বাংলাস্ফিয়ার: এবারের গ্রীষ্ম যেন আগেই সতর্কবার্তা দিচ্ছে। ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, এপ্রিল থেকে জুন — এই তিন মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপপ্রবাহের দিন দেখা যেতে পারে। ফলে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা রেকর্ড ছুঁতে পারে — সরকারি হিসেব বলছে, এই সময় তা ২৭০ গিগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
গরমকালে এমনিতেই বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ে। কিন্তু এ বছর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে। এই সংঘাতের ফলে গ্যাস সরবরাহে টান পড়েছে। যদিও ভারতের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ২% আসে গ্যাস থেকে, তবুও চূড়ান্ত চাহিদার সময় — বিশেষ করে তাপপ্রবাহ চলাকালীন — প্রায় ৮ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে নেওয়া হয়।
এই ঘাটতির ফলে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলো এখন আবার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছে, যদিও দীর্ঘমেয়াদে দেশটি কার্বন নির্গমন কমানোর পথে হাঁটতে চাইছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রথম বড় পদক্ষেপ নেয় গুজরাট। তারা টাটা পাওয়ার-এর সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ চুক্তি নতুন করে অনুমোদন দেয়, যাতে কোম্পানিটি তাদের ৪ গিগাওয়াট ক্ষমতার মুন্দ্রা পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে আবার দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ শুরু করতে পারে। আমদানি করা কয়লায় চলা এই প্ল্যান্টটি সরকারি ভর্তুকি সংক্রান্ত নিয়মের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বহুদিন বন্ধ ছিল।
কেন্দ্রীয় সরকার এখন নির্দেশ দিয়েছে — ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত মুন্দ্রা প্ল্যান্টকে পূর্ণ ক্ষমতায় চালাতে হবে। প্রয়োজনে আমদানিকৃত কয়লায় চলা অন্য প্ল্যান্টগুলিকেও একইভাবে চালানোর নির্দেশ দেওয়া হতে পারে।
ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কয়লা উৎপাদক ও ব্যবহারকারী দেশ। বর্তমানে দেশের হাতে প্রায় ২১ কোটি টন কয়লার মজুত রয়েছে, যা প্রায় ৮৮ দিনের চাহিদা মেটাতে সক্ষম। সরকার ইতিমধ্যেই নির্দেশ দিয়েছে — কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলিকে যেন কোনওরকম বিদ্যুৎ বিভ্রাট না হয়, সেজন্য রক্ষণাবেক্ষণ থেকে ইউনিটগুলো দ্রুত ফিরিয়ে এনে পূর্ণ সক্ষমতায় চালানোর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সোমবার জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত জ্বালানি বিপর্যয়ের মধ্যেও ভারতের কাছে বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর মতো যথেষ্ট কয়লা মজুত রয়েছে।
তবে সবচেয়ে দুর্বল জায়গা হল গ্যাস। সরকার জরুরি বিধান প্রয়োগ করে সীমিত গ্যাস সরবরাহকে ঘরোয়া ব্যবহার ও সার কারখানার দিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ — বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে আমেরিকা ও ইজরায়েলের সামরিক সংঘর্ষের ফলে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে গ্যাস সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সরবরাহকারীরা ‘ফোর্স মাজোর’ ঘোষণা করেছে, ফলে ভারতের গ্রীষ্মকালীন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি টেন্ডার স্থগিত হয়ে গেছে।
এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা এনটিপিসি জানিয়েছে, এপ্রিল থেকে জুন — এই সময় তারা গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে না।
এই পরিস্থিতি শুধু ভারতের নয়, বাংলাদেশ থেকে জাপান পর্যন্ত এশিয়ার বহু দেশকেই আবার কয়লার দিকে ফিরতে বাধ্য করছে। কারণ এলএনজি-র দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে গ্যাস পরিবহনও ব্যাহত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, এই গরমে শুধু তাপমাত্রাই নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটও দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে চলেছে।