Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ারঃ বেজিংয়ে শি জিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই বৈঠকটি নিছক একটি কূটনৈতিক সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়। এটি আসলে এক অস্থির পৃথিবীর দুই প্রধান শক্তির মধ্যে এক ধরনের “সংকট-পরিচালনা বৈঠক”। বাহ্যিকভাবে লাল গালিচা, সামরিক কুচকাওয়াজ, শিশুদের করতালি, একুশ তোপের স্যালুট—সবই ছিল রাষ্ট্রীয় আড়ম্বরের অংশ। কিন্তু এই আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল ভয়, সন্দেহ এবং এক গভীর কৌশলগত দরকষাকষি।
তাইওয়ান প্রশ্নে শির হুঁশিয়ারি
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, শি জিনপিং তাইওয়ান প্রশ্নে যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা কেবল সতর্কবার্তা নয়, প্রায় হুমকির কাছাকাছি। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, তাইওয়ান ইস্যু “ভুলভাবে পরিচালিত” হলে দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষ পর্যন্ত হতে পারে এবং গোটা আমেরিকা-চীন সম্পর্ক “অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতি”-তে পৌঁছতে পারে। আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভাষায় এ ধরনের শব্দচয়ন সচরাচর ব্যবহার করা হয় না, যদি না কোনও রাষ্ট্র বুঝিয়ে দিতে চায় যে এটি তার চূড়ান্ত ‘রেড লাইন’।
বিশ্বব্যবস্থার পটপরিবর্তনে বেজিংয়ের হিসাব
এখানে মূল প্রশ্ন হল: কেন এই মুহূর্তে?
কারণ চীন বুঝতে পারছে, বিশ্বব্যবস্থা দ্রুত বদলাচ্ছে। পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকা ও ইজরায়েলের সামরিক অভিযান, হরমুজ প্রণালীর কার্যত অবরোধ, ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং বিশ্ব বাণিজ্যে অস্থিরতা—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের মনোযোগ এখন ছড়িয়ে রয়েছে বহু ফ্রন্টে। বেজিং মনে করছে, এই মুহূর্তে তাইওয়ান প্রশ্নে আমেরিকার উপর চাপ বাড়ানোর এটাই উপযুক্ত সময়।
অন্যদিকে ট্রাম্পের অবস্থানও জটিল। তিনি ব্যক্তিগত সম্পর্কের রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তাই শি-কে “গ্রেট লিডার” বলে প্রশংসা করেছেন এবং বলেছেন তাঁরা ফোনে কথা বলে সমস্যা মিটিয়ে নেন। কিন্তু এই ব্যক্তিগত রসায়ন বাস্তব ভূরাজনীতিকে মুছে দেয় না।
কারণ আমেরিকার কাছে তাইওয়ান শুধু একটি দ্বীপ নয়; এটি পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে আমেরিকান কৌশলগত উপস্থিতির কেন্দ্রবিন্দু। তাইওয়ান হারানো মানে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপিন্স—সমগ্র মার্কিন মিত্রব্যবস্থার উপর চীনের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়া।
১৯৪৯ সালের অসমাপ্ত হিসাব
চীনের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ উল্টো। তাদের কাছে তাইওয়ান কোনও “বিদেশি রাষ্ট্র” নয়, বরং অসমাপ্ত গৃহযুদ্ধের উত্তরাধিকার। ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট বিপ্লবের পর কুওমিনতাং সরকার তাইওয়ানে পালিয়ে যায়। সেই থেকে বেজিংয়ের কাছে “পুনরেকত্রীকরণ” জাতীয়তাবাদের কেন্দ্রীয় প্রতীক হয়ে উঠেছে। ফলে তাইওয়ান প্রশ্নে কোনও চীনা নেতা দুর্বলতা দেখালে তা তাঁর রাজনৈতিক বৈধতার উপরই সরাসরি আঘাত হানবে।
ইরান ও হরমুজ: প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েও পরস্পরের প্রয়োজন
এই বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল পশ্চিম এশিয়া। আমেরিকা এখন কার্যত চীনের সাহায্য চাইছে ইরানকে প্রভাবিত করার জন্য। এটিই বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার এক বড় বাস্তবতা: প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েও দুই দেশ একে অপরকে প্রয়োজন করছে। কারণ ইরানের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদার এখন চীন। বেজিং চাইলে তেহরানের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, আবার চাইলে তাকে আরও দৃঢ় সমর্থনও দিতে পারে।
হরমুজ প্রণালীর প্রসঙ্গটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য এই জলপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি বন্ধ থাকলে শুধু তেলের দামই বাড়বে না; গোটা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি, সরবরাহ সংকট এবং শিল্প উৎপাদনে ভয়াবহ ধাক্কা লাগবে। তাই আমেরিকা চাইছে চীন অন্তত এই বিষয়ে সহযোগিতা করুক।
চীনের সূক্ষ্ম কূটনীতি
কিন্তু এখানেই শি জিনপিংয়ের কৌশল অত্যন্ত সূক্ষ্ম। চীনা সরকারি বিবৃতিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বা হরমুজ প্রণালী খোলার বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি। অর্থাৎ বেজিং ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের অবস্থান অস্পষ্ট রেখেছে। এটি চীনের পুরনো কূটনৈতিক কৌশল—সব দরজা খোলা রাখা, কিন্তু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কোনও পক্ষের সঙ্গে সম্পূর্ণ অঙ্গীকার না করা।
বাণিজ্যকে অস্ত্র বানাচ্ছে চীন
বাণিজ্যের দিক থেকেও বৈঠকটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। চীন যে আমেরিকান গরুর মাংস আমদানির অনুমতি পুনরায় দিল, তা নিছক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি এক ধরনের রাজনৈতিক সংকেত। বেজিং বোঝাতে চাইছে যে তারা সম্পর্ককে পুরোপুরি সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দিতে চায় না।
একইসঙ্গে বিরল খনিজ রপ্তানি বিধিনিষেধ স্থগিত রাখার প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আধুনিক প্রযুক্তি শিল্প—সেমিকন্ডাক্টর থেকে বৈদ্যুতিক গাড়ি পর্যন্ত—চীনা বিরল খনিজের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এই অস্ত্র ব্যবহার করলে বিশ্ব সরবরাহ শৃঙ্খল ভয়াবহ ধাক্কা খাবে।
মানবাধিকার প্রান্তে, ভূরাজনীতি কেন্দ্রে
মানবাধিকার প্রসঙ্গটি তুলনামূলকভাবে প্রান্তে চলে গিয়েছে। জিমি লাইয়ের নাম ট্রাম্প তুলতে পারেন, কিন্তু উইঘুর দমননীতি বা হংকংয়ের স্বাধীনতা সংকোচনের মতো বিষয়গুলি এখন আর আমেরিকার প্রধান অগ্রাধিকার বলে মনে হচ্ছে না। বাস্তববাদী ভূরাজনীতি প্রায়শই নীতিগত প্রশ্নকে পিছনে ঠেলে দেয়। ওয়াশিংটনের কাছে এখন বেশি জরুরি—যুদ্ধ এড়ানো, বাণিজ্যিক প্রবাহ বজায় রাখা এবং জ্বালানি সংকট সামাল দেওয়া।
নিয়ন্ত্রিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা: বেজিং বৈঠকের আসল সারমর্ম
সব মিলিয়ে এই বৈঠকটি এক অদ্ভুত দ্বৈততার প্রতীক। একদিকে প্রকাশ্য হাসি, সৌজন্য, রাষ্ট্রীয় আড়ম্বর; অন্যদিকে গভীর অবিশ্বাস, কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং সম্ভাব্য সংঘর্ষের ছায়া। দুই দেশই জানে তারা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু একইসঙ্গে এটাও জানে যে সরাসরি সংঘর্ষের মূল্য এত ভয়াবহ হবে যে আপাতত কেউই সেই পথে হাঁটতে চায় না।
তাই এই বেজিং সম্মেলনের আসল সারমর্ম সম্ভবত একটি বাক্যেই ধরা যায়: সহযোগিতা নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
পারস্পরিক ভয় ও পারস্পরিক প্রয়োজন—এই দুই বিপরীত টানের মাঝে দাঁড়িয়ে দুই পরাশক্তি এখন এক অস্থির সহাবস্থানের চেষ্টা করে যাচ্ছে।