Home খবরবঙ্গের ভোট রঙ্গ বদলের বাতাস, না শাসকের ঢাল?

বদলের বাতাস, না শাসকের ঢাল?

পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহাসিক ভোটের অর্থ কী

0 comments 3 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: ভোরের আলো ফোটার আগেই উত্তরবঙ্গের চা বাগানের শ্রমিক পাড়া থেকে শুরু করে মুর্শিদাবাদের গঞ্জ শহর — সর্বত্র লাইন পড়ে গেল ভোটকেন্দ্রের সামনে। প্রথম দফায় ৯২.৩৫ শতাংশ ভোটার উপস্থিতির যে রেকর্ড নথিভুক্ত হল, তা এই নির্বাচনকে আক্ষরিক অর্থেই অভূতপূর্ব করে তুলেছে। কিন্তু এই উপস্থিতি কীসের বার্তা বহন করছে — পনেরো বছরের শাসনের অবসানের অভিপ্রায়, নাকি ভোটার তালিকা থেকে নাম মুছে যাওয়ার ভয়ে শেষ সুযোগ কাজে লাগানোর মরিয়া চেষ্টা? এই প্রশ্নের উত্তর ৪ঠা মে-র আগে কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না। কিন্তু প্রশ্নটি যতটা সরল মনে হয়, রাজনীতির বাস্তব মাঠ ততটা নয়।

ভোটার তালিকার বিতর্ক এবং নির্বাচনের প্রেক্ষাপট

এই নির্বাচনে প্রবেশের আগে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি বিতর্কের ঝড় তুলেছে তা হল ভোটার তালিকার স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর। এসআইআর প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৯০ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যা মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। এদের মধ্যে ৬০ লক্ষেরও বেশিকে মৃত বা অনুপস্থিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, এবং ২৭ লক্ষের বিষয়টি ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে। বিজেপি দাবি করেছে, এটি ভুয়ো ভোটার ও অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের তালিকাচ্যুত করার সঠিক পদক্ষেপ। তৃণমূল কংগ্রেস বলেছে, এই প্রক্রিয়া প্রকৃত ভোটারদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র।

পর্যবেক্ষকরা লক্ষ করেছেন যে তালিকাচ্যুতদের প্রায় ৬৫ শতাংশই মুসলিম, এবং কিছু জেলায় মতুয়া সম্প্রদায়ের দলিত হিন্দুরাও প্রভাবিত হয়েছেন। মুর্শিদাবাদে বাদ পড়েছেন সাড়ে সাত লক্ষেরও বেশি ভোটার, নদিয়ায় প্রায় পাঁচ লক্ষ। অর্থাৎ এই বিতর্ক শুধু সংখ্যাতাত্ত্বিক নয়, এর রাজনৈতিক এবং সাম্প্রদায়িক মাত্রা অত্যন্ত গভীর। তৃণমূল কংগ্রেস যে ব্যাখ্যা দিয়েছে — মানুষ নাম মুছে যাওয়ার ভয়ে “শেষ সুযোগ” হিসেবে এতগুলো ভোট দিতে বেরিয়ে পড়েছেন — সেটা নিছক অবাস্তব দাবি নয়। কিন্তু অন্যদিক থেকে দেখলে — ৯২ শতাংশের বেশি উপস্থিতি শুধু ভয়ের অনুঘটকে তৈরি হয় না, তার পেছনে একটি প্রবল সক্রিয় রাজনৈতিক চেতনাও থাকে।

পনেরো বছরের ভার এবং শাসকের শক্তি

২০২১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ২৯৪টির মধ্যে ২১৫টি আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করেছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার চালানোর পর এবার চতুর্থ মেয়াদের লড়াই — ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে বিরল এক পরীক্ষা। পনেরো বছরের শাসনের ভারবহন করতে হচ্ছে তৃণমূলকে। কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, যুবশ্রীর মতো জনমুখী প্রকল্প বারবার এনেছে দল, কিন্তু সন্দেশখালি, আরজি কর ধর্ষণ-হত্যা কাণ্ড, সিন্ডিকেট রাজনীতির অভিযোগ এবং সংখ্যালঘু তোষণের দাবি নিয়ে জনক্ষোভ তৈরি হয়েছে, বিশেষত শহুরে মধ্যবিত্তের মধ্যে।  দলও বোঝে এই ক্ষোভের গভীরতা। ৭৪ জন বিদ্যমান বিধায়ককে এবার টিকিট দেওয়া হয়নি, যা ভোটার ক্লান্তি মোকাবিলার প্রচেষ্টার ইঙ্গিত বহন করে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কৌশলটি পরিচিত এবং বারবার কার্যকর প্রমাণিত। “আমিই সব আসনে প্রার্থী” — পুরুলিয়ার জনসভায় এই ঘোষণা তিনি আগেও করেছেন, ২০১৬ সালে যখন প্রথমবার ক্ষমতায় ফিরে আসার লড়াইয়ে নেমেছিলেন। সেই কৌশল সফল হয়েছিল। কিন্তু ২০১৬ এবং ২০২৬-এর মধ্যে পার্থক্য আছে। তখন প্রথমবার ফেরার রোমাঞ্চ ছিল, এবার চতুর্থবারের ক্লান্তি। তখন তাঁর বিরুদ্ধে ছিল বাম-কংগ্রেসের দীর্ঘশাসনের প্রতি বিতৃষ্ণা, এবার তাঁর নিজের শাসনের প্রতি।

আরজি কর এবং রাজনীতির মানবিক মূল্য

২০২৪ সালের আগস্টে আরজি কর মেডিকেল কলেজে একজন তরুণ চিকিৎসক-শিক্ষার্থীর ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা কলকাতায় নজিরবিহীন নাগরিক আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাথমিক নীরবতা ব্যাপক সমালোচনার কারণ হয়েছিল। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিতভাবে সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেয়। অভিযুক্তের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে, কিন্তু এই মামলায় তৃণমূলের ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্যরা আড়ালে থেকে গেছেন এই অভিযোগ এখনো প্রশ্নচিহ্নের মতো ঝুলে আছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১১ সাল থেকে নারীদের অধিকারের পক্ষে সওয়াল করে আসছেন — স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুলিশ এবং পঞ্চায়েতে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই কারণেই অনেক নারী ভোটার আরজি কর কাণ্ডের দায় সরাসরি মমতার উপর চাপাতে রাজি নন। তাঁরা মনে করেন, স্থানীয় নেতারা দায়ী, “দিদির” অজান্তে এই ঘটনা ঘটেছে। এই মনস্তত্ত্ব বিজেপির প্রচারকে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে রাখে।

বিজেপির লড়াই — শক্তি এবং সীমাবদ্ধতা

উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক ভূগোল এবারের নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দু। প্রথম দফার ১৫২টি আসনের মধ্যে — জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ারের চা বাগান থেকে দার্জিলিং ও কালিম্পং-এর পাহাড়, কোচবিহারের রাজবংশী বেল্ট থেকে মালদা ও উত্তর দিনাজপুরের সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত এলাকা পর্যন্ত — এই বৈচিত্র্যময় ভূখণ্ডে লড়াই চলছে। ২০২১ সালে এই ১৫২টির মধ্যে বিজেপি ৫৯টি আসনে জিতেছিল। বিজেপির কাছে এই দফাটিই তাদের শ্রেষ্ঠ সুযোগ।

বিজেপি কর্মসংস্থান, শিল্পোন্নয়ন এবং নিয়োগ পরীক্ষার দাবিকে প্রচারের কেন্দ্রে রেখেছে, পাশাপাশি স্কুল নিয়োগ দুর্নীতিকে তৃণমূলের শাসনের প্রতীকী ব্যর্থতা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। সিএএ, অনুপ্রবেশ এবং বাংলাদেশ সীমান্তের নিরাপত্তা প্রশ্নকে জাতীয় নিরাপত্তার বৃত্তে নিয়ে গিয়ে হিন্দু ভোটের মেরুকরণের চেষ্টা চলেছে। কিন্তু বিজেপির দুর্বলতাও কম নয়। কেন্দ্রে সরকার থাকার পরেও রাজ্যে সাংগঠনিক ভিত্তি এখনও অপ্রতুল, অনেক আসনে গণভিত্তির বদলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মুখের উপর নির্ভরতা রয়েছে। আধাসামরিক বাহিনীর রেকর্ড মোতায়েন — প্রায় আড়াই লক্ষ কর্মী — নির্বাচন কমিশনের আস্থার প্রতিফলন হতে পারে, কিন্তু মমতা একে বিজেপির কেন্দ্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে সফলভাবে উপস্থাপন করেছেন।

পরিচয়ের রাজনীতি

রাজ্যের বাঙালি হিন্দু জনগণের মধ্যে একটি ধর্মীয় মেরুকরণ বিদ্যমান, যা বামফ্রন্টের নির্বাচনী পতনের পর থেকে ক্রমশ গভীর হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশের কারণে জনতাত্ত্বিক কাঠামো পরিবর্তনের অভিযোগ মানুষের মনে প্রভাব ফেলছে। ২০২৪ সালের জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতনের ঘটনা এই উদ্বেগকে কংক্রিট রূপ দিয়েছে। বিজেপি এই আবেগকে রাজনৈতিক পুঁজিতে রূপান্তরিত করতে চেষ্টা করেছে, আর তৃণমূল বলেছে — বাংলার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার এই প্রয়াস প্রকৃতপক্ষে বাংলার নিজস্ব বহুত্ববাদী চরিত্রের বিরুদ্ধে।

কিন্তু বঙ্গীয় অস্মিতার প্রশ্নে তৃণমূল এবং বিজেপি দুই দলই দাবিদার। তৃণমূল নিজেকে বাংলার পরিচয় ও স্বায়ত্তশাসনের রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করেছে, আর বিজেপি পরিচয়ের প্রশ্নকে নাগরিকত্ব, অনুপ্রবেশ ও হিন্দু ঐক্যের সঙ্গে যুক্ত করে নির্দিষ্ট কেন্দ্রগুলোতে একটি ভিন্ন বর্ণনা তৈরি করেছে। মতুয়া সম্প্রদায়ের বিভিন্ন অংশে সিএএ-র প্রতিশ্রুতি কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নির্বাচনের ফলেই স্পষ্ট হবে।

বাম-কংগ্রেস জোটের অবস্থান

এই বাইপোলার লড়াইয়ে বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেসের অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ তৃতীয় মাত্রা। সিপিআই(এম) বামফ্রন্ট ও মিত্র দল মিলিয়ে ২৫২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। কংগ্রেস ২৯৩টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা হল, এই দুই দলের ভোট যদি বিভক্ত হয়ে যায়, তাহলে উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি তৃণমূলের কারণ সংখ্যালঘু ভোট ভাগ হলে বিজেপির লাভ, আর বাম-কংগ্রেস মিলিয়ে যা ভোট পাবে সেটা মূলত তৃণমূলের বিরোধী ভোটেরই একটি অংশ। এই সমীকরণটি বামেদের জন্য এবারও মাথাব্যথার কারণ।

রেকর্ড ভোট: কীসের ইঙ্গিত?

বড় প্রশ্নে ফিরে আসা যাক। ৯২ শতাংশের বেশি ভোটার উপস্থিতি ভারতীয় রাজ্য নির্বাচনে বিরল। ইতিহাস বলে, এই মাপের উপস্থিতি সাধারণত দুটো কারণে হয় — হয় শাসকদলের বিরুদ্ধে প্রবল ক্ষোভ এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা, নয়তো শাসকদলের নিজস্ব বুথ ম্যানেজমেন্টের নিখুঁত কৌশল। তৃণমূলের সাংগঠনিক দক্ষতা, বিশেষত পঞ্চায়েত স্তরে নারী নেটওয়ার্ক এবং লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের একজোট করার ক্ষমতা — এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা ঠিক নয়। একই সাথে, এসআইআর নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তা এবং ভোট থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের বেরিয়ে পড়াও অবিশ্বাস্য নয়।

নরেন্দ্র মোদি দাবি করেছেন যে এই বিপুল ভোটার উপস্থিতি পরিবর্তনের সংকেত। তৃণমূল বলছে উল্টো কথা। এবং এই পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যার মধ্যে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতির সেই চিরন্তন জটিলতা — এখানে সংখ্যা কথা বলে, কিন্তু সংখ্যার ভেতরের গল্পটা বলা যায় শুধু মানুষের মুখে মুখে।

উপসংহার নয়, অপেক্ষা

৪ঠা মে-র আগে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। কিন্তু কিছু কথা নিশ্চিত। এই নির্বাচনের প্রচার পর্ব তৈরি হয়েছে ভোটার তালিকার বিতর্ক, নাগরিকত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্ন, পরিচয়ের রাজনীতি, নারীর নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং পনেরো বছরের শাসনের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের সংমিশ্রণে। এই উপাদানগুলো একটি অভূতপূর্ব নির্বাচনী মুহূর্ত তৈরি করেছে। পশ্চিমবঙ্গের ভোটার কি শেষ পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চতুর্থ মেয়াদের বিরুদ্ধে রায় দেবেন, নাকি পরিচিত শাসকের আস্থার মধ্যেই আশ্রয় খুঁজবেন অনিশ্চিত বিকল্পের চেয়ে — সেই প্রশ্নের উত্তর আর মাত্র দশ দিন দূরে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles