আশা ভোঁসলে (৮ সেপ্টেম্বর ১৯৩৩ — ১২ এপ্রিল ২০২৬)
আজ ১২ এপ্রিল, ২০২৬। মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে থেমে গেল একটি কণ্ঠস্বর — যে কণ্ঠ ছিল ভারতীয় সংগীতের আত্মা। ৯২ বছর বয়সে চলে গেলেন কিংবদন্তি প্লেব্যাক শিল্পী আশা ভোঁসলে। শনিবার সন্ধ্যায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। চিকিৎসক জানালেন মৃত্যুর কারণ মাল্টি-অর্গান ফেলিউর। আগের সন্ধ্যায় তাঁর নাতনি জ়ানাই ভোঁসলে সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছিলেন দাদির হাসপাতালে ভর্তির কথা, সঙ্গে পরিবারের একাকিত্বের আর্জি। কিন্তু ভোর না হতেই ভেসে এল সেই মর্মবেদনার সংবাদ। ছেলে আনন্দ ভোঁসলে সাংবাদিকদের বললেন, “আমার মা আজ চলে গেছেন।” মাত্র কয়েকটি শব্দ। কিন্তু সেই শব্দগুলো যেন শূন্য করে দিল গোটা ভারতকে।
১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের সাংলি জেলার ছোট্ট গ্রাম গোয়ারে জন্ম নিলেন এক শিশু — নাম আশা মঙ্গেশকর। বাবা পণ্ডিত দীনানাথ মঙ্গেশকর ছিলেন খ্যাতনামা সংগীতজ্ঞ। সেই পরিবারের বাতাসে সুর মিশে থাকত। দিদি লতা মঙ্গেশকর আর ছোট্ট আশা — দুই বোন মিলে একদিন শাসন করবেন ভারতীয় সংগীতের সাম্রাজ্য, সেটা হয়তো সেদিন কেউ ভাবেননি।
কিন্তু জীবন সহজ ছিল না আশার জন্য। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পরিবারের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে ৩১ বছর বয়সী গণপতরাও ভোঁসলেকে বিয়ে করে ঘর ছাড়লেন তিনি। কিশোরী বয়সে এই বিদ্রোহ তাঁকে এনে ফেলল কঠিন বাস্তবতার মুখে। শ্বশুরবাড়িতে অশান্তি, সংসারের চাপ, শিশুসন্তানদের দায়িত্ব — সব মিলিয়ে জীবন হয়ে উঠল কঠিন লড়াইয়ের মাঠ। কিন্তু আশা ভোঁসলে ভাঙেননি। গান তাঁর হাতিয়ার ছিল, গান তাঁর বাঁচার পথ ছিল।
মাত্র ১০ বছর বয়সে গান শেখা শুরু, আর ১৯৪৩ সালে মারাঠি ছবি ‘মাঝা বাল’-এর মধ্য দিয়ে প্রথম রেকর্ডিং। তারপর যে যাত্রা শুরু হল, তা থামল আজ — ৮৩ বছর পরে। শুরুতে পথ ছিল কণ্টকময়। দিদি লতা মঙ্গেশকরের বিশাল ছায়ায় ঢাকা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। সেই সময়ে যে গানগুলো লতাজি গাইতে চাইতেন না — ক্যাবারে, আইটেম নম্বর, দুষ্টু ছন্দের গান — সেগুলোই মিলত আশাকে। অনেকে ভেবেছিলেন এটা তাঁর দুর্ভাগ্য। কিন্তু আশা ভোঁসলে সেই দুর্ভাগ্যকে করলেন নিজের পরিচয়। ওপি নায়ার, সচিন দেব বর্মন, রবি — একে একে বড় সুরকারদের সঙ্গে কাজ শুরু হল। ১৯৬৬ সালে আর ডি বর্মনের সুরে ‘তিসরি মঞ্জিল’ ছবিতে ‘আজা আজা’, ‘ও হাসিনা জুলফোঁওয়ালি’ — শ্রোতাদের মুগ্ধ করল। একটি নতুন আশা ভোঁসলেকে চিনল দেশ।
রাহুল দেব বর্মন — পঞ্চমদা — এলেন আশার জীবনে। শুধু সুর নয়, প্রেমও। দুজনের মিলনে তৈরি হল ভারতীয় সংগীতের কিছু অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। ১৯৮০ সালে পঞ্চমদাকে বিয়ে করলেন আশা, যদিও বর্মন পরিবারের আপত্তি ছিল। কিন্তু সেই ভালোবাসা ছিল অকুণ্ঠ, গভীর। ১৯৯৪ সালে পঞ্চমদার মৃত্যু আশার জীবনে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করে। তাঁর কাজের পরিধি ছিল ফিল্মি গান, পপ, গজল, ভজন, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত, লোকগান, কাওয়ালি এবং রবীন্দ্রসংগীত পর্যন্ত বিস্তৃত। একদিকে ‘পিয়া তু আব তো আজা’র মাদকতা, অন্যদিকে ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায়’-এর গভীরতা। একদিকে ‘ইন আঁখোঁ কি মস্তি কে’র ঘোর, অন্যদিকে ‘যব ভি জি চাহে নয়া গানা’র উচ্ছলতা। তিনি ছিলেন সব রসের ধারক। তাঁর ক্যারিয়ারে গাওয়া গানের সংখ্যা ১২,০০০-এর বেশি — এটি শুধু সংখ্যা নয়, এটি একটি জীবনের সাক্ষ্য। প্রতিদিন স্টুডিওতে যাওয়া, গলা সাধা, নতুন কিছু তৈরি করার অদম্য তাগিদের সাক্ষ্য। হিন্দি ছাড়াও ২০টিরও বেশি ভারতীয় ও বিদেশি ভাষায় গান গেয়েছেন তিনি। বাংলাতেও তাঁর গান আছে — রবীন্দ্রসংগীত থেকে আধুনিক বাংলা গান, সব কিছুতেই তিনি নিজের ছাপ রেখে গেছেন।
আশা ভোঁসলের সুর শুধু ভারতে আটকে থাকেনি। ১৯৯৭ সালে ব্রিটিশ ব্যান্ড কর্নারশপ তাঁকে উৎসর্গ করে তৈরি করল ‘ব্রিমফুল অব আশা’ — যা ১৯৯৮ সালে ইউকে সিঙ্গেলস চার্টে শীর্ষে পৌঁছাল। পশ্চিমের তরুণ প্রজন্ম জানল — ভারতে এক কণ্ঠের দেবী আছেন। ২০২৬ সালেও, মৃত্যুর বছরেই, ব্রিটিশ ভার্চুয়াল ব্যান্ড গরিলাজের অ্যালবামে তাঁর কণ্ঠ শোনা গেল। ৯২ বছর বয়সেও সক্রিয় — এটাই আশা ভোঁসলে। জীবনে পুরস্কার কম পাননি — দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার, পদ্মবিভূষণ, সাতটি ফিল্মফেয়ার সেরা মহিলা প্লেব্যাক পুরস্কার। কিন্তু যে স্বীকৃতি সবচেয়ে বড় — সেটা পুরস্কার কমিটির দেওয়া নয়। সেটা লক্ষ লক্ষ শ্রোতার হৃদয়ের।
আশা ভোঁসলে শুধু মঞ্চের মানুষ ছিলেন না। তিনি ছিলেন রক্তমাংসের মানুষ — যিনি কষ্ট পেয়েছেন, ভালোবেসেছেন, হেরেছেন, উঠে দাঁড়িয়েছেন। কিশোরী বয়সে সংসারের ভার কাঁধে নিয়েছিলেন। সন্তানদের মানুষ করেছেন। মেয়ে বর্ষা ভোঁসলের অকালমৃত্যু তাঁকে আঘাত করেছিল গভীরভাবে। প্রিয়তম পঞ্চমদাকে হারিয়েছেন। দিদি লতাজিকে হারিয়েছেন। তবু তিনি গেয়ে গেছেন। কারণ গানই ছিল তাঁর প্রাণ। রেস্তোরাঁ খুলেছেন, উদ্যোক্তা হয়েছেন, টেলিভিশনে এসেছেন। ৮০ পেরিয়েও মঞ্চে উঠেছেন। ২০১৩ সালে ‘মাই’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছেন। এই মানুষটি থামতে জানতেন না, থামতে চাইতেন না।
সোমবার ১৩ এপ্রিল সকাল ১১টায় লোয়ার পারেলের কাসা গ্রান্ডেতে তাঁর বাড়িতে শেষবারের মতো দেখা যাবে তাঁকে। বিকেল ৪টায় শিবাজি পার্কে অনুষ্ঠিত হবে শেষকৃত্য। শিবাজি পার্ক — মুম্বাইয়ের সেই মাটি, যেখানে ইতিহাস লেখা হয়েছে বারবার। সেই মাটিতেই শেষশয্যায় শায়িত হবেন আশা ভোঁসলে।
মানুষ মরে যায়। কিন্তু কণ্ঠ মরে না। আজ রাতে কোথাও না কোথাও কেউ চালাবে ‘দম মারো দম’। কেউ গুনগুন করবে ‘পর্দা হ্যায় পর্দা’। কেউ চোখ বন্ধ করে শুনবে ‘তু জহাঁ জহাঁ চলেগা’। আশা ভোঁসলে তখনও থাকবেন — লাখো স্পিকারে, লাখো হৃদয়ে। ভারতীয় সংগীতে তাঁর স্থান ছিল দিদি লতা মঙ্গেশকরের পাশেই এবং লতাজির মতোই তিনি ছিলেন এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি। এখন সেই দুই বোন মিলিত হলেন হয়তো অন্য কোনো ভুবনে। একটা যুগ শেষ হল। ভারতীয় সংগীতের সুবর্ণ অধ্যায়ের শেষ পাতা উল্টে গেল আজ। কিন্তু যে গান তিনি রেখে গেছেন, সেই গান অমর। কারণ আশা ভোঁসলের কণ্ঠ ছিল শুধু শব্দ নয় — ছিল অনুভব, ছিল জীবন, ছিল ভালোবাসার আরেক নাম।
বিদায় আশাজি। সুরের স্বর্গে ভালো থাকবেন।​​​​​​​​​​​​​​​​