করেন, “আমি বলেছি, ‘আমি এসব বিষয় নিয়ে কথা বলি না।'”
বৈঠকে শি স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করেন, তাইওয়ান প্রশ্নটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ” ইস্যু এবং এটি “সঠিকভাবে সামলানো না হলে” গোটা চীন-আমেরিকা সম্পর্ক “অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে” যেতে পারে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আমেরিকা তাইওয়ানের জন্য ১১০০ কোটি ডলারের একটি বড় অস্ত্রচুক্তি ঘোষণা করেছিল। পরে আরও ১৪০০ কোটি ডলারের দ্বিতীয় প্যাকেজটি স্থগিত রাখা হয়, যাতে এই শীর্ষ বৈঠক বিঘ্নিত না হয়। এই প্রশ্নটিই এখন শি-ট্রাম্প সম্পর্কের প্রথম বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
ট্রাম্প বলেন, তিনি শির সঙ্গে অস্ত্রচুক্তি নিয়ে “খুব বিস্তারিতভাবে” আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “আমি সিদ্ধান্ত নেব। কিন্তু এখন আমাদের শেষ যে জিনিসটা দরকার, সেটা হল ৯,৫০০ মাইল দূরে একটা যুদ্ধ।” তাইপেই সম্পর্কে তিনি বেজিংয়ের সুরে কথা বলেন — ইঙ্গিত দেন, এমন পরিস্থিতি কাম্য নয় যেখানে তাইওয়ান ভাবুক “আমেরিকা পাশে আছে বলেই স্বাধীনতা ঘোষণা করা যায়।” শুক্রবার রাতে সম্প্রচারিত ফক্স নিউজ সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এই মন্তব্য করেন।

শুল্ক আলোচনাতেই ওঠেনি
ট্রাম্প স্বীকার করেন, যে বিষয়টিকে কেন্দ্র করে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে চীননীতি আবর্তিত হয়েছে, সেই শুল্ক প্রশ্নটি এই বৈঠকে “আলোচনাতেই ওঠেনি।” তিনি বলেন, “আমরা শুল্ক নিয়ে কথা বলিনি। তারা শুল্ক দিচ্ছে, বড় অঙ্কের শুল্ক দিচ্ছে, কিন্তু আমরা সেটা নিয়ে আলোচনা করিনি।”
তবে দুই দেশ দুটি কাঠামো গঠনে সম্মত হয়েছে — “অ-সংবেদনশীল” ক্ষেত্রে বিনিয়োগের জন্য একটি “বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট” এবং প্রায় ৩০০০ কোটি ডলারের পণ্যের শুল্ক কমাতে একটি “বোর্ড অব ট্রেড।” এই সব ক্ষেত্রেই ট্রাম্প প্রশাসন উৎপাদন আমেরিকায় ফিরিয়ে আনতে আগ্রহী নয়।
ট্রাম্প যে “অসাধারণ বাণিজ্যচুক্তি”-র কথা বলেছেন, সেগুলির বাস্তবতা এখনও অনিশ্চিত। সবচেয়ে বড় দাবি — চীন বোয়িংয়ের ২০০টি বিমান কিনবে — সফর শেষ হওয়া পর্যন্ত বেজিং তা নিশ্চিত করেনি। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার আশা করছেন আগামী তিন বছরে প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি ডলারের কৃষিপণ্য কেনার চুক্তি হবে কিন্তু এরও আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ হয়নি।
ইরান: চীনের প্রতিশ্রুতি, কিন্তু নিশ্চিত নয়
শুক্রবার সকালে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, বেজিং তেহরানের কাছে অস্ত্র বিক্রি না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। চীন তা নিশ্চিত করেনি, বরং অস্ত্র বিক্রির অভিযোগই অস্বীকার করেছে। চীনা বিদেশ মন্ত্রক সংযত ভাষায় বলেছে, “এই সংঘাতের আর কোনও অর্থ নেই, এমন এক সংঘাত যা আদৌ ঘটার কথা ছিল না।”
ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে চীনের মধ্যস্থতার প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করেন — বলেন, “আমার কারও অনুগ্রহের দরকার নেই।” একই সঙ্গে ইঙ্গিত দেন, আমেরিকা ইরানে আবার হামলা শুরু করতে পারে। তিনি বলেন, “হয়তো আমাদের কিছু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে হবে, কারণ আমরা এক মাসের একটা যুদ্ধবিরতি পেয়েছিলাম।”
মানবাধিকার: জিমি লাই ও জিন মিংরি
ট্রাম্প জানান, তিনি হংকংয়ের বিরোধী গণমাধ্যম উদ্যোক্তা জিমি লাইয়ের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন, যাঁকে ফেব্রুয়ারিতে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। শি বলেছেন, লাইয়ের মামলা “কঠিন একটি বিষয়।” মার্কিন প্রতিনিধিদল আরেকটি মামলাও তুলেছিল — ২০২৫ সালের অক্টোবরে গ্রেফতার হওয়া প্রোটেস্ট্যান্ট গির্জার প্রতিষ্ঠাতা জিন মিংরির বিষয়টি। ট্রাম্পের দাবি, শি জানিয়েছেন তিনি এটি “গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবেন।”

প্রযুক্তি ও কৃষি: দুই দিকে দুই টান
চিপ বাণিজ্যে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। গত শীতে ওয়াশিংটন নীতিগতভাবে সম্মতি দিয়েছিল, যাতে চীনের প্রধান ইন্টারনেট কোম্পানিগুলি এনভিডিয়ার দ্বিতীয় সর্বাধিক শক্তিশালী এআই চিপ H200 কিনতে পারে। শীর্ষ বৈঠকের আগে বাইটড্যান্স — টিকটকের মূল সংস্থা — এবং ই-কমার্স জায়ান্ট আলিবাবাসহ প্রায় ১০টি কোম্পানিকে সেই অনুমতিও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বেজিং একই সঙ্গে নিজেদের কোম্পানিগুলিকে নির্দেশ দিয়েছে, মার্কিন চিপের ওপর নির্ভরতা যতটা সম্ভব কমাতে। ফলে এখন আমেরিকা বিক্রি করতে প্রস্তুত, কিন্তু চীনই কিনতে দ্বিধাগ্রস্ত।
কৃষি ক্ষেত্রেও ওয়াশিংটন এখনও প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায়। সফরের আগেই চীন ৪০০-রও বেশি মার্কিন গরুর মাংস উৎপাদক সংস্থার লাইসেন্স নবীকরণ করেছে, যেগুলির অনুমতি বাণিজ্যযুদ্ধের সময়ে শেষ হয়ে গিয়েছিল। তবে কেনাকাটার কোটা এখনও নির্ধারিত হয়নি। সয়াবিনের ক্ষেত্রেও বেজিং ক্রমশ ব্রাজিলের মতো “বন্ধুত্বপূর্ণ” দেশের দিকে ঝুঁকছে। গ্রিয়ার বলেন, “দীর্ঘমেয়াদে এটা তাদের জন্য সহায়ক হতে পারে বলেই আমরা মনে করি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত তাদেরই নিতে হবে।”
গোলাপ মিলল, উত্তর মিলল না
বেজিংয়ের ঝোংনানহাই প্রাসাদ-চত্বরের শান্ত উদ্যানে পাশাপাশি হেঁটেছেন দুই নেতা। নিষিদ্ধ নগরীর পাশেই অবস্থিত এই কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত চত্বরই চীনা শাসনব্যবস্থার প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্র। শি ট্রাম্পকে শতাব্দীপ্রাচীন গাছের গল্প শুনিয়েছেন, ট্রাম্প গোলাপ দেখে মুগ্ধ হয়ে বলেছেন “এগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর গোলাপ”, শি বীজ পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। শি ব্যাখ্যা করেন, ২০১৭ সালের বসন্তে ট্রাম্প যেমন তাঁকে ফ্লোরিডার মার-আ-লাগোয় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, প্রতিদান হিসেবেই এবার এই আমন্ত্রণ। লবস্টার বল, চিনাবাদাম-চিকেন আর ব্রাউনি দিয়ে মধ্যাহ্নভোজ শেষে ট্রাম্পের মোটরকেড বিমানবন্দরের দিকে রওনা হয়।
শি বলেন, তাঁরা “পরস্পরের উদ্বেগ যথাযথভাবে সমাধান করতে পেরেছেন।” ট্রাম্প বলেন, শি “প্রকৃত অর্থেই এক বন্ধু-তে” পরিণত হয়েছেন এবং তাঁরা একসঙ্গে “এমন অনেক সমস্যার সমাধান করেছেন যা অন্য কেউ করতে পারত না।” কিন্তু শি যে “গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা”-র ধারণাটি বারবার তুলেছেন ট্রাম্পকে একটি পূর্বানুমেয় ও স্থিতিশীল সম্পর্কে আবদ্ধ করার চীনা প্রয়াস হিসেবে, হোয়াইট হাউস সেটির কোনও উল্লেখই করেনি।
পরবর্তী গন্তব্য: ওয়াশিংটন, ২৪ সেপ্টেম্বর
ট্রাম্প শি-কে ২৪ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ঠিক দুই দিন পরে। শি তখন প্রথমে জাতিসংঘের মঞ্চে হাজির হবেন গ্লোবাল সাউথের নেতা ও বহুপাক্ষিক বিশ্বের সমর্থক হিসেবে, তারপর সেখান থেকে সরাসরি হোয়াইট হাউসে, সেই ট্রাম্পের অতিথি হয়ে, যিনি শি যে সমস্ত মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করেন, তারই সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ সমালোচক।