Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ারঃ মুকেশ আম্বানির রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ-কে বোঝার সবচেয়ে ভালো উপায় সম্ভবত এটিকে একটি কোম্পানি হিসেবে না দেখে, আধুনিক ভারতের ভেতরে গড়ে ওঠা একটি সমান্তরাল রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে দেখা। এমন এক কর্পোরেট সাম্রাজ্য, যা শুধু তেল শোধনাগার বা মোবাইল নেটওয়ার্ক চালায় না; বরং কোটি কোটি ভারতীয়ের দৈনন্দিন জীবনের ভেতরে প্রবেশ করেছে—ফোনের ডেটা, সিনেমা দেখা, মুদি দোকান, ডিজিটাল পেমেন্ট, অনলাইন বিনোদন, বিদ্যুৎ, এমনকি ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পর্যন্ত।
আগামী মাসগুলিতে যখন জিও প্ল্যাটফর্মস-এর আইপিও বাজারে আসবে, সেটি কেবল ভারতের ইতিহাসে বৃহত্তম শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি হবে না; সেটি হবে এক দশক ধরে চলা আম্বানির এক বিশাল অর্থনৈতিক রূপান্তর প্রকল্পের প্রতীকী মুহূর্ত। প্রত্যাশা করা হচ্ছে, জিওর মূল্যায়ন দাঁড়াবে প্রায় ১৩০ থেকে ১৫০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, একসময় যে সংস্থা মূলত পেট্রোকেমিক্যাল ও তেল ব্যবসার উপর দাঁড়িয়ে ছিল, তার ডিজিটাল বাহুই এখন প্রায় একটি স্বাধীন প্রযুক্তি-রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
রিলায়েন্সের বিস্তার: এক অন্যরকম সাম্রাজ্য
ভারতে বড় শিল্পগোষ্ঠীর অভাব নেই। টাটা গ্রুপ বহুদিন ধরেই ভারতীয় কর্পোরেট জগতের সবচেয়ে বিস্তৃত নাম। কিন্তু রিলায়েন্সের বিস্তার অন্যরকম। এটি এমন এক কোম্পানি, যার উপস্থিতি একইসঙ্গে দেশের সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগারে, প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনে, মোবাইল টাওয়ারে, শপিং মলে, মুদি দোকানে এবং এখন ডেটা সেন্টারেও।
এই রূপান্তরের কেন্দ্রীয় চরিত্র মুকেশ আম্বানি নিজে। তাঁর ব্যবসায়িক দর্শন গত দুই দশকে বেশ স্পষ্ট হয়েছে: বাজারে প্রবেশ করতে হলে ছোট করে নয়, বরং প্রতিপক্ষকে আতঙ্কিত করার মতো আকারে প্রবেশ করতে হবে। প্রথমে বিপুল বিনিয়োগ করে বিশ্বমানের অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। তারপর দীর্ঘ সময় লোকসান মেনে নিয়ে গ্রাহকদের এত সস্তায় পরিষেবা দিতে হবে যে প্রতিযোগীরা টিকতেই না পারে।
জিওর জন্ম: এক অর্থনৈতিক অবরোধ যুদ্ধ
২০১৬ সালে জিওর সূচনা সেই কৌশলের সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ। তখন ভারতের মোবাইল বাজারে ডজনখানেক কোম্পানি ছিল। ডেটা ছিল ব্যয়বহুল, স্মার্টফোন এখনও সর্বত্র পৌঁছায়নি। জিও এসে কয়েক মাস প্রায় বিনামূল্যে ডেটা দিল। তারপরে এত কম দামে পরিষেবা দিল যে পুরো শিল্পক্ষেত্রটাই ভেঙে পড়ল। কয়েক বছরের মধ্যে ডেটার দাম প্রায় ৯৫ শতাংশ কমে যায়। বহু কোম্পানি বাজার থেকে বিদায় নেয়। শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে মাত্র তিনটি বড় অপারেটর, আর জিও একাই ৩৭ কোটিরও বেশি গ্রাহক পেয়ে যায়।
আম্বানি জানতেন, তাঁর কাছে যে পরিমাণ মূলধন আছে, প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে তা নেই। তাই তিনি সময় কিনেছিলেন। ক্ষতি সহ্য করেছিলেন। আর অপেক্ষা করেছিলেন প্রতিপক্ষের রক্তক্ষরণের জন্য।
খুচরো ব্যবসাতেও তিনি প্রায় একই মডেল প্রয়োগ করেন। ২০১৭ সালের পর থেকে রিলায়েন্স হাজার হাজার দোকান খুলেছে। আজ তাদের স্টোর সংখ্যা ১৯ হাজারের বেশি। ভারতের শহর ও মফস্বলে যে গতিতে তারা বিস্তার ঘটিয়েছে, তা অনেকটা আমেরিকার ওয়ালমার্ট অথবা চীনের আলিবাবা-ধাঁচের একটি দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক তৈরির প্রচেষ্টা।
উদ্ভাবনের প্রশ্ন: শক্তি ও সীমাবদ্ধতা
কিন্তু এখানেই রিলায়েন্সের গল্প জটিল হয়ে ওঠে। কারণ কোম্পানিটি অবকাঠামো নির্মাণে অসাধারণ দক্ষ হলেও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে এখনও পুরোপুরি সফল হয়নি। জিওর সাফল্যের মূলে মূলত সস্তা ডেটা ও নেটওয়ার্ক বিস্তার। তাদের স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের শক্তিও এসেছে ডিজনির মালিকানাধীন হটস্টারের সঙ্গে একীভূত হওয়ার ফলে।
রিটেল ক্ষেত্রেও তারা অ্যাপ-নির্ভর দ্রুত বাণিজ্যে এখনও অনেক প্রতিদ্বন্দ্বীর থেকে পিছিয়ে। ভারতের নতুন প্রজন্মের কুইক-কমার্স স্টার্টআপগুলি যেখানে প্রযুক্তি, অ্যালগরিদম এবং ব্যবহারকারীর আচরণ বিশ্লেষণের উপর দাঁড়িয়ে এগোচ্ছে, সেখানে রিলায়েন্স এখনও অনেক বেশি বাস্তব অবকাঠামোনির্ভর।
এআই: সবচেয়ে বড় বাজি
এখন আম্বানির নতুন বাজি—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এবং এটিই সম্ভবত তাঁর সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী, আবার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ।
এনভিডিয়ার সঙ্গে অংশীদারিত্ব করে ভারতীয় ভাষাভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল তৈরির ঘোষণা, মেটার বিনিয়োগ, এবং আগামী সাত বছরে প্রায় ১১০ বিলিয়ন ডলার ডেটা সেন্টারে ব্যয়ের পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে রিলায়েন্স স্পষ্টতই বুঝিয়ে দিচ্ছে যে তারা ভারতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামোর কেন্দ্র হতে চায়।
জামনগরে যে ডেটা সেন্টার গড়ে উঠছে, সেটি শুধু একটি প্রযুক্তি প্রকল্প নয়; সেটি এক ধরনের ভূ-রাজনৈতিক প্রকল্পও। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ডেটা সেন্টার, বিদ্যুৎ, চিপ, ভাষা-মডেল—এসবই নতুন যুগের শিল্পভিত্তি।
আম্বানির লক্ষ্য এখানে আবারও পুরনো: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ভারতের জনগণের জন্য সস্তা করে দেওয়া, যেমন তিনি মোবাইল ডেটার ক্ষেত্রে করেছিলেন। গুগলের সঙ্গে অংশীদারিত্ব করে জিও ব্যবহারকারীদের বিনামূল্যে প্রিমিয়াম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিষেবা দেওয়ার পরিকল্পনাও সেই বৃহত্তর কৌশলের অংশ।
কিন্তু এই ক্ষেত্রটি টেলিকমের মতো নয়। এখানে শুধু টাকা ঢাললেই জয় নিশ্চিত হয় না।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পের প্রকৃত সম্পদ হচ্ছে মানব প্রতিভা—উচ্চমানের গবেষক, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, মডেল স্থপতি। আর এখানেই প্রশ্ন উঠছে: রিলায়েন্সের মতো ঐতিহ্যগতভাবে আমলাতান্ত্রিক ও ঊর্ধ্বতন-নির্ভর কর্পোরেট কাঠামো কি সৃজনশীল প্রযুক্তি প্রতিভাকে আকর্ষণ করতে পারবে?
একটি তেল শোধনাগার পরিচালনা এবং একটি বিশ্বমানের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গবেষণা ল্যাব চালানো সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের সাংগঠনিক সংস্কৃতি দাবি করে। প্রথমটির জন্য প্রয়োজন শৃঙ্খলা, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণ। দ্বিতীয়টির জন্য প্রয়োজন ব্যর্থতা মেনে নেওয়ার মানসিকতা, পরীক্ষামূলক সংস্কৃতি এবং তুলনামূলকভাবে বিকেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্তগ্রহণ।
উত্তরাধিকার ও রাজনৈতিক পুঁজি
আরও বড় প্রশ্ন উত্তরাধিকারের।
২০০২ সালে ধীরুভাই আম্বানির মৃত্যুর পরে মুকেশ ও অনিল আম্বানির মধ্যে প্রকাশ্য সংঘর্ষ হয়েছিল। সেই পারিবারিক বিভাজন ভারতের কর্পোরেট ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় অধ্যায়। অনিলের সাম্রাজ্যের বড় অংশ শেষ পর্যন্ত ধসে পড়ে।
মুকেশ এবার সেই ভুল এড়াতে চেয়েছেন। তাঁর তিন সন্তান আকাশ, ঈশা এবং অনন্ত ইতিমধ্যে আলাদা আলাদা ব্যবসা বিভাগের দায়িত্ব পেয়েছেন। কিন্তু তাতেও নিশ্চয়তা নেই। কারণ রিলায়েন্সের ভিতরে এখনও প্রায় সব বড় সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত মুকেশ আম্বানির টেবিলে গিয়ে পৌঁছায়।
ভারতের মতো দেশে এত বড় শিল্পগোষ্ঠী কখনওই শুধু বাজারের শক্তিতে পরিচালিত হয় না। নীতি, লাইসেন্স, জমি, জ্বালানি, টেলিকম স্পেকট্রাম, অবকাঠামো সবকিছুই রাষ্ট্রের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের উপর নির্ভরশীল। মুকেশ আম্বানি গত দুই দশকে সেই সম্পর্ককে দক্ষতার সঙ্গে নির্মাণ করেছেন। কিন্তু রাজনৈতিক পুঁজি উত্তরাধিকারসূত্রে সহজে স্থানান্তরিত হয় না।
তবু বিনিয়োগকারীরা এখনও তাঁকে বিশ্বাস করছেন। কারণ গত দুই দশকের অভিজ্ঞতা বলছে, ভারতের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কোথায় যাচ্ছে তা আম্বানি অনেক সময় অন্যদের আগেই বুঝতে পারেন। তিনি শুধু শিল্প তৈরি করেন না; বাজারের নিয়মই বদলে দেন।
এবং সম্ভবত এই কারণেই রিলায়েন্স এখন আর কেবল একটি কোম্পানি নয়। এটি আধুনিক ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, বৈপরীত্য, কেন্দ্রীভূত পুঁজি এবং প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের প্রতীক। যতদিন মুকেশ আম্বানি নিয়ন্ত্রণে আছেন, ততদিন বাজার বিশ্বাস করতে চাইবে—আরও একটি বিশাল বাজিও হয়তো শেষ পর্যন্ত সফল হবে।