বাংলাস্ফিয়ারঃ পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্যগুলির একটি হয়তো বিধানসভার ভেতরে নয়, তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরমহলে তৈরি হচ্ছে। ভোটে বড় ধাক্কার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় যে বার্তা দিতে চাইছেন, তা শুধু বিরোধীদের উদ্দেশে নয়, নিজের দলকেও। আর সেই বার্তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত: “পুরোনোদের” আবার দরকার পড়েছে।
দলের নতুন বিধানসভা টিম গঠনে অনেকের নজর গিয়েছিল কারা জায়গা পেলেন, তার চেয়েও বেশি কারা পেলেন না। বিশেষ করে, অভিষেক বন্দোপাধ্যায়-ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত একাধিক মুখকে সামনে না আনা রাজনৈতিক মহলে নতুন জল্পনা তৈরি করেছে। গত কয়েক বছরে তৃণমূলের ভেতরে যে “নতুন শক্তিকেন্দ্র” তৈরি হয়েছিল যেখানে নির্বাচনী কৌশল, ডিজিটাল প্রচার, সাংগঠনিক পুনর্গঠন, প্রার্থী বাছাই থেকে শুরু করে জনসংযোগ পর্যন্ত অনেক কিছুতেই অভিষেকপন্থীদের প্রভাব বাড়ছিল, সেই প্রবাহে যেন আচমকা একটি ব্রেক কষা হয়েছে।
এটি কেবল দলীয় সমীকরণের সাময়িক পরিবর্তন নয়। বরং এটি ক্ষমতাহ্রাসের পর রাজনৈতিক নেতৃত্বের স্বাভাবিক প্রবৃত্তির একটি ক্লাসিক উদাহরণ। যখন কোনও নেতা প্রবল আত্মবিশ্বাসে থাকেন, তখন তিনি নতুন মুখ, পরীক্ষামূলক কৌশল, আগ্রাসী সংগঠন—এসবের উপর নির্ভর করেন। কিন্তু যখন ক্ষমতা টলতে শুরু করে, তখন নেতারা প্রায়শই ফিরে যান “পরীক্ষিত” মানুষদের কাছে। কারণ রাজনৈতিক সঙ্কটের সময়ে আনুগত্য, অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিগত বিশ্বাসযোগ্যতা—এই তিনটি জিনিস হঠাৎ করেই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতিতে “ওল্ড গার্ড” বলতে আসলে এক ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বোঝায়। এঁরা হয়তো টেলিভিশনে খুব জোরে কথা বলেন না, সোশ্যাল মিডিয়ায় খুব সক্রিয় নন, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে দল চালানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে। অনেকেই সিপিএমের বিরুদ্ধে রাস্তায় আন্দোলনের সময় থেকে মমতার সঙ্গে আছেন। তাঁরা জানেন দল কীভাবে বিপদের সময় বাঁচিয়ে রাখতে হয়। তাঁদের রাজনীতি অনেক বেশি সাংগঠনিক, স্থানীয় এবং সম্পর্কনির্ভর।
অন্যদিকে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান ছিল অনেকটাই ভিন্ন ধরনের। সেখানে ছিল কর্পোরেট-ধাঁচের রাজনৈতিক ম্যানেজমেন্ট, ডেটা-নির্ভর প্রচার, তরুণ নেতৃত্ব, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং “ইমেজ কন্ট্রোল”-এর উপর জোর। অনেকের মতে, ২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপির প্রবল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই মডেল কার্যকর হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দলীয় অন্দরে অভিযোগও জমতে থাকে—দলের পুরোনো স্তরের নেতারা ক্রমশ উপেক্ষিত হচ্ছেন, সিদ্ধান্ত কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, এবং “অ্যাক্সেস” নির্ভর এক নতুন ক্ষমতাকাঠামো তৈরি হচ্ছে।
সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফল সেই অসন্তোষকে আরও সামনে এনে দিয়েছে। তৃণমূলের ভেতরে এখন একটি নীরব বিতর্ক চলছে—দলের ক্ষয় কি বিরোধীদের আক্রমণে হয়েছে, নাকি ভিতর থেকেই বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছিল? গ্রামীণ স্তরে অনেক পুরোনো সংগঠক অভিযোগ করছেন, তাঁরা আর আগের মতো গুরুত্ব পাননি। স্থানীয় নেতাদের বদলে “ম্যানেজড পলিটিক্স” বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক প্রবৃত্তি বরাবরই অত্যন্ত বাস্তববাদী। তিনি কখনও পুরোপুরি কাউকে ভরসা করেন না, আবার পুরোপুরি কাউকে বাতিলও করেন না। তাঁর রাজনীতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো—ক্ষমতার ভারসাম্য নিজের হাতে রাখা। তাই আজ যদি তিনি পুরোনোদের দিকে ঝুঁকে থাকেন, সেটি অভিষেককে সম্পূর্ণ সরিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত নাও হতে পারে। বরং এটি হয়তো একটি “রিসেট।” একটি বার্তা যে, দলের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ এখনও তাঁর হাতেই রয়েছে।
তবে এই পরিবর্তনের মধ্যে একটি গভীর প্রজন্মগত টানাপোড়েনও লুকিয়ে আছে। তৃণমূল এখন এমন এক দলে পরিণত হয়েছে যেখানে একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক ভাষা সহাবস্থান করছে। একদিকে আন্দোলন-ভিত্তিক পুরোনো তৃণমূল, অন্যদিকে নির্বাচনী যন্ত্র হিসেবে গড়ে ওঠা আধুনিক তৃণমূল। এই দুই সংস্কৃতির মধ্যে সংঘর্ষ এখন আর চাপা নেই।
বিজেপির উত্থান এই দ্বন্দ্বকে আরও তীব্র করেছে। কারণ বিরোধী হিসেবে বিজেপি শুধু ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনি; তারা তৃণমূলের সাংগঠনিক দুর্বলতাগুলিকেও প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে। যখন কোনও দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকে, তখন তার ভেতরে একটি “দরবারি সংস্কৃতি” তৈরি হয়। সবাই নেতৃত্বকে খুশি রাখতে ব্যস্ত থাকে, খারাপ খবর কেউ পৌঁছে দিতে চায় না। ফলে বাস্তব পরিস্থিতি এবং নেতৃত্বের ধারণার মধ্যে ফারাক তৈরি হয়। তৃণমূলের ক্ষেত্রেও অনেক পর্যবেক্ষক এখন সেই কথাই বলছেন।
এই কারণেই “ওল্ড গার্ড”-এ ফেরা শুধুমাত্র আবেগের সিদ্ধান্ত নয়; এটি তথ্যগত আস্থার প্রশ্নও। মমতা হয়তো মনে করছেন, যাঁরা বহু বছর ধরে মাঠে রাজনীতি করেছেন, তাঁদের রাজনৈতিক অনুভূতি এখনও বেশি নির্ভরযোগ্য। তাঁরা অন্তত “ভুল রিপোর্ট” দিয়ে নেতৃত্বকে খুশি করার চেষ্টা কম করেন।
কিন্তু এই কৌশলেরও ঝুঁকি আছে। কারণ শুধুমাত্র পুরোনোদের উপর নির্ভর করলে দল স্থবির হয়ে পড়তে পারে। নতুন প্রজন্মের নেতাদের মধ্যে হতাশা বাড়তে পারে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় গত কয়েক বছরে দলের তরুণ কর্মীদের কাছে একটি আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছিলেন। তাঁর আক্রমণাত্মক ভাষা, সাংগঠনিক সক্রিয়তা এবং কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই করার ভঙ্গি অনেকের কাছে তৃণমূলের ভবিষ্যতের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। সেই শিবির যদি মনে করে তাদের পরিকল্পিতভাবে দূরে সরানো হচ্ছে, তাহলে ভবিষ্যতে দলীয় অস্বস্তি আরও বাড়তে পারে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি অন্য জায়গায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি এখন উত্তরসূরি তৈরির রাজনীতি থেকে সাময়িকভাবে সরে এসে আবার “একক নিয়ন্ত্রণের” রাজনীতিতে ফিরছেন? সাম্প্রতিক ঘটনাবলি অন্তত সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
ভারতীয় আঞ্চলিক রাজনীতিতে এটি নতুন কিছু নয়। প্রায় সব বড় আঞ্চলিক দলেই দেখা যায়, যখন উত্তরসূরি খুব দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠেন, তখন মূল নেতার চারপাশে থাকা পুরোনো শক্তিগুলি অস্বস্তিতে পড়ে। তারা আবার মূল নেতার কাছাকাছি আসার চেষ্টা করে। পশ্চিমবঙ্গেও এখন সেই দৃশ্য স্পষ্ট।
ফলে তৃণমূলের এই মুহূর্তটি শুধু একটি দলীয় পুনর্গঠন নয়; এটি আসলে ক্ষমতা, উত্তরাধিকার, আনুগত্য এবং রাজনৈতিক নিরাপত্তার জটিল লড়াই। বাইরে থেকে দেখলে এটি হয়তো কেবল “কাদের জায়গা হলো, কাদের হলো না”—এই খবর। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এটি একটি বড় প্রশ্নের সূচনা: মমতার পর তৃণমূল কেমন হবে?
এবং আপাতত মনে হচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও প্রস্তুত নন।