3
বাংলাস্ফিয়ার: দুই প্রার্থী, দুই শিবির, এবং একটি কেন্দ্র যেখানে বাংলার ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে বলে উভয়পক্ষই মনে করেন।
ভোর হওয়ার আগেই ভবানীপুর জেগে উঠেছিল। এপ্রিলের শেষ বুধবারে কলকাতার এই পুরনো পাড়ায় ভোর-ভোর একটা অস্থিরতা ছিল, যে ধরনের অস্থিরতা মানুষ অনুভব করে যখন জানে যে আজকের দিনটা নিছক সাধারণ নয়। চেতলার গলিতে চায়ের দোকান খোলার আগেই কেন্দ্রীয় বাহিনীর বুটের শব্দ শোনা গিয়েছে। পাশের বাড়ির বারান্দায় কেউ একজন বাইরে উঁকি মেরে দেখে নিয়েছেন পরিস্থিতি। রাজনৈতিক মানচিত্রে ভবানীপুর সবসময়ই ছিল একটি বিশেষ বিন্দু — মুখ্যমন্ত্রীর নিজের কেন্দ্র, তাঁর রাজনৈতিক আঁতুড়ঘর। কিন্তু ২০২৬ সালে এই কেন্দ্রটি আর শুধু একটি বিধানসভা আসন নয়; এটি একটি রূপক, একটি পরীক্ষা, এবং দুই পক্ষের কাছেই একটি যুদ্ধক্ষেত্র।
সকাল সাতটায় ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার আগেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চেতলায় গাড়িতে উঠে বসেছিলেন। এটা অস্বাভাবিক। সাধারণত ভোটের দিন বাড়িতেই থাকেন তিনি, বাড়ি থেকেই ভোট সংক্রান্ত খবরাখবর রাখেন। কিন্তু এবার ভিন্ন ছবি। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দিলেন, সারাদিন বুথে বুথে ঘুরবেন। তাঁর হাতের ব্যাগ, তাঁর চপ্পল, তাঁর সেই চিরপরিচিত সাদা শাড়ি — সব কিছু নিয়ে তিনি মাঠে নামলেন এমন একজন মানুষের ভঙ্গিতে যিনি জানেন আজ একটু বেশি সতর্ক থাকতে হবে।
ভবানীপুরে বুথ পরিদর্শনে বেরিয়েই নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিলেন তিনি। ক্যামেরার সামনে তাঁর গলায় সেই পরিচিত তীক্ষ্ণতা — “বিজেপি যা বলছে, নির্বাচন কমিশন ঠিক তাই করছে।” রাত্রের ঘটনাগুলো তখনও তাঁর মাথায় টগবগ করছে। ফিরহাদ হাকিমের বাড়িতে মাঝরাতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর হানা, মহিলাদের আতঙ্কিত হয়ে পড়া — এই সব নিয়ে সরব হলেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে রাগ ছিল, কিন্তু সেই রাগের পেছনে একটি হিসেবও ছিল — প্রতিটি শব্দ যেন ভোটারের কানে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।
সকালবেলার ভবানীপুর দেখলে মনে হত না এটি একই শহরের অংশ। চক্রবেড়িয়া থেকে কালীঘাট, পটুয়াপাড়া থেকে মুক্তদল মোড় — প্রতিটি গলিতে, প্রতিটি বুথের সামনে একটি সুনির্দিষ্ট টানটান ভাব। পুলিশ আছে। কেন্দ্রীয় বাহিনী আছে। ক্যামেরা আছে। এবং দুই শিবিরের কর্মীরা আছেন, একে অপরকে দেখছেন, পরস্পরের মধ্যে দূরত্ব মেপে নিচ্ছেন।
শুভেন্দু অধিকারীও সকালবেলাতেই মাঠে। তিনি দিরদিরপুর হনুমান মন্দিরে পুজো দিয়ে বুথ পরিদর্শনে বেরোলেন। মন্দিরে পুজো — এই অঙ্গভঙ্গিটি তাঁর রাজনৈতিক ব্যাকরণের একটি অপরিহার্য অধ্যায়। শুভেন্দু এমন একজন রাজনীতিক যিনি নন্দীগ্রামে মমতাকে হারিয়ে ইতিমধ্যে “জায়ান্ট কিলার”-এর খেতাব পেয়েছেন। এবার তিনি মমতার নিজের ঘরে ঢুকে পদ্মফুল ফোটাতে এসেছেন — এই বার্তাটুকু তাঁর সমস্ত চলাফেরায় স্পষ্ট।
