10
বাংলাস্ফিয়ার: একটি তুচ্ছ খাবার কীভাবে বাংলার রাজনীতির সবচেয়ে গুরুগম্ভীর রূপক হয়ে উঠল?
পশ্চিমবঙ্গে ভোটের মরশুম এলেই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। রাজনীতিবিদরা হঠাৎ খাদ্যপ্রেমী হয়ে ওঠেন। তাঁরা মাছের বাজারে যান, মুড়িমাখা খান, চায়ের কাপে ঠোঁট ডোবান। কিন্তু এবার পরিস্থিতি একটু আলাদা। এবার ঝালমুড়ি শুধু একটি স্ট্রিট ফুড নয়, এটি একটি রাজনৈতিক অবস্থান, একটি আদর্শগত ঘোষণাপত্র, এবং কারো কারো মতে, বাংলার আত্মার প্রতীক।
ঘটনার শুরু আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ। এক রাজনৈতিক সভায় কোনো এক নেতা বা নেত্রী, বা নেতার ছায়া, বা নেত্রীর প্রতিনিধি, কারণ এই গল্পে মূল চরিত্র চিহ্নিত করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে — মঞ্চ থেকে নেমে জনতার মধ্যে দাঁড়িয়ে এক ঠোঙা ঝালমুড়ি খেলেন। ফটোগ্রাফাররা ছবি তুললেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবিটি ছড়িয়ে পড়ল। তারপর বিরোধীপক্ষ বলল, এই ঝালমুড়ি নকল। অর্থাৎ, নেতা ঝালমুড়ি খাওয়ার ভান করেছেন, আসলে খাননি। অথবা খেয়েছেন কিন্তু উপভোগ করেননি। অথবা ঠোঙাটা খালি ছিল। বিতর্কের বিস্তার এতটাই হলো যে মূল প্রশ্ন — রাজ্যে বেকারত্ব, স্বাস্থ্য পরিষেবার হাল, পরিবেশ দূষণ — সব সরে গিয়ে কেন্দ্রে চলে এল একটি প্রশ্ন: ঝালমুড়িতে কতটা ঝাল ছিল?
বাংলার রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে খাদ্যকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে আসছে, তবে সাধারণত সেই খাদ্য একটু ভারী প্রকৃতির — বিরিয়ানি, মাছের কালিয়া, রসগোল্লা। ঝালমুড়ি সেই গ্যালারিতে একটি নতুন, অপ্রত্যাশিত সংযোজন। এর কারণটি সম্ভবত ঝালমুড়ির গণতান্ত্রিক চরিত্রে লুকিয়ে আছে। এটি ধনীর খাবার নয়, দরিদ্রেরও নয়, এটি সবার। স্টেশনের বাইরে, পাড়ার মোড়ে, স্কুলের গেটে — ঝালমুড়ির ঠোঙা সর্বত্র। এবং এই সর্বজনীনতাই রাজনীতিবিদদের কাছে এর আকর্ষণ। ঝালমুড়ি হাতে ধরলে মানুষটিকে “সাধারণ” দেখায়। বিরিয়ানি হাতে ধরলে সেই নিশ্চয়তা নেই।
কিন্তু এখানেই সমস্যা। ঝালমুড়ি একটি সৎ খাবার। এর মধ্যে ভেজাল দেওয়া কঠিন। মুড়ি হয় মচমচে নয়তো স্যাঁতসেঁতে। ঝাল হয় ঝাল, নয়তো নয়। কাঁচা লঙ্কা থাকে কি থাকে না। সরিষার তেল আছে কি নেই। এই সততাই রাজনীতিবিদদের বিপদে ফেলে দিয়েছে। কারণ একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ দীর্ঘ বক্তৃতায় সত্য আড়াল করতে পারেন, কিন্তু ঠোঙা মুখে তোলার মুহূর্তে তাঁর মুখের ভঙ্গি লুকানো যায় না। ক্যামেরা মিথ্যা বলে না, এবং কাঁচা মরিচের ঝাঁজ কোনো রাজনৈতিক প্রশিক্ষণে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
ফলে ঝালমুড়ির রাজনীতি একটি বিশেষ ধরনের যাচাই-প্রক্রিয়া তৈরি করেছে — অনাড়ম্বর, কিন্তু নিষ্ঠুর। গত কয়েক সপ্তাহে বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিরা যে যার নিজের ঝালমুড়ি-মুহূর্ত তৈরি করেছেন। কেউ ঠোঙা হাতে হাসছেন, কেউ খাচ্ছেন, কেউ বিক্রেতার সঙ্গে দর কষাকষি করছেন (যদিও বিক্রেতাটি প্রায় সব ক্ষেত্রেই দলীয় কর্মী বলে সন্দেহ রয়েছে)। একটি ভিডিওতে দেখা গেছে এক নেতা ঝালমুড়ির মধ্যে থেকে কাঁচা লঙ্কাটি সরিয়ে রাখছেন, যা তাঁর প্রতিপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে “মানুষের সমস্যা থেকে পালানো”র রূপক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। পাল্টা যুক্তিতে বলা হয়েছে, কাঁচা লঙ্কা সরানো আসলে “অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা পরিহার করার প্রজ্ঞা”র প্রতীক। লঙ্কা এখন একটি দার্শনিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
এই আলোচনায় সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা অনস্বীকার্য। ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামে ঝালমুড়ির রাজনীতি নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে যা দেখলে মনে হয় মানুষটি আসলে ঝালমুড়ি নয়, কিউবার মিসাইল সংকট নিয়ে কথা বলছেন। কেউ লিখেছেন, “যে নেতা ঝালমুড়িতে বেশি মুড়ি দেন, তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী।” কেউ পাল্টা লিখেছেন, “বেশি ঝাল মানে অ্যাজেন্ডা আছে।” একটি ট্রেন্ডিং পোস্টে দাবি করা হয়েছে যে বিভিন্ন দলের ঝালমুড়িতে তেলের পরিমাণের তারতম্য আসলে তাদের অর্থনৈতিক নীতির প্রতিফলন। এই বিশ্লেষণটি সাত হাজারেরও বেশি শেয়ার পেয়েছে।
মূলধারার সংবাদমাধ্যমও পিছিয়ে নেই। একটি সন্ধ্যার টেলিভিশন বিতর্কে তিনজন প্যানেলিস্টকে প্রশ্ন করা হলো: “ঝালমুড়ি কি বাংলার পরিচয়ের অংশ?” এবং তারপর পরবর্তী পঁচিশ মিনিট কেউ কাউকে বলতে না দিয়ে তিনজনই একসঙ্গে উত্তর দিলেন। উপস্থাপক মাঝে মাঝে “এক মিনিট, এক মিনিট” বলে হাত তুললেন, যা কোনো কাজে এলো না। বিতর্কের শেষে দর্শক জানলেন যে ঝালমুড়ি বাংলার পরিচয়ের অংশ কিনা সেটি স্পষ্ট হলো না, তবে বাংলার রাজনীতিবিদরা একটি ঠোঙার মধ্যে এত অর্থ আবিষ্কার করতে পারেন যে মুড়িগুলো নিজেরাই অবাক হয়ে যাবে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বুদ্ধিমান মন্তব্যটি এসেছে আমহার্স্ট স্ট্রিটের এক প্রবীণ ঝালমুড়িওয়ালার কাছ থেকে, যিনি গত চল্লিশ বছর ধরে এই ব্যবসা করছেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল ঝালমুড়ি নিয়ে এত রাজনীতি কী মনে করেন। তিনি থালা থেকে চোখ না তুলেই বললেন, “নেতারা আসেন, ছবি তোলেন, চলে যান। মুড়ি থাকে।” এই মন্তব্যটি, অনেকের মতে, বাংলার রাজনীতির সবচেয়ে নিখুঁত সারসংক্ষেপ।
কিন্তু এই পুরো প্রসঙ্গে একটি প্রশ্ন থেকে যায়, যেটি কেউ জিজ্ঞেস করছেন না। রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থায় যে সংকট, গ্রামীণ কর্মসংস্থানের যে শোচনীয় অবস্থা, পরিবেশ দূষণে যে ধ্বংস চলছে, সেসব নিয়ে একই উৎসাহে বিতর্ক হচ্ছে কি? ঝালমুড়িতে কাঁচালঙ্কা আছে কি নেই সেটা নিয়ে যখন সাত হাজার শেয়ার হয়, তখন রাজ্যের কৃষি সংকট নিয়ে লেখা পোস্টে সত্তরটা লাইক মেলে কিনা সন্দেহ। রাজনীতির সবচেয়ে পুরনো কৌশলগুলোর একটি হলো জনমনের মনোযোগকে হালকা জিনিসে ধরে রাখা। এবং ঝালমুড়ি, সন্দেহ নেই, একটি অত্যন্ত হালকা জিনিস।
তাহলে কি ঝালমুড়ি একটি ষড়যন্ত্র? সম্ভবত না। ষড়যন্ত্র এত সুনিপুণ পরিকল্পনা দাবি করে যা বাংলার কোনো দলই এই মুহূর্তে দেখাতে পারছে না। বরং এটা সম্ভবত একটা স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক ঘটনা যেখানে রাজনীতিবিদরা সুযোগ নিচ্ছেন, মিডিয়া কন্টেন্ট পাচ্ছে, এবং সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরা রাগ বা উত্তেজনার একটা সহজ নিষ্কাশন পাচ্ছেন। ঝালমুড়ি এই তিন পক্ষের মিলিত চাহিদার নিখুঁত সমন্বয়।
ভোট আসছে। প্রচার তীব্র হবে। আরো অনেক নেতা ঠোঙা হাতে রাস্তায় নামবেন। আরো বিতর্ক হবে তেলের পরিমাণ নিয়ে, লংকার সংখ্যা নিয়ে, চানাচুর দেওয়া হয়েছে কিনা তা নিয়ে। এবং সেই বিতর্কের মাঝে, কোথাও একটা কোণে, আসল প্রশ্নগুলো চুপ করে বসে থাকবে — যেন স্যাঁতসেঁতে মুড়ির মতো, যেটা কেউ খেতে চায় না।
কিন্তু বাংলার সেই প্রবীণ ঝালমুড়িওয়ালা ঠিকই বলেছেন। মুড়ি থাকে। এবং মানুষও থাকেন। ভোটের পরে, ক্যামেরা সরে যাওয়ার পরে, ঠোঙাটা ডাস্টবিনে পড়ে থাকার পরেও মানুষ থাকেন, তাঁদের সমস্যা থাকে, এবং পাড়ার মোড়ে ঝালমুড়িওয়ালা থাকেন। রাজনীতির ভরকেন্দ্র যতই সরুক না কেন, সেই মোড়টা থেকে যায়। এবং সেখানে কেউ ফটো তুলতে না এলেও ঝাল ঝালই থাকে, মুড়ি মুড়িই থাকে।
তাতে অন্তত একটা সততা আছে, যেটা এই মরশুমে বড় দুর্লভ।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটের মরশুম এলেই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। রাজনীতিবিদরা হঠাৎ খাদ্যপ্রেমী হয়ে ওঠেন। তাঁরা মাছের বাজারে যান, মুড়িমাখা খান, চায়ের কাপে ঠোঁট ডোবান। কিন্তু এবার পরিস্থিতি একটু আলাদা। এবার ঝালমুড়ি শুধু একটি স্ট্রিট ফুড নয়, এটি একটি রাজনৈতিক অবস্থান, একটি আদর্শগত ঘোষণাপত্র, এবং কারো কারো মতে, বাংলার আত্মার প্রতীক।
ঘটনার শুরু আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ। এক রাজনৈতিক সভায় কোনো এক নেতা বা নেত্রী, বা নেতার ছায়া, বা নেত্রীর প্রতিনিধি, কারণ এই গল্পে মূল চরিত্র চিহ্নিত করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে — মঞ্চ থেকে নেমে জনতার মধ্যে দাঁড়িয়ে এক ঠোঙা ঝালমুড়ি খেলেন। ফটোগ্রাফাররা ছবি তুললেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবিটি ছড়িয়ে পড়ল। তারপর বিরোধীপক্ষ বলল, এই ঝালমুড়ি নকল। অর্থাৎ, নেতা ঝালমুড়ি খাওয়ার ভান করেছেন, আসলে খাননি। অথবা খেয়েছেন কিন্তু উপভোগ করেননি। অথবা ঠোঙাটা খালি ছিল। বিতর্কের বিস্তার এতটাই হলো যে মূল প্রশ্ন — রাজ্যে বেকারত্ব, স্বাস্থ্য পরিষেবার হাল, পরিবেশ দূষণ — সব সরে গিয়ে কেন্দ্রে চলে এল একটি প্রশ্ন: ঝালমুড়িতে কতটা ঝাল ছিল?
বাংলার রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে খাদ্যকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে আসছে, তবে সাধারণত সেই খাদ্য একটু ভারী প্রকৃতির — বিরিয়ানি, মাছের কালিয়া, রসগোল্লা। ঝালমুড়ি সেই গ্যালারিতে একটি নতুন, অপ্রত্যাশিত সংযোজন। এর কারণটি সম্ভবত ঝালমুড়ির গণতান্ত্রিক চরিত্রে লুকিয়ে আছে। এটি ধনীর খাবার নয়, দরিদ্রেরও নয়, এটি সবার। স্টেশনের বাইরে, পাড়ার মোড়ে, স্কুলের গেটে — ঝালমুড়ির ঠোঙা সর্বত্র। এবং এই সর্বজনীনতাই রাজনীতিবিদদের কাছে এর আকর্ষণ। ঝালমুড়ি হাতে ধরলে মানুষটিকে “সাধারণ” দেখায়। বিরিয়ানি হাতে ধরলে সেই নিশ্চয়তা নেই।
কিন্তু এখানেই সমস্যা। ঝালমুড়ি একটি সৎ খাবার। এর মধ্যে ভেজাল দেওয়া কঠিন। মুড়ি হয় মচমচে নয়তো স্যাঁতসেঁতে। ঝাল হয় ঝাল, নয়তো নয়। কাঁচা লঙ্কা থাকে কি থাকে না। সরিষার তেল আছে কি নেই। এই সততাই রাজনীতিবিদদের বিপদে ফেলে দিয়েছে। কারণ একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ দীর্ঘ বক্তৃতায় সত্য আড়াল করতে পারেন, কিন্তু ঠোঙা মুখে তোলার মুহূর্তে তাঁর মুখের ভঙ্গি লুকানো যায় না। ক্যামেরা মিথ্যা বলে না, এবং কাঁচা মরিচের ঝাঁজ কোনো রাজনৈতিক প্রশিক্ষণে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
ফলে ঝালমুড়ির রাজনীতি একটি বিশেষ ধরনের যাচাই-প্রক্রিয়া তৈরি করেছে — অনাড়ম্বর, কিন্তু নিষ্ঠুর। গত কয়েক সপ্তাহে বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিরা যে যার নিজের ঝালমুড়ি-মুহূর্ত তৈরি করেছেন। কেউ ঠোঙা হাতে হাসছেন, কেউ খাচ্ছেন, কেউ বিক্রেতার সঙ্গে দর কষাকষি করছেন (যদিও বিক্রেতাটি প্রায় সব ক্ষেত্রেই দলীয় কর্মী বলে সন্দেহ রয়েছে)। একটি ভিডিওতে দেখা গেছে এক নেতা ঝালমুড়ির মধ্যে থেকে কাঁচা লঙ্কাটি সরিয়ে রাখছেন, যা তাঁর প্রতিপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে “মানুষের সমস্যা থেকে পালানো”র রূপক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। পাল্টা যুক্তিতে বলা হয়েছে, কাঁচা লঙ্কা সরানো আসলে “অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা পরিহার করার প্রজ্ঞা”র প্রতীক। লঙ্কা এখন একটি দার্শনিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
এই আলোচনায় সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা অনস্বীকার্য। ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামে ঝালমুড়ির রাজনীতি নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে যা দেখলে মনে হয় মানুষটি আসলে ঝালমুড়ি নয়, কিউবার মিসাইল সংকট নিয়ে কথা বলছেন। কেউ লিখেছেন, “যে নেতা ঝালমুড়িতে বেশি মুড়ি দেন, তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী।” কেউ পাল্টা লিখেছেন, “বেশি ঝাল মানে অ্যাজেন্ডা আছে।” একটি ট্রেন্ডিং পোস্টে দাবি করা হয়েছে যে বিভিন্ন দলের ঝালমুড়িতে তেলের পরিমাণের তারতম্য আসলে তাদের অর্থনৈতিক নীতির প্রতিফলন। এই বিশ্লেষণটি সাত হাজারেরও বেশি শেয়ার পেয়েছে।
মূলধারার সংবাদমাধ্যমও পিছিয়ে নেই। একটি সন্ধ্যার টেলিভিশন বিতর্কে তিনজন প্যানেলিস্টকে প্রশ্ন করা হলো: “ঝালমুড়ি কি বাংলার পরিচয়ের অংশ?” এবং তারপর পরবর্তী পঁচিশ মিনিট কেউ কাউকে বলতে না দিয়ে তিনজনই একসঙ্গে উত্তর দিলেন। উপস্থাপক মাঝে মাঝে “এক মিনিট, এক মিনিট” বলে হাত তুললেন, যা কোনো কাজে এলো না। বিতর্কের শেষে দর্শক জানলেন যে ঝালমুড়ি বাংলার পরিচয়ের অংশ কিনা সেটি স্পষ্ট হলো না, তবে বাংলার রাজনীতিবিদরা একটি ঠোঙার মধ্যে এত অর্থ আবিষ্কার করতে পারেন যে মুড়িগুলো নিজেরাই অবাক হয়ে যাবে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বুদ্ধিমান মন্তব্যটি এসেছে আমহার্স্ট স্ট্রিটের এক প্রবীণ ঝালমুড়িওয়ালার কাছ থেকে, যিনি গত চল্লিশ বছর ধরে এই ব্যবসা করছেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল ঝালমুড়ি নিয়ে এত রাজনীতি কী মনে করেন। তিনি থালা থেকে চোখ না তুলেই বললেন, “নেতারা আসেন, ছবি তোলেন, চলে যান। মুড়ি থাকে।” এই মন্তব্যটি, অনেকের মতে, বাংলার রাজনীতির সবচেয়ে নিখুঁত সারসংক্ষেপ।
কিন্তু এই পুরো প্রসঙ্গে একটি প্রশ্ন থেকে যায়, যেটি কেউ জিজ্ঞেস করছেন না। রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থায় যে সংকট, গ্রামীণ কর্মসংস্থানের যে শোচনীয় অবস্থা, পরিবেশ দূষণে যে ধ্বংস চলছে, সেসব নিয়ে একই উৎসাহে বিতর্ক হচ্ছে কি? ঝালমুড়িতে কাঁচালঙ্কা আছে কি নেই সেটা নিয়ে যখন সাত হাজার শেয়ার হয়, তখন রাজ্যের কৃষি সংকট নিয়ে লেখা পোস্টে সত্তরটা লাইক মেলে কিনা সন্দেহ। রাজনীতির সবচেয়ে পুরনো কৌশলগুলোর একটি হলো জনমনের মনোযোগকে হালকা জিনিসে ধরে রাখা। এবং ঝালমুড়ি, সন্দেহ নেই, একটি অত্যন্ত হালকা জিনিস।
তাহলে কি ঝালমুড়ি একটি ষড়যন্ত্র? সম্ভবত না। ষড়যন্ত্র এত সুনিপুণ পরিকল্পনা দাবি করে যা বাংলার কোনো দলই এই মুহূর্তে দেখাতে পারছে না। বরং এটা সম্ভবত একটা স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক ঘটনা যেখানে রাজনীতিবিদরা সুযোগ নিচ্ছেন, মিডিয়া কন্টেন্ট পাচ্ছে, এবং সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরা রাগ বা উত্তেজনার একটা সহজ নিষ্কাশন পাচ্ছেন। ঝালমুড়ি এই তিন পক্ষের মিলিত চাহিদার নিখুঁত সমন্বয়।
ভোট আসছে। প্রচার তীব্র হবে। আরো অনেক নেতা ঠোঙা হাতে রাস্তায় নামবেন। আরো বিতর্ক হবে তেলের পরিমাণ নিয়ে, লংকার সংখ্যা নিয়ে, চানাচুর দেওয়া হয়েছে কিনা তা নিয়ে। এবং সেই বিতর্কের মাঝে, কোথাও একটা কোণে, আসল প্রশ্নগুলো চুপ করে বসে থাকবে — যেন স্যাঁতসেঁতে মুড়ির মতো, যেটা কেউ খেতে চায় না।
কিন্তু বাংলার সেই প্রবীণ ঝালমুড়িওয়ালা ঠিকই বলেছেন। মুড়ি থাকে। এবং মানুষও থাকেন। ভোটের পরে, ক্যামেরা সরে যাওয়ার পরে, ঠোঙাটা ডাস্টবিনে পড়ে থাকার পরেও মানুষ থাকেন, তাঁদের সমস্যা থাকে, এবং পাড়ার মোড়ে ঝালমুড়িওয়ালা থাকেন। রাজনীতির ভরকেন্দ্র যতই সরুক না কেন, সেই মোড়টা থেকে যায়। এবং সেখানে কেউ ফটো তুলতে না এলেও ঝাল ঝালই থাকে, মুড়ি মুড়িই থাকে।
তাতে অন্তত একটা সততা আছে, যেটা এই মরশুমে বড় দুর্লভ।