Home খবরদেশ দহনবেলায় বিদ্ধ বাংলা: এল নিনোর অভিশাপ না কি প্রকৃতির রুদ্ররোষ?

দহনবেলায় বিদ্ধ বাংলা: এল নিনোর অভিশাপ না কি প্রকৃতির রুদ্ররোষ?

0 comments 4 views
A+A-
Reset

বৈশাখের আকাশ এখন আর মেঘমল্লারের গান শোনায় না, বরং নীল রঙের সেই বিশাল ক্যানভাস থেকে ঝরে পড়ছে গলিত আগুনের সিসা। দক্ষিণবঙ্গের প্রতিটি জনপদ আজ এক অদৃশ্য অগ্নিকুণ্ডে বন্দি। আলিপুর থেকে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া থেকে বীরভূম—সর্বত্রই প্রকৃতি যেন এক তপ্ত মরুভূমির রুক্ষতাকে বরণ করে নিয়েছে। এই পরিস্থিতি কেবল খামখেয়ালি আবহাওয়া নয়, বরং এক গভীর জলবায়ুগত সংকটের সংকেত।

এল নিনোর ছায়া ও মেঘহীন আকাশ

এবারের এই অস্বাভাবিক দাবদাহের নেপথ্যে বিজ্ঞানীরা দায়ী করছেন প্রশান্ত মহাসাগরের সেই পরিচিত খলনায়ক—‘এল নিনো’-কে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধির এই বৈশ্বিক প্রক্রিয়াটি ভারতের মৌসুমী বায়ু এবং প্রাক-বর্ষা বৃষ্টিপাতের ছন্দকে পুরোপুরি ওলটপালট করে দিয়েছে। এল নিনোর প্রভাবে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা জলীয় বাষ্প স্থলভাগে প্রবেশের পথে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। ফলে আকাশে মেঘ জমতে পারছে না, আর সেই সুযোগে ডাঙ্গা থেকে আসা শুকনো তপ্ত বাতাস বা ‘লু’ দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলোকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে। বৃষ্টির যে স্বাভাবিক ক্যালেন্ডার আমরা ছোটবেলা থেকে জানি, এল নিনোর দাপটে তা আজ এক অনিশ্চিত ধোঁয়াশায় ঢাকা।

দক্ষিণবঙ্গে আগুনের চাবুক

শহর কলকাতার পিচগলা রাস্তাগুলো দুপুরের দিকে যেন এক একটি তপ্ত কড়াই। বাতাসের আর্দ্রতা এতই কম যে, ছায়ায় দাঁড়িয়েও স্বস্তি মিলছে না। পশ্চিমের জেলাগুলোতে পারদ ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করা এখন আর কোনো বিস্ময় নয়, বরং এক বিভীষিকায় পরিণত হয়েছে। গ্রামবাংলার চাষের জমিগুলো জলের অভাবে খাঁ খাঁ করছে, মাটির বুক ফেটে তৈরি হয়েছে গভীর ক্ষত। পশুপাখি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—তৃষ্ণার্ত চোখে সবাই কেবল আকাশের কোনো এক কোণে কালবৈশাখীর সেই ঘনঘোর কালো মেঘের সন্ধান করছে। কিন্তু এল নিনোর অভিশাপে সেই আকাঙ্ক্ষিত মেঘ যেন দিগন্তের ওপারেই থমকে আছে।

উত্তরের সেই সজল বৈপরীত্য

বাংলার মানচিত্রের ওপরের দিকটা তাকালে অবশ্য এক ভিন্ন জগতের দেখা মিলছে। হিমালয়ের পাদদেশ ছুঁয়ে থাকা জলপাইগুড়ি, কোচবিহার বা আলিপুরদুয়ারে প্রকৃতির রূপ সম্পূর্ণ আলাদা। উত্তরের জেলাগুলোতে মেঘের আনাগোনা আছে, আছে হালকা ঝোড়ো হাওয়া আর বৃষ্টির ছিটেফোঁটা। হিমালয়ের বাধা আর স্থানীয় ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সেখানে দহনজ্বালা ততটা তীব্র নয়। দক্ষিণের মানুষ যখন এক ফোঁটা জলের জন্য হাহাকার করছে, উত্তরের চা-বাগানগুলো তখন সিক্ত হচ্ছে বৃষ্টির পরশে। প্রকৃতির এই নির্মম বিভাজন যেন বাংলার মানুষকে দুই ভিন্ন মেরুর বাসিন্দা করে তুলেছে।

জনজীবনে থমকে যাওয়া ছন্দ

এই চরম পরিস্থিতি কেবল শারীরিক অসুস্থতা নয়, জনজীবনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকেও আঘাত করছে। স্কুল-কলেজের সময় বদলে দেওয়া হয়েছে, দিনমজুরেরা কাজের অভাবে ঘরে বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। হিট স্ট্রোকের আশঙ্কা এখন প্রতিটি মোড়ে। চিকিৎসকরা বারবার বলছেন তরল খাবার আর পর্যাপ্ত বিশ্রামের কথা, কিন্তু যাঁদের জীবন চলে ঘাম আর রক্ত জল করা পরিশ্রমে, তাঁদের কাছে এই পরামর্শ বিলাসিতার নামান্তর। শহরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের বাইরে যে বিশাল সংখ্যক মানুষ প্রাত্যহিক লড়াইটা চালিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের কাছে এই বৈশাখ যেন এক দীর্ঘ অগ্নিপরীক্ষা।

অনিশ্চিত আগামীর সংকেত

আমাদের বুঝতে হবে যে, এই চরম আবহাওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এল নিনোর মতো প্রাকৃতিক চক্রের পাশাপাশি বিশ্ব উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং এই সংকটকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। নির্বিচারে গাছ কাটা আর জলাশয় ভরাট করার মাসুল আজ আমাদের দিতে হচ্ছে আগুনের হলকায় পুড়ে।

আপাতত আমাদের সম্বল কেবল সতর্কতা আর দীর্ঘ প্রতীক্ষা। কবে দক্ষিণবঙ্গের রুক্ষ মাটিতে পড়বে প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা? কবে সেই মাটির সোঁদা গন্ধে জুড়োবে প্রাণ? আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাসে হয়তো সাময়িক স্বস্তির কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু স্থায়িত্বের গ্যারান্টি কেউ দিতে পারছে না। বাংলার এই তৃষ্ণার্ত প্রকৃতি যেন আজ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে—প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে আগামী দিনগুলোতে এই দহনজ্বালা আরও তীব্র, আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles