Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: আমেরিকা ও ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা যখন ইসলামাবাদে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনায় বসেছেন, ঠিক সেই সময় শনিবার মার্কিন নৌবাহিনীর দুটি ডেস্ট্রয়ার হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করে এবং একটি জাহাজের দিকে এগিয়ে আসা ইরানের একটি নজরদারি ড্রোন ধ্বংস করে — এ কথা জানিয়েছেন একাধিক মার্কিন কর্মকর্তা।
অভিযানের বিবরণ
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের বিবৃতি অনুযায়ী, ইউএসএস ফ্র্যাঙ্ক ই. পিটারসেন জুনিয়র এবং ইউএসএস মাইকেল মারফি — এই দুটি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ওমান উপসাগর থেকে যাত্রা শুরু করে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করে। তাদের কাজ ছিল ইরানের পাতা নৌ-মাইন শনাক্ত ও অপসারণের প্রস্তুতি নেওয়া। সেদিন সরাসরি মাইন অপসারণ না করে মূল কাজ শেষে তারা আবার প্রণালি পেরিয়ে ওমান উপসাগরে ফিরে যায়।
ঠিক কখন ইরানি ড্রোনটি গুলি করে নামানো হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। তবে অভিযান সম্পর্কে অবহিত এক ব্যক্তি জানান, ড্রোনটির উদ্দেশ্য সম্ভবত মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলিকে হুমকির বার্তা দেওয়া। মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, ড্রোনটি সরাসরি হামলার ঝুঁকি তৈরি করেনি, তবে মার্কিন নৌবাহিনী চায়নি ইরান তাদের জাহাজের গতিবিধি নজরদারিতে রাখুক। তাদের বক্তব্য, ড্রোন ধ্বংস করা যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন নয়।
নিউ ইয়র্ক টাইমস একাধিক দেশের সূত্রের সঙ্গে কথা বলেছে যারা জাহাজগুলির গতিবিধি সম্পর্কে অবগত ছিলেন। কূটনৈতিক আলোচনার সংবেদনশীলতার কারণে সবাই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছিলেন।
ইরানের পাল্টা দাবি
ইরান জোর দিয়ে অস্বীকার করেছে যে শনিবার মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলি হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করেছিল। ইরানের সামরিক মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাঘারি বলেছেন, মার্কিন জাহাজগুলি প্রণালির কাছে এলেও ঢুকতে পারেনি, এবং এখনও ইরানের সশস্ত্র বাহিনীই এই জলপথ নিয়ন্ত্রণ করছে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিমও দাবি করেছে, এই মুহূর্তে হরমুজ প্রণালিতে কোনো জাহাজ চলাচল নেই এবং তেহরান এক মার্কিন ডেস্ট্রয়ারকে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। তবে একাধিক মার্কিন কর্মকর্তা এই বক্তব্য সরাসরি খারিজ করেছেন।
কৌশলগত উদ্দেশ্য
এই অভিযান ছিল হরমুজ প্রণালি থেকে মাইন অপসারণের বৃহত্তর প্রচেষ্টার প্রথম ধাপ। এর উদ্দেশ্য ছিল বাণিজ্যিক তেলবাহী জাহাজগুলিকে দেখানো যে এই জলপথ আবার নিরাপদে ব্যবহার করা সম্ভব। মার্কিন সামরিক বাহিনী এই প্রণালির মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করতে আগ্রহী, যাতে বিশ্বকে দেখানো যায় — হরমুজ খোলা আছে এবং ইরান যে টোল আরোপ করতে চাইছে তা না দিয়েও দেশগুলি এখানে চলাচল করতে পারে। সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনে জলের তলায় চলা ড্রোনসহ অতিরিক্ত মার্কিন সামরিক সম্পদ এই মাইন অপসারণ অভিযানে যোগ দেবে।
তবে একই সঙ্গে ওয়াশিংটন এই সংকটপূর্ণ মুহূর্তে উত্তেজনা বাড়াতে চায় না, কারণ ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা চলছে।
মাইনের সমস্যা ও ইরানের কৌশল
গত মঙ্গলবার ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দিতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া ধীরগতির — তেহরান এখনও সব মাইন খুঁজে পায়নি এবং সেগুলি সরানোর পর্যাপ্ত সক্ষমতাও নেই বলে জানাচ্ছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। তাঁরা আরও জানিয়েছেন, ইরান দ্রুত প্রণালি খুলতে আগ্রহী নয়; বরং তারা এই পথ দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজের ওপর টোল বসাতে চাইছে। প্রণালিতে কতগুলি মাইন রয়েছে বা সেগুলি কতটা বিপজ্জনক তা এখনও স্পষ্ট নয়।
হরমুজের বৈশ্বিক গুরুত্ব
বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হয় এই হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে। ফেব্রুয়ারির শেষে আমেরিকা ও ইজরায়েল ইরানের ওপর হামলা চালানোর পর কার্যত বন্ধ হয়ে যায় এই পথ। জবাবে ইরান কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায় এবং জলপথে মাইন পেতে দেয়। এই সংঘাতের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমেছে।
হরমুজ পুনরায় খুলে দেওয়া এখন ইসলামাবাদে চলা মার্কিন-ইরান-পাকিস্তান ত্রিপাক্ষিক আলোচনার অন্যতম প্রধান শর্ত। যদিও ইরান কিছু বাণিজ্যিক জাহাজকে ইতিমধ্যে পার হতে দিয়েছে, তবু তেহরান প্রকাশ্যে জানাচ্ছে — যেকোনো শান্তিচুক্তিতে ভবিষ্যতে এই জলপথ থেকে আয় নিশ্চিত করতে হবে।