Home খবরবঙ্গের ভোট রঙ্গ ঋণের ভারে নুয়ে পশ্চিমবঙ্গ, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন (২)

ঋণের ভারে নুয়ে পশ্চিমবঙ্গ, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন (২)

0 comments 8 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দুই প্রধান দলের ইস্তেহার পাশাপাশি রাখলে একটি অদ্ভুত ছবি ফুটে ওঠে। রাজ্যের আর্থিক অবস্থা যতটা সংকটজনক, প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ততটাই বিশাল। এই দুটি বাস্তবতা কোথাও মেলে না — এবং সংখ্যায় হিসেব করলে ব্যবধানটা আরও স্পষ্ট হয়ে যায়।

তৃণমূলের হিসেব

তৃণমূলের সবচেয়ে বড় কল্যাণ প্রকল্প লক্ষ্মীর ভাণ্ডার। বর্তমানে এই প্রকল্পের মোট উপভোক্তার সংখ্যা ২ কোটি ৭ লক্ষ ৪২ হাজারেরও বেশি। ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে সাধারণ মহিলারা মাসে ১,৫০০ টাকা এবং তফসিলি জাতি ও উপজাতি মহিলারা ১,৭০০ টাকা পাচ্ছেন। এই বর্ধিত হারে প্রকল্পটির জন্য রাজ্যের বার্ষিক বরাদ্দ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৫,০০০ কোটি টাকা। উল্লেখযোগ্য যে, ৫০০ টাকার সময় মাসিক খরচ ছিল প্রায় ১,০৯০ কোটি টাকা — এখন তা তিনগুণ হয়েছে।

এর পাশাপাশি নতুন প্রকল্প ‘বাংলার যুব সাথী’তে সরকারের হিসেবে প্রায় ২৭ থেকে ২৮ লক্ষ বেকার যুবক যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন, যার জন্য রাজ্যের বরাদ্দ ১৫,০০০ কোটি টাকা। তার উপর তৃণমূল পুনরায় ক্ষমতায় এলে কৃষির জন্য আলাদা ৩০,০০০ কোটি টাকার বিশেষ কৃষি বাজেটও কার্যকর করতে হবে। এই তিনটি প্রকল্প মিলিয়েই শুধু নতুন বা বর্ধিত প্রতিশ্রুতির বার্ষিক ভার দাঁড়াচ্ছে কমপক্ষে ৬০,০০০ কোটি টাকার আশেপাশে।

তবে এখানেও একটি অসঙ্গতি চোখে পড়ছে। সরকার নিজেই স্বীকার করছে যুব সাথীর প্রারম্ভিক বরাদ্দ মাত্র ৫,০০০ কোটি টাকা — অথচ ২৭ থেকে ২৮ লক্ষ উপভোক্তাকে পুরো বছর ধরে ভাতা দিতে প্রয়োজন কমপক্ষে ৪,৮৬০ কোটি টাকা থেকে শুরু করে আরও বেশি। কোথা থেকে আসবে বাকি অর্থ, তার কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই।

বিজেপির হিসেব আরও ভারী

বিজেপির আর্থিক প্রতিশ্রুতির বোঝা আরও বেশি। মহিলাদের জন্য দলটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে মাসে ৩,০০০ টাকার ভাতা, যা তৃণমূলের প্রস্তাবের দ্বিগুণ। বর্তমান লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো ২ কোটি ৭ লক্ষ উপভোক্তাকে এই হারে টাকা দিলে শুধু এই একটি প্রকল্পেই বার্ষিক খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৯৭,০০০ কোটি টাকার বেশি।

এর সাথে যোগ হচ্ছে বেকার যুবকদের জন্য মাসে ৩,০০০ টাকার ভাতা। তৃণমূলের হিসেবে ২৭ থেকে ২৮ লক্ষ যোগ্য উপভোক্তা ধরলে এই খাতে বার্ষিক খরচ আরও প্রায় ১০,০০০ কোটি টাকা। তারপর রয়েছে প্রায় ১২ লক্ষ বর্তমান ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মীর মহার্ঘ ভাতা বিষয়টি, যেখানে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় কর্মীদের মধ্যে এখনও ৪০ শতাংশের ফারাক রয়েছে। বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ক্ষমতায় এলে ৪৫ দিনের মধ্যে সপ্তম বেতন কমিশন বাস্তবায়ন করবে এবং সব কর্মী ও পেনশনভোগীকে বকেয়া মহার্ঘ ভাতা দেবে। সপ্তম বেতন কমিশন বাস্তবায়নের অর্থ হলো বার্ষিক বেতন ব্যয় রাতারাতি কয়েক হাজার কোটি টাকা বেড়ে যাওয়া এবং বকেয়া মহার্ঘ ভাতা-র পাহাড় তার উপরে আলাদা।

বিজেপির একটি তাত্ত্বিক যুক্তি রয়েছে যে কেন্দ্রীয় সরকারের সহায়তায় এবং আয়ুষ্মান ভারতের মতো কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলি বাংলায় চালু করলে রাজ্যের নিজস্ব ব্যয় কিছুটা কমবে। কিন্তু মহার্ঘ ভাতা, সপ্তম বেতন কমিশন এবং ৩,০০০ টাকার মহিলা ভাতা — এগুলি রাজ্যের নিজস্ব বাজেট থেকেই মেটাতে হবে, কেন্দ্র বহন করবে না।

রাজ্যের আয়-ব্যয়ের বাস্তব চিত্র

তুলনাটা আরও স্পষ্ট হয় রাজ্যের আয়-ব্যয়ের কাঠামো দেখলে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজ্যের মোট ব্যয় — ঋণ পরিশোধ বাদে — ধরা হয়েছে ৩ লক্ষ ৪১ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে ঋণ নেওয়া হচ্ছে ৬৩,০০০ কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের ২০.৪৭ শতাংশই চলে যাচ্ছে পুরনো ঋণের সুদ মেটাতে। ইতিমধ্যেই পরিকাঠামো খাতে ব্যয় মোট ব্যয়ের ৫.৩ শতাংশ থেকে কমে ৩ শতাংশে নেমে এসেছে।

এই পরিস্থিতিতে নতুন কোনো বড় প্রকল্প চালু করতে হলে হয় আরও ঋণ করতে হবে, নয়তো শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিকাঠামোর মতো খাত থেকে টাকা কেটে আনতে হবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আরও কাটছাঁট হলে রাজ্যের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি আরও ত্বরান্বিত হবে।

ভোটের পরে কে বহন করবে ভার?

অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত রাজকোষ সংস্কার না হলে রাজ্য ক্রমশ ঋণের ফাঁদে আটকে যাবে। নির্বাচনের মঞ্চে প্রতিটি দল যত বড় প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, রাজ্যের ভাঙা রাজকোষ ততটাই নীরব থাকছে। ভোটের পরে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, সেই রাজকোষের সামনে বসে প্রতিশ্রুতির খাতা মেলাতে গিয়ে যা হবে, তার ভার শেষপর্যন্ত বহন করবে রাজ্যের মানুষই — হয় ঋণের সুদের চাপে, নয়তো প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ার হতাশায়।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles