Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ারঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বহুদিন ধরেই “আয়ুষ্মান ভারত” শুধু একটি স্বাস্থ্য প্রকল্প ছিল না, ছিল এক রাজনৈতিক প্রতীকও। দিল্লির সঙ্গে কলকাতার টানাপোড়েন, কেন্দ্র বনাম রাজ্যের কৃতিত্বের লড়াই, এবং কল্যাণমূলক রাজনীতির প্রতিযোগিতা—সবকিছুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে এই প্রকল্পটি বছরের পর বছর বাংলায় আটকে ছিল। অবশেষে সেই অচলাবস্থার অবসান হতে চলেছে। নতুন রাজ্য সরকার ঘোষণা করেছে, পশ্চিমবঙ্গে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প চালু হবে। একই সঙ্গে আপাতত চালু থাকবে রাজ্যের নিজস্ব “স্বাস্থ্যসাথী” প্রকল্পও।
কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি রাজনৈতিক নয়। প্রশ্নটি অনেক বেশি সরল: এতে আসলে কার কী লাভ হবে?
আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পটি কী?
সরকারি নাম “আয়ুষ্মান ভারত প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা” বা AB-PMJAY। ২০১৮ সালে নরেন্দ্র মোদী সরকার এটি চালু করে। মূল উদ্দেশ্য ছিল—দারিদ্র্য বা নিম্নআয়ের কারণে যাতে কোনও পরিবার বড় চিকিৎসার খরচে ভেঙে না পড়ে। প্রকল্পটি মূলত হাসপাতালভিত্তিক স্বাস্থ্যবিমা। অর্থাৎ জ্বর-সর্দির মতো সাধারণ চিকিৎসা নয়, বড় অসুখ, অস্ত্রোপচার, ক্যানসার, হৃদরোগ, গুরুতর দুর্ঘটনা বা দীর্ঘ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে এই প্রকল্প সাহায্য করে।
এই প্রকল্পে বছরে পরিবারপিছু পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা কভার পাওয়া যায়। সরকারি ও তালিকাভুক্ত বেসরকারি—দুই ধরনের হাসপাতালেই ক্যাশলেস চিকিৎসার সুযোগ থাকে। অর্থাৎ রোগীর পরিবারকে কাউন্টারে দাঁড়িয়ে টাকা মেটাতে হয় না; হাসপাতাল সরাসরি প্রকল্পের মাধ্যমে টাকা পায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এটি “পোর্টেবল”। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের কোনও ব্যক্তি চাইলে দিল্লি, মুম্বই, ভেলোর বা হায়দরাবাদের তালিকাভুক্ত হাসপাতালে গিয়েও চিকিৎসা করাতে পারবেন। দেশের এক রাজ্যের কার্ড অন্য রাজ্যেও কাজ করবে। বহু পরিযায়ী শ্রমিক পরিবারের কাছে এটাই এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে।
কারা এই সুবিধা পাবেন?
এখানেই আয়ুষ্মান ভারত ও স্বাস্থ্যসাথীর মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য।
আয়ুষ্মান ভারত মূলত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলির জন্য তৈরি। কেন্দ্রীয় সরকারের কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থ-সামাজিক ও জাতিগত জনগণনা (SECC) ডেটাবেস অনুযায়ী নির্দিষ্ট সামাজিক ও অর্থনৈতিক মানদণ্ডে পরিবার বাছাই করা হয়। গ্রামে জমিহীন শ্রমিক, কাঁচা বাড়িতে থাকা পরিবার, অত্যন্ত কম আয়ের মানুষ—এরা অগ্রাধিকার পান। শহরে নির্দিষ্ট পেশার শ্রমজীবী মানুষও এই তালিকায় থাকেন।
তবে পরে প্রকল্পটি আরও বিস্তৃত হয়েছে। ২০২৪ সালে কেন্দ্র ঘোষণা করে, ৭০ বছরের বেশি বয়সি সব প্রবীণ নাগরিক, আয়ের স্তর নির্বিশেষে এই প্রকল্পের আওতায় আসতে পারবেন।
অর্থাৎ, আয়ুষ্মান ভারত “সবার জন্য” স্বাস্থ্যবিমা নয়। এটি মূলত লক্ষ্যভিত্তিক বা targeted welfare scheme।
অন্যদিকে স্বাস্থ্যসাথী ছিল অনেক বেশি সর্বজনীন প্রকৃতির। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার এটিকে প্রায় “ইউনিভার্সাল” প্রকল্প হিসেবে গড়ে তুলেছিল। বহু মধ্যবিত্ত পরিবারও এর আওতায় এসেছে। পরিবারের মহিলাকে প্রধান কার্ডহোল্ডার করা হয়েছিল। পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত কভার সেখানেও ছিল।
কাগজে-কলমে দুটি প্রকল্পের কভারেজ অনেকটাই একরকম শোনালেও দর্শনগত পার্থক্য ছিল গভীর। আয়ুষ্মান ভারত দরিদ্র-কেন্দ্রিক। স্বাস্থ্যসাথী ছিল রাজনৈতিকভাবে আরও বিস্তৃত সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প।
তাহলে এখন কী হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। কারণ সরকার নীতিগত ঘোষণা করেছে বটে, কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নের রূপরেখা এখনও তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন হাসপাতাল ইতিমধ্যেই আয়ুষ্মান ভারত ব্যবস্থায় ঢোকার প্রস্তুতি শুরু করেছে।
নতুন সরকার বলছে, আপাতত স্বাস্থ্যসাথী বন্ধ করা হচ্ছে না। দুই প্রকল্পই কিছুদিন পাশাপাশি চলবে। যাঁরা আয়ুষ্মান ভারতের যোগ্য নন, তাঁরা স্বাস্থ্যসাথীতে থাকতে পারেন।
কিন্তু বাস্তবে এই “দুটি প্রকল্প একসঙ্গে” চালানো খুব সহজ হবে না।
কারণ একই রোগী, একই হাসপাতাল, একই ধরনের চিকিৎসা—কিন্তু দুটি আলাদা বিলিং সিস্টেম, আলাদা প্রশাসনিক কাঠামো, আলাদা টাকা ছাড়ের ব্যবস্থা। স্বাস্থ্য অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় overlap and duplication problem। হাসপাতালগুলিও এখন অপেক্ষা করছে চূড়ান্ত নির্দেশিকার জন্য। অনেক হাসপাতাল মনে করছে, আগামী কয়েক মাসে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যসাথীকে সরিয়ে আয়ুষ্মান ভারতই মূল কাঠামো হয়ে উঠবে।
তবে একটি বাস্তব সমস্যাও আছে। বহু বেসরকারি হাসপাতাল দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করেছে যে স্বাস্থ্যসাথীতে প্যাকেজ রেট কম এবং টাকা পেতে দেরি হয়। সেই কারণেই সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কিছু হাসপাতাল স্বাস্থ্যসাথীর রোগী নেওয়া কমিয়ে দিয়েছে।
আয়ুষ্মান ভারত এলে হাসপাতালগুলি তুলনামূলক বেশি স্বস্তি পেতে পারে, কারণ এটি একটি বৃহৎ কেন্দ্রীয় কাঠামোর অধীনে চলে। কিন্তু রোগীদের কাছে পরিবর্তনের সময়টা বিভ্রান্তিকরও হতে পারে। কার কার্ড চলবে, কোথায় চলবে, কোন হাসপাতালে কোন প্রকল্প গ্রহণ করা হবে—এসব নিয়ে প্রথম কয়েক মাসে অনিশ্চয়তা থাকাই স্বাভাবিক।
রাজনীতির নতুন অধ্যায়
এই পুরো ঘটনাটির রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বহু বছর আগে আয়ুষ্মান ভারত থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, রাজ্য ৪০ শতাংশ টাকা দেবে অথচ কৃতিত্ব নেবে কেন্দ্র। পরিবর্তে তিনি স্বাস্থ্যসাথীকে বাংলার নিজস্ব ব্র্যান্ড হিসেবে দাঁড় করান।
এখন সেই অবস্থান উল্টে যাচ্ছে। নতুন সরকার বলছে, বাংলার মানুষ দেশের বাকি অংশের মতো একই জাতীয় স্বাস্থ্যসুবিধা পাবেন।
অর্থাৎ, এই পরিবর্তন শুধু স্বাস্থ্যনীতি নয়, এটি বাংলার রাজনৈতিক পরিবর্তনেরও প্রতীক। এক যুগের “রাজ্য-কেন্দ্র সংঘাতের কল্যাণনীতি” থেকে আরেক যুগের “কেন্দ্র-সমন্বিত কল্যাণনীতি”-তে প্রবেশ।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হয়তো খুব সাধারণ।
রোগী যখন হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকেন, তখন তিনি ভাবেন না কার ছবি কার্ডে আছে। তিনি শুধু জানতে চান—চিকিৎসা হবে তো? টাকা জোগাড় করতে জমি বিক্রি করতে হবে না তো?
বাংলার স্বাস্থ্যরাজনীতির নতুন অধ্যায় এখন সেই প্রশ্নেরই উত্তর দিতে চলেছে।