চক্রবেড়িয়ার ৭০ নম্বর ওয়ার্ডের একটি বুথে সকালে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হল। বুথের ভেতরে আগে থেকেই হাজির ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ঠিক সেই সময়ই সেখানে পৌঁছে গেল শুভেন্দু অধিকারীর কনভয়। দুই যুযুধান পক্ষ একই আঙিনায় মুখোমুখি হয়েও সৌজন্য বিনিময়ের বালাই রাখলেন না কেউই। ভদ্রতার আবরণটুকুও অনুপস্থিত। দুটি কনভয়, দুটি পতাকা, দুটি পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং মাঝখানে সেই বুথের সাধারণ ভোটাররা, যাঁরা হয়তো ভেবেছিলেন আজ শুধু ভোট দিতে আসবেন।
বুথ থেকে বেরিয়েই শুভেন্দু বললেন, “একটা ভোটও কেউ ওঁকে দিচ্ছেন না। পরাজয় নিশ্চিত বুঝেই হতাশা চরমে পৌঁছেছে, তাই বুথে বসে রয়েছেন।” এই বাক্যটির মধ্যে দিয়ে শুভেন্দু একটি রাজনৈতিক কৌশল প্রয়োগ করলেন — মমতার সক্রিয়তাকে উদ্বেগের লক্ষণ হিসেবে দেখানো। তিনি মমতার বয়স নিয়েও খোঁচা দিলেন: “ওনার বয়স হয়েছে, ভোট দিয়ে এবার বাড়ি চলে যান।” এই কথাটি নিষ্ঠুর, কিন্তু রাজনীতিতে নিষ্ঠুরতাও কখনো কখনো কৌশল।
দুপুর গড়াতে গড়াতে ভবানীপুরের পরিস্থিতি একটি অন্য মাত্রায় পৌঁছাল। বেলা সাড়ে বারোটা নাগাদ মুক্তদল মোড় এলাকায় শুভেন্দুর গাড়ি পৌঁছাতেই তৃণমূলের মহিলা কর্মী-সমর্থকেরা ‘জয় বাংলা’ এবং ‘চোর-চোর’ স্লোগান দিতে শুরু করলেন। শুভেন্দু গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে গেলেন, তারপর আবার উঠে পড়লেন। কালীঘাটের পটুয়াপাড়ায় পৌঁছাতেই বিজেপি কর্মীরা পাল্টা ‘পিসি চোর-ভাইপো চোর’ স্লোগান তুললেন। কালীঘাটের জয় হিন্দ ভবন চত্বরে দুই পক্ষের স্লোগানে পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠল। শুভেন্দু অভিযোগ করলেন বহিরাগতদের দিয়ে তাঁর উপর আক্রমণের চেষ্টা হচ্ছে এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ডাকলেন। লাঠিচার্জ হল। উত্তেজনার মধ্যে বিক্ষোভকারীদের দিকে দৌড়ে যেতে দেখা গেল শুভেন্দুকে। দুপুরের ভবানীপুর সেই মুহূর্তে একটি অদ্ভুত থিয়েটারে পরিণত হয়েছিল — লাঠি, স্লোগান, কনভয়, ক্যামেরা, এবং মাঝে মাঝে ভোটারদের সারি।
সন্ধ্যায় ভোটপর্ব শেষ হলে দুই পক্ষই জয়ের দাবি নিয়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে হাজির হলেন। শুভেন্দু অধিকারী দাবি করলেন, ভবানীপুরের আটটি ওয়ার্ডের মধ্যে সাতটিতেই বিজেপির লিড নিশ্চিত। তাঁর হিসেব অনুযায়ী, মমতার নিজের বুথ মিত্র ইনস্টিটিউশনেও পদ্মফুল ফুটবে, অন্তত দুশো ভোটের ব্যবধানে। এই দাবিগুলোর মধ্যে একটি উদ্ধত আত্মবিশ্বাস আছে, যদিও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা জানেন যে ভোটের সন্ধ্যায় প্রার্থীর আত্মবিশ্বাস এবং প্রকৃত ফলাফলের মধ্যে দূরত্ব অনেক সময় বিস্তর। তৃণমূল শিবির পাল্টা দাবি করল, নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর দুটিতেই হারছেন শুভেন্দু।
ভবানীপুরের ভোট বিশ্লেষণ করতে গেলে কয়েকটি সংখ্যা মাথায় রাখতে হয়। ২০১১ সাল থেকে এই আসনটি তৃণমূল কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ২০১৬ সালে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে আসনটি ধরে রেখেছিল তৃণমূল। ২০২১ সালের উপনির্বাচনে বিজেপির প্রিয়াঙ্কা তিব্রেওয়ালকে ৫৮,৮৩২ ভোটের রেকর্ড ব্যবধানে হারিয়ে নিজেই আসনটি জিতেছিলেন মমতা। কিন্তু সেই নির্বাচনে বিজেপি কোনো বড় মুখকে প্রার্থী দেয়নি। এবার পরিস্থিতি ভিন্ন — নন্দীগ্রামের বিজয়ী শুভেন্দু নিজেই ময়দানে। শুভেন্দুর দাবি, এলাকার ৮৫ শতাংশ হিন্দু এবং ৯৫ শতাংশের বেশি অবাঙালি ভোটার বিজেপিকে সমর্থন করেছেন। এই সংখ্যাতত্ত্বের মধ্যে একটি হিসেব লুকিয়ে আছে — ভবানীপুরে মারওয়াড়ি, গুজরাটি, এবং অন্যান্য অবাঙালি সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি বরাবরই বিজেপির কাছে আশার আলো।
কিন্তু ভবানীপুরকে শুধু সংখ্যায় বোঝা যায় না। এই কেন্দ্রে একটি সূক্ষ্ম মনস্তত্ত্ব কাজ করে। মমতার জন্য এটি শুধু একটি আসন নয়, এটি তাঁর পরিচয়, তাঁর ভিত্তি, তাঁর রাজনৈতিক আত্মার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি ভূগোল। ৯০ শতাংশের বেশি ভোটদান হয়েছে ভবানীপুরে এই নির্বাচনে, শুভেন্দু যাকে পরিবর্তনের পক্ষে রায় বলে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু উচ্চ ভোটদান সবসময় শুধু একটি পক্ষের পক্ষে যায় না। বাংলার নির্বাচনী ইতিহাসে উচ্চ ভোটদানের অর্থ অনেক সময় সেই মুহূর্তে যে দল ক্ষমতায় আছে তার কর্মীদের সক্রিয়তা।
৪ ঠা মে ফলাফল বের হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত ভবানীপুর একটি প্রশ্নবোধক চিহ্নের মধ্যে ঝুলে থাকবে। শুভেন্দু তাঁর বুথ ব্যবচ্ছেদ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। মমতা তাঁর পরিচিত মাটি আঁকড়ে ধরে আছেন। কিন্তু গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এবং নিষ্ঠুরতা এখানেই — ইভিএমের বোতামে একবার চাপ পড়লে কোনো কনভয়, কোনো পুজো, কোনো ‘চোর-চোর’ স্লোগান সেটা বদলাতে পারে না। বুধবারের সেই দীর্ঘ দিনটির পর, যেখানে দুই প্রার্থী একই বুথের সামনে দাঁড়িয়েও পরস্পরকে দেখলেন না, একই রাস্তায় চললেও একে অপরের সঙ্গে কথা বললেন না — সেই নীরব যুদ্ধের ফলাফল এখন ইভিএমের গভীরে বন্দি। কলকাতার একটি গলি থেকে দেশের রাজনীতির মানচিত্র বদলে যেতে পারে কিনা, সেই প্রশ্নের উত্তর আসবে মে মাসের শুরুতে, যখন ভবানীপুরের মানুষ তাঁদের রায় জানাবেন এবং দুই যোদ্ধার একজন জানতে পারবেন — ঘরের মাঠে লড়াই আসলে কতটা নিরাপদ ছিল।
ভোর হওয়ার আগেই ভবানীপুর জেগে উঠেছিল। এপ্রিলের শেষ বুধবারে কলকাতার এই পুরনো পাড়ায় ভোর-ভোর একটা অস্থিরতা ছিল, যে ধরনের অস্থিরতা মানুষ অনুভব করে যখন জানে যে আজকের দিনটা নিছক সাধারণ নয়। চেতলার গলিতে চায়ের দোকান খোলার আগেই কেন্দ্রীয় বাহিনীর বুটের শব্দ শোনা গিয়েছে। পাশের বাড়ির বারান্দায় কেউ একজন বাইরে উঁকি মেরে দেখে নিয়েছেন পরিস্থিতি। রাজনৈতিক মানচিত্রে ভবানীপুর সবসময়ই ছিল একটি বিশেষ বিন্দু — মুখ্যমন্ত্রীর নিজের কেন্দ্র, তাঁর রাজনৈতিক আঁতুড়ঘর। কিন্তু ২০২৬ সালে এই কেন্দ্রটি আর শুধু একটি বিধানসভা আসন নয়; এটি একটি রূপক, একটি পরীক্ষা, এবং দুই পক্ষের কাছেই একটি যুদ্ধক্ষেত্র।
সকাল সাতটায় ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার আগেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চেতলায় গাড়িতে উঠে বসেছিলেন। এটা অস্বাভাবিক। সাধারণত ভোটের দিন বাড়িতেই থাকেন তিনি, বাড়ি থেকেই ভোট সংক্রান্ত খবরাখবর রাখেন। কিন্তু এবার ভিন্ন ছবি। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দিলেন, সারাদিন বুথে বুথে ঘুরবেন। তাঁর হাতের ব্যাগ, তাঁর চপ্পল, তাঁর সেই চিরপরিচিত সাদা শাড়ি — সব কিছু নিয়ে তিনি মাঠে নামলেন এমন একজন মানুষের ভঙ্গিতে যিনি জানেন আজ একটু বেশি সতর্ক থাকতে হবে।
ভবানীপুরে বুথ পরিদর্শনে বেরিয়েই নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিলেন তিনি। ক্যামেরার সামনে তাঁর গলায় সেই পরিচিত তীক্ষ্ণতা — “বিজেপি যা বলছে, নির্বাচন কমিশন ঠিক তাই করছে।” রাত্রের ঘটনাগুলো তখনও তাঁর মাথায় টগবগ করছে। ফিরহাদ হাকিমের বাড়িতে মাঝরাতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর হানা, মহিলাদের আতঙ্কিত হয়ে পড়া — এই সব নিয়ে সরব হলেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে রাগ ছিল, কিন্তু সেই রাগের পেছনে একটি হিসেবও ছিল — প্রতিটি শব্দ যেন ভোটারের কানে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।
সকালবেলার ভবানীপুর দেখলে মনে হত না এটি একই শহরের অংশ। চক্রবেড়িয়া থেকে কালীঘাট, পটুয়াপাড়া থেকে মুক্তদল মোড় — প্রতিটি গলিতে, প্রতিটি বুথের সামনে একটি সুনির্দিষ্ট টানটান ভাব। পুলিশ আছে। কেন্দ্রীয় বাহিনী আছে। ক্যামেরা আছে। এবং দুই শিবিরের কর্মীরা আছেন, একে অপরকে দেখছেন, পরস্পরের মধ্যে দূরত্ব মেপে নিচ্ছেন।
শুভেন্দু অধিকারীও সকালবেলাতেই মাঠে। তিনি দিরদিরপুর হনুমান মন্দিরে পুজো দিয়ে বুথ পরিদর্শনে বেরোলেন। মন্দিরে পুজো — এই অঙ্গভঙ্গিটি তাঁর রাজনৈতিক ব্যাকরণের একটি অপরিহার্য অধ্যায়। শুভেন্দু এমন একজন রাজনীতিক যিনি নন্দীগ্রামে মমতাকে হারিয়ে ইতিমধ্যে “জায়ান্ট কিলার”-এর খেতাব পেয়েছেন। এবার তিনি মমতার নিজের ঘরে ঢুকে পদ্মফুল ফোটাতে এসেছেন — এই বার্তাটুকু তাঁর সমস্ত চলাফেরায় স্পষ্ট।
চক্রবেড়িয়ার ৭০ নম্বর ওয়ার্ডের একটি বুথে সকালে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হল। বুথের ভেতরে আগে থেকেই হাজির ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ঠিক সেই সময়ই সেখানে পৌঁছে গেল শুভেন্দু অধিকারীর কনভয়। দুই যুযুধান পক্ষ একই আঙিনায় মুখোমুখি হয়েও সৌজন্য বিনিময়ের বালাই রাখলেন না কেউই। ভদ্রতার আবরণটুকুও অনুপস্থিত। দুটি কনভয়, দুটি পতাকা, দুটি পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং মাঝখানে সেই বুথের সাধারণ ভোটাররা, যাঁরা হয়তো ভেবেছিলেন আজ শুধু ভোট দিতে আসবেন।
বুথ থেকে বেরিয়েই শুভেন্দু বললেন, “একটা ভোটও কেউ ওঁকে দিচ্ছেন না। পরাজয় নিশ্চিত বুঝেই হতাশা চরমে পৌঁছেছে, তাই বুথে বসে রয়েছেন।” এই বাক্যটির মধ্যে দিয়ে শুভেন্দু একটি রাজনৈতিক কৌশল প্রয়োগ করলেন — মমতার সক্রিয়তাকে উদ্বেগের লক্ষণ হিসেবে দেখানো। তিনি মমতার বয়স নিয়েও খোঁচা দিলেন: “ওনার বয়স হয়েছে, ভোট দিয়ে এবার বাড়ি চলে যান।” এই কথাটি নিষ্ঠুর, কিন্তু রাজনীতিতে নিষ্ঠুরতাও কখনো কখনো কৌশল।
দুপুর গড়াতে গড়াতে ভবানীপুরের পরিস্থিতি একটি অন্য মাত্রায় পৌঁছাল। বেলা সাড়ে বারোটা নাগাদ মুক্তদল মোড় এলাকায় শুভেন্দুর গাড়ি পৌঁছাতেই তৃণমূলের মহিলা কর্মী-সমর্থকেরা ‘জয় বাংলা’ এবং ‘চোর-চোর’ স্লোগান দিতে শুরু করলেন। শুভেন্দু গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে গেলেন, তারপর আবার উঠে পড়লেন। কালীঘাটের পটুয়াপাড়ায় পৌঁছাতেই বিজেপি কর্মীরা পাল্টা ‘পিসি চোর-ভাইপো চোর’ স্লোগান তুললেন। কালীঘাটের জয় হিন্দ ভবন চত্বরে দুই পক্ষের স্লোগানে পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠল। শুভেন্দু অভিযোগ করলেন বহিরাগতদের দিয়ে তাঁর উপর আক্রমণের চেষ্টা হচ্ছে এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ডাকলেন। লাঠিচার্জ হল। উত্তেজনার মধ্যে বিক্ষোভকারীদের দিকে দৌড়ে যেতে দেখা গেল শুভেন্দুকে। দুপুরের ভবানীপুর সেই মুহূর্তে একটি অদ্ভুত থিয়েটারে পরিণত হয়েছিল — লাঠি, স্লোগান, কনভয়, ক্যামেরা, এবং মাঝে মাঝে ভোটারদের সারি।
সন্ধ্যায় ভোটপর্ব শেষ হলে দুই পক্ষই জয়ের দাবি নিয়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে হাজির হলেন। শুভেন্দু অধিকারী দাবি করলেন, ভবানীপুরের আটটি ওয়ার্ডের মধ্যে সাতটিতেই বিজেপির লিড নিশ্চিত। তাঁর হিসেব অনুযায়ী, মমতার নিজের বুথ মিত্র ইনস্টিটিউশনেও পদ্মফুল ফুটবে, অন্তত দুশো ভোটের ব্যবধানে। এই দাবিগুলোর মধ্যে একটি উদ্ধত আত্মবিশ্বাস আছে, যদিও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা জানেন যে ভোটের সন্ধ্যায় প্রার্থীর আত্মবিশ্বাস এবং প্রকৃত ফলাফলের মধ্যে দূরত্ব অনেক সময় বিস্তর। তৃণমূল শিবির পাল্টা দাবি করল, নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর দুটিতেই হারছেন শুভেন্দু।
ভবানীপুরের ভোট বিশ্লেষণ করতে গেলে কয়েকটি সংখ্যা মাথায় রাখতে হয়। ২০১১ সাল থেকে এই আসনটি তৃণমূল কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ২০১৬ সালে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে আসনটি ধরে রেখেছিল তৃণমূল। ২০২১ সালের উপনির্বাচনে বিজেপির প্রিয়াঙ্কা তিব্রেওয়ালকে ৫৮,৮৩২ ভোটের রেকর্ড ব্যবধানে হারিয়ে নিজেই আসনটি জিতেছিলেন মমতা। কিন্তু সেই নির্বাচনে বিজেপি কোনো বড় মুখকে প্রার্থী দেয়নি। এবার পরিস্থিতি ভিন্ন — নন্দীগ্রামের বিজয়ী শুভেন্দু নিজেই ময়দানে। শুভেন্দুর দাবি, এলাকার ৮৫ শতাংশ হিন্দু এবং ৯৫ শতাংশের বেশি অবাঙালি ভোটার বিজেপিকে সমর্থন করেছেন। এই সংখ্যাতত্ত্বের মধ্যে একটি হিসেব লুকিয়ে আছে — ভবানীপুরে মারওয়াড়ি, গুজরাটি, এবং অন্যান্য অবাঙালি সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি বরাবরই বিজেপির কাছে আশার আলো।
কিন্তু ভবানীপুরকে শুধু সংখ্যায় বোঝা যায় না। এই কেন্দ্রে একটি সূক্ষ্ম মনস্তত্ত্ব কাজ করে। মমতার জন্য এটি শুধু একটি আসন নয়, এটি তাঁর পরিচয়, তাঁর ভিত্তি, তাঁর রাজনৈতিক আত্মার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি ভূগোল। ৯০ শতাংশের বেশি ভোটদান হয়েছে ভবানীপুরে এই নির্বাচনে, শুভেন্দু যাকে পরিবর্তনের পক্ষে রায় বলে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু উচ্চ ভোটদান সবসময় শুধু একটি পক্ষের পক্ষে যায় না। বাংলার নির্বাচনী ইতিহাসে উচ্চ ভোটদানের অর্থ অনেক সময় সেই মুহূর্তে যে দল ক্ষমতায় আছে তার কর্মীদের সক্রিয়তা।
৪ ঠা মে ফলাফল বের হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত ভবানীপুর একটি প্রশ্নবোধক চিহ্নের মধ্যে ঝুলে থাকবে। শুভেন্দু তাঁর বুথ ব্যবচ্ছেদ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। মমতা তাঁর পরিচিত মাটি আঁকড়ে ধরে আছেন। কিন্তু গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এবং নিষ্ঠুরতা এখানেই — ইভিএমের বোতামে একবার চাপ পড়লে কোনো কনভয়, কোনো পুজো, কোনো ‘চোর-চোর’ স্লোগান সেটা বদলাতে পারে না। বুধবারের সেই দীর্ঘ দিনটির পর, যেখানে দুই প্রার্থী একই বুথের সামনে দাঁড়িয়েও পরস্পরকে দেখলেন না, একই রাস্তায় চললেও একে অপরের সঙ্গে কথা বললেন না — সেই নীরব যুদ্ধের ফলাফল এখন ইভিএমের গভীরে বন্দি। কলকাতার একটি গলি থেকে দেশের রাজনীতির মানচিত্র বদলে যেতে পারে কিনা, সেই প্রশ্নের উত্তর আসবে মে মাসের শুরুতে, যখন ভবানীপুরের মানুষ তাঁদের রায় জানাবেন এবং দুই যোদ্ধার একজন জানতে পারবেন — ঘরের মাঠে লড়াই আসলে কতটা নিরাপদ ছিল।