Home সুমন নামা মমতা শাসক হতেই পারলেননা

মমতা শাসক হতেই পারলেননা

by Suman Chattopadhyay
0 comments 10 views
A+A-
Reset

সুমন চট্টোপাধ‍্যায়: একটা সহজ প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি।

একজন মুখ্যমন্ত্রীর কাজ কী?

রাজ্য চালানো। উন্নয়ন করা। মানুষের জীবনের মান উন্নততর  করা। কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় করে রাজ্যের সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করা।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১৫ বছর মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু এই ১৫ বছরে তিনি কি একদিনের জন্যও ভুলেছেন যে তিনি আর বিরোধী নেত্রী নন?

আমার মনে হয় না।

মমতার রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি হয়েছিল “না” বলতে বলতে।

বাম সরকারকে না। কেন্দ্রকে না। টাটাকে না। সেনাবাহিনীকে না। সিবিআইকে না। সুপ্রিম কোর্টকে না। বিরোধী নেত্রী হিসেবে এই “না” বলার একটা মূল্য ছিল। এটাই ছিল তাঁর অস্ত্র। এই অস্ত্র দিয়েই তিনি ৩৪ বছরের বাম শাসনকে ক্রমাগত আঘাত করেছিলেন।। কিন্তু ক্ষমতায় এসেও তিনি সেই একই অস্ত্র ব্যবহার করতে থাকলেন।

শাসক হলে “না” বলার আগে হিসাব করতে হয়। কার সাথে লড়ছি, কেন লড়ছি, এই লড়াইয়ে আমার রাজ্যের কী লাভ, কীই বা ক্ষতি। মমতা সেই হিসেব কখনও করেননি। অথবা করতে চাননি। কারণ লড়াইটাই তাঁর রাজনীতির অক্সিজেন।

মোদী সরকারের সাথে সংঘাতের ইতিহাসটা একটু দেখা যাক।

২০১৪ সালে মোদী ক্ষমতায় এলেন। তখন থেকেই মমতার অবস্থান স্পষ্ট। দিল্লি শত্রু। বিজেপি শত্রু। মোদী শত্রু। ঠিক আছে। রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই বিরোধিতার মূল্য  দিয়েছে কে? বাংলার মানুষ দিয়েছে। আয়ুষ্মান ভারত। দেশের গরিব মানুষের জন্য পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যে চিকিৎসার প্রকল্প। ২৮টি রাজ্য এই প্রকল্পে যোগ দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ দেয়নি। কেন? কারণ এটা মোদীর প্রকল্প। বাংলার গরিব রোগী যখন সরকারি হাসপাতালে মেঝেতে শুয়ে থাকে, তখন তার কাছে এই রাজনীতির কোনও অর্থ থাকেনা। সে শুধু জানে অন্য রাজ্যের গরিব মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসা পাচ্ছে, সে পাচ্ছে না।

কিংবা পিএম কিষান সম্মান নিধি। কৃষকদের জন্য বছরে ছয় হাজার টাকা সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে। সারা দেশে কোটি কোটি কৃষক পাচ্ছেন। বাংলার কৃষক দীর্ঘদিন পাননি। কারণ রাজ্য সরকার তালিকা পাঠায়নি। সমন্বয় করেনি। কারণ এটা মোদীর প্রকল্প। বাংলার চাষি কী জানে তার ক্ষতি হচ্ছে? জানে। কিন্তু সে যাবেটা কার কাছে ?

এনআরসি এবং সিএএ নিয়েও একটু সূক্ষ্মভাবে বলা দরকার। সিএএ নিয়ে বৈধ আপত্তি থাকা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। গণতান্ত্রিক বিরোধিতা থাকতে পারে। কিন্তু মমতা যেভাবে এই ইস্যুকে ব্যবহার করলেন, রাস্তায় নামলেন, রেল অবরোধ হোল, হিংসা হোল, দাঙ্গায় উস্কানি দেওয়া হোল,সেটা কী রাজ্যের স্বার্থে ছিল? নাকি সেটা ছিল তাঁর ভোটব্যাঙ্ক রক্ষার রাজনীতি?

সব বিষয়ে প্রতিপক্ষের ভূমিকায় নেমে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয়েছে রাজ‍্যের অর্থনীতির। কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক মানে শুধু রাজনীতি নয়। মানে টাকা। মানে প্রকল্প। মানে পরিকাঠামো। একটা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটা হোল কেন্দ্রের কাছ থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করা। নীতিন গডকড়ি যখন রাস্তা বানাচ্ছেন, তখন আপনার উচিত রাজ্যের রাস্তার তালিকা পাঠানো। রেলমন্ত্রী যখন নতুন লাইন ঘোষণা করছেন, তখন আপনি দরবার করবেন এটাই প্রত‍্যাশিত। শিল্প মন্ত্রণালয় যখন বিনিয়োগের কথা বলছে, তখন আপনার কাজ রাজ্যকে বিনিয়োগ-বান্ধব করে তোলা। এটা ভিক্ষা নয়। এটা যুক্তরাষ্ট্রীয়  রাজনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

ওড়িশার নবীন পট্টনায়ক বিজেপির বন্ধু ছিলেন না। কিন্তু মোদীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এমন ছিল যে ওড়িশা কেন্দ্রের থেকে সুবিধা আদায় করতে পেরেছে। অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা এরা সবাই বিজেপিবিরোধী। কিন্তু দিল্লির সঙ্গে কাজের সম্পর্ক রেখেছে। মমতা পারেননি। বা চাননি।

এবার আসুন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে। মমতা কি সত্যিই বিশ্বাস করেন মোদী বাংলার শত্রু? নাকি এই শত্রুতার বয়ানটা তাঁর রাজনৈতিক প্রয়োজনে তৈরি? আমি মনে করি দ্বিতীয়টা। কারণ দেখুন, যখন কেন্দ্রে ইউপিএ সরকার ছিল, তখনও মমতার সঙ্গে কেন্দ্রের সম্পর্ক ভালো ছিল না। তিনি ইউপিএ সরকারে মন্ত্রীও ছিলেন, আবার বিরোধিতাও করেছেন। ২০১২ সালে ইউপিএ থেকে বেরিয়ে এসেছেন। অর্থাৎ সমস্যাটা মোদীতে নয়। সমস্যাটা মমতার রাজনৈতিক চরিত্রে। তিনি সংঘাত ছাড়া বাঁচতে পারেন না। সংঘাত না থাকলে তাঁর কাছে রাজনীতি সারগর্ভহীন হয়ে যায়। কারণ উন্নয়নের কথা বলতে গেলে কাজ দেখাতে হয়। সুশাসনের কথা বলতে গেলে দুর্নীতি বন্ধ করতে হয়। শিল্পের কথা বলতে গেলে কারখানা খুলতে হয়। এসব কিছু না করে তিনি শুধু বলতে থাকেন দিল্লি আমাদের বঞ্চিত করছে। এবং বাংলার একটা অংশের মানুষ তা বিশ্বাসও করে।

কিন্তু এই বয়ানে কিছু প্রশ্নের জবাব নেই। শিক্ষা দফতর কি দিল্লি চালায়? শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি কি দিল্লি করেছে? পুলিশ কি দিল্লির অধীনে? বগটুইতে মানুষ পোড়ানোর নির্দেশ কি দিল্লি দিয়েছিল? সিন্ডিকেট কি দিল্লি তৈরি করেছে? কাটমানির টাকা কী দিল্লিতে যাচ্ছে? আরজি করে ধর্ষণের তদন্ত কি দিল্লি আটকেছিল? এই প্রশ্নগুলোর জবাব নেই। তাই এই প্রশ্নগুলো উঠলেই বিষয় ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। দিল্লি বাংলাকে বঞ্চিত করছে। এটা রাজনীতির সবচেয়ে পুরনো কৌশল। নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে বাইরের শত্রু তৈরি করো।

মমতার শত্রুর তালিকাটা একটু দেখুন। মোদী শত্রু। অমিত শাহ শত্রু। সিবিআই শত্রু। ইডি শত্রু। রাজ্যপাল শত্রু। সুপ্রিম কোর্ট মাঝে মাঝে শত্রু। মিডিয়া শত্রু। বিরোধী দল তো শত্রুই। এত শত্রু যার, তার কাছে বন্ধু কারা? যারা প্রশ্ন করে না। যারা মাথা নত করে থাকে। যারা কাটমানি নেয় আর চুপ করে থাকে। এই হলো মমতার বাংলা।

একটা তুলনা দিই। নরেন্দ্র মোদী ২০০১ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। সেই সময় কেন্দ্রে ছিল কংগ্রেসের ইউপিএ সরকার। মোদীর সঙ্গে কেন্দ্রের সম্পর্ক কি ভালো ছিল? মোটেই না। কংগ্রেস মোদীকে পছন্দ করত না। মোদীও কংগ্রেসকে পছন্দ করতেন না। কিন্তু মোদী গুজরাত চালিয়েছেন। শিল্প এনেছেন। বিদ্যুৎ দিয়েছেন। রাস্তা বানিয়েছেন। কেন্দ্রের সঙ্গে সংঘাত তাঁর উন্নয়নের কাজকে থামাতে পারেনি। কারণ তিনি জানতেন রাজনীতি আলাদা, প্রশাসন আলাদা। মমতা সেই ফারাকটা কখনো বোঝেননি বা বুঝতে চাননি।

একজন শাসকের সাফল্য মাপা হয় তাঁর রাজ্যের মানুষের জীবনের মান দিয়ে। রাস্তা দিয়ে। হাসপাতাল দিয়ে। স্কুল দিয়ে। কর্মসংস্থান দিয়ে। একজন বিরোধী নেত্রীর সাফল্য মাপা হয় তাঁর আন্দোলন দিয়ে। ভাষণ দিয়ে। সংঘাত দিয়ে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বিতীয় মানদণ্ডে হয়তো সফল। কিন্তু যেহেতু তিনি মুখ্যমন্ত্রী, তাঁকে প্রথম মানদণ্ডে বিচার করতে হবে। এবং সেই বিচারে তিনি ব্যর্থ। কারণ শাসক হতে গেলে শুধু লড়াই করলে হয় না। কখনও কখনও টেবিলে বসতে হয়। আপস করতে হয়। রাজ্যের স্বার্থে অহং বিসর্জন দিতে হয়। সেটা মমতা পারেননি। এবং সেই না-পারার মূল্য দিয়েছে বাংলা।এখনও দিচ্ছে।

বাংলা মুখ‍্যমন্ত্রীকে বিরোধী নেত্রীর ভূমিকায় দেখতে দেখতে এখন অতিষ্ঠ। অন্ধ হলে কী প্রলয় বন্ধ থাকে?

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